বিশ্বকাপ ছিনিয়ে নেবে ইংল্যান্ড

প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০১৯, ১৬:৪৭ | আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৯, ১৮:৫৬

ক্রমেই জমে উঠেছে এবারের বিশ্বকাপ। একের পর এক সমীকরণ। কঠিন সমীকরণ থেকে এখন আসছে অসম্ভব সমীকরণে। তবে সমীকরণ যাই হোক এবারের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হবে আয়োজক ইংল্যান্ড। এক ঘনিষ্ঠ ক্রিকেট বোদ্ধার সঙ্গে এই বিষয়ে আলাপ করছিলাম। তাকে বললাম (ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড খেলা দেখার পর) এইবার বিশ্বকাপটা আইসিসি ইংল্যান্ডকেই দেবে। কথা শুনে সে আমাকে বললো- ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখো না। ইংল্যান্ডই যদি বিশ্বকাপ পাবে তাহলে ভারত আর অস্ট্রেলিয়া কী দোষ করলো? বন্ধুর কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু বাকি যে দুটি দেশের কথা ভাবা হচ্ছে তাদের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়া ৫বার বিশ্বকাপ তাদের ঘরে তুলেছে। আর ভারত ২ বার। এখন কথা হচ্ছে ক্রিকেটের মতো এমন জনপ্রিয় একটি খেলার প্রবর্তক দেশ হচ্ছে ইংল্যান্ড। এর আগে ১১টি বিশ্বকাপ খেলেছে দেশটি। ৩বার ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলেও শিরোপা স্পর্শ করতে পারেনি। কথাই বলে রানীর দেশে রাজার খেলা। এই রাজার খেলা আয়োজন করেও রানীর দেশ বারবার বিশ্বকাপ ঘরে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। ইয়ান বোথামদের দিন এখন শেষ। বর্তমান ইংল্যান্ড টিম অনেক ব্যালান্সড। দলে আছে বেয়ারেস্টো, জো রুট, মরগান, বেন স্টোকস ও আর্চারের মতো খেলোয়াড়। যারা বিশ্বকাপের আগের সবকটি ম্যাচে তাদের নৈপূণ্য দেখিয়েছেন। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ থেকে ইংল্যান্ড যে খেলা উপহার দিয়ে যাচ্ছে তাতে করে তারা বিশ্বকাপ নিজেদের ঘরে রেখে দেবে এটা অসম্ভব কিছু না।

আমার এরকম কথায় অনেকে হয়তোবা একমত হতে নাও পারে। কিন্তু বিশ্বকাপের সবকিছু সুক্ষভাবে বিচার করলে এটা বুঝে নিতে কষ্ঠ হবে না এবারের বিশ্বকাপ ইংল্যান্ড পেতে যাচ্ছে। তবে এটাও ঠিক ইংল্যান্ড খেলছে ভালো। তাদের খেলা দেখেই মনে হচ্ছে বিশ্বকাপটা তাদেরই পাওয়া উচিত। প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে যেভাবে নাস্তানাবুদ করে তারা শুরুটা করেছিলো শেষটাও করেছে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঠিক সেইভাবে। আইসিসি ভাবতেই পারে ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপটা দিয়ে দেবে। কিন্তু কথা হচ্ছে টুর্নামেন্টের ট্রফি তো নিজেদের ইচ্ছায় গোল টেবিলে বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে দেয়া যায় না, এজন্য রীতিমতো ছক করে, প্ল্যান করে খেলার আয়োজন করে তারপরই দিতে হয়। মাঝখানে ভারত যদি গোঁ না ধরে তাহলে এবারের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড।

বুধবারের ম্যাচের পর ইংল্যান্ড পয়েন্ট টেবিলের তৃতীয় স্থান দখল করে নিয়েছে। শীর্ষস্থানে আছে অস্ট্রেলিয়া, দ্বিতীয় ভারত আর চতুর্থ নিউজিল্যান্ড। যদিও পাকিস্তানের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের যে ম্যাচ তাতে সেই অসম্ভব সমীকরণ ডিঙিয়ে নিউজিল্যান্ডকে হঠানো দুঃসাধ্য। ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার ১টি করে ম্যাচ বাকি। পয়েন্ট টেবিলে তাদের পয়েন্ট যথাক্রমে ১৩ ও ১৪। ভারত যদি শ্রীলঙ্কার সঙ্গে জিতে তাহলে তাদের পয়েন্ট হবে ১৫। আর অস্ট্রেলিয়া যদি দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে জিতে তাহলে তাদের পয়েন্ট হবে ১৬। এখন সেমিফাইনালের লাইনআপ যদি ধরা হয় তাহলে পয়েন্ট টেবিলের প্রথম ও চতুর্থ দল খেলবে আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দল খেলবে। সেক্ষেত্রে অস্ট্রেয়িলা-নিউজিল্যান্ড ও ভারত-ইংল্যান্ড সেমিফাইনাল খেলার সম্ভাবনা বেশি। ইংল্যান্ড-ভারত যদি সেমিফাইনাল খেলে তাহলে ইংল্যান্ডের বর্তমান খেলার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে তারা ভারতকে হারাবার সামর্থ্য রাখে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে খেলার ফলাফল যাই হোক যারা জিতবে তারা ফাইনালে ইংল্যান্ডের সঙ্গে খেলবে।

মাঝখানে বিদায়ের সুর বেজে উঠেছিলো ইংল্যান্ডের। কিন্তু সব শঙ্কা উড়িয়ে ইংল্যান্ড এখন সেমিতে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে তাদের মনোবল। একে তো নিজেদের ঘর, নিজেদের মাঠ, নিজেদের আবহাওয়া। তারচেয়ে বড় কথা হচ্ছে ইংল্যান্ড টিমের বলতে গেলে সব খেলোয়াড়ই ফর্মে। ব্যাটসম্যানদের ব্যাটে ভালোই রান আসছে। তারা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে রানের পাহাড় গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছে। এই মনোবলটা তারা ফাইনালেও কাজে লাগাবে।

একটু পিছন ফিরে যদি তাকাই- ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ভারত প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলে ৭ জুন ১৯৭৫ সালে। বিশ্বকাপে প্রথম ডেলিভারির মুখোমুখি হয়েছিলেন ব্যাটসম্যান ডেনিস আমিস। সেই ম্যাচে ১৩৭ রান করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম সেঞ্চুরিয়ান হন তিনি।

এরপর ১৯৭৯ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে একটা সময়ে ৩৯ ওভারে মাত্র ১২৯ রান করেছিল ইংল্যান্ড। অন্যদিকে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ৯টি উইকেট হারিয়ে ২৮৬ রান করেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। মাত্র ১১ রানের বিনিময় শেষের ৮ টি উইকেট হারায় ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপের ইতিহাসে একটি দলের পক্ষে এটি সব থেকে খারাপ পতন।

১৯৭৫ প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্বে ছিল ইংল্যান্ড। শুধু প্রথমটি নয়, পরপর তিনটি ক্রিকেট বিশ্বকাপই আয়োজন করেছিল ইংল্যান্ড। প্রথম তিনটি বিশ্বকাপই স্পনসর করেছিল প্রুডেন্সিয়াল ইনস্যুরেন্স ফার্ম। ফলস্বরুপ বিশ্বকাপের নামকরণ করা হয়েছিল প্রুডেন্সিয়াল বিশ্বকাপ।

এখন পর্যন্ত একটি বিশ্বকাপেও শিরোপা জিতেনি ইংল্যান্ড। তবে তিনবার এই টুর্নামেন্টের ফাইনালে স্থান পেয়েছিল ইংল্যান্ড।

ইংল্যান্ডের গ্রাহম গুচ ক্রিকেট বিশ্বকাপের ইতিহাসে সব থেকে দুর্ভাগ্যবান প্লেয়ার। তিনি ১৯৭৯, ১৯৮৭ এবং ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলেছিলেন কিন্তু একটি বারও জয়লাভ করেনি ইংল্যান্ড।

১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ভারতের কিংবদন্তি সুনীল গাভাস্কারকে তারই শহর মুম্বাইয়ে বোল্ড করেছিলেন ইংল্যান্ডের পেসার ফিলিপ ডিফ্রেইটাস। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটি তার শেষ ম্যাচ ছিল। অস্টেলিয়ার বিপক্ষে সেই বছরই বিশ্বকাপের ফাইনালে পরাজিত হওয়ার পরে নানা রকমের সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যান মাইক গ্যাটিংকে। কারণ তার একটি ভুলের জন্যে ভেঙে গুরিয়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ডের ব্যাটিং লাইন আপ। এই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ স্কোর করেছিলেন গ্রাহম গুচ। তিনি মোট ৪৭১ রান করেছিলেন। সেমিফাইনালের আগেই পরপর তিনটি ম্যাচের সেরা পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। তবে সেই বছর ফাইনালে ৫৭ বলে মাত্র ৩৫ রানে আউট হয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

মজার কথা হচ্ছে ১৯৮৭ সালে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ভারত বনাম ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ সেমি ফাইনালের সময় একজন বল বয় ছিলেন যিনি বড় হয়ে ২০১১ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়। তিনি হলেন ক্রিকেটের অন্যতম কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকার।

যে ইংল্যান্ডকে নিয়ে এতো কথা, এতো হিসাব-নিকাশ সেই ইংল্যান্ডই এবার বিশ্বকাপ জিতবে।

রিহাব মাহমুদ, লেখক ও সাংবাদিক