নৃশংস হত্যাকাণ্ডে আমরা মর্মাহত

প্রকাশ : ২৯ জুন ২০১৯, ১২:১২

সম্পাদকীয়

আদালত বলেছেন, ‘দেশ ও জাতি এ ঘটনায় মর্মাহত। সমাজটা যাচ্ছে কোথায়? প্রকাশ্য রাস্তায় মানুষটাকে মারল। ভিডিও করতে ভুলল না। কিন্তু কেউই ভিকটিমকে বাঁচাতে এগিয়ে এলো না।’ আদালতের এই নির্মম সত্য উচ্চারণের সঙ্গে আমরাও একাত্মতা ঘোষণা করে বলতে চাই, সমাজটা যাচ্ছে কোথায়!

আলো ঝলমলে দিন। বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা। রাস্তাঘাটে লোক চলাচলও স্বাভাবিক। বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন তরুণ দম্পতি রিফাত ও মিন্নি। পথেই ওত পেতে থাকা খুনিরা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রকাশ্যে রাম দা দিয়ে কোপাতে থাকে রিফাতকে। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো তখন এই নৃশংস হত্যাকা-ের নীরব দর্শক মাত্র। খুব অল্প সময়ের মধ্যে অপারেশন শেষ করে অস্ত্র উঁচিয়ে বীরদর্পে এলাকা ত্যাগ করে খুনিরা। দ্রুত ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। দেশজুড়ে ওঠে নিন্দার ঝড়।

এ রকম ঝড় ওঠার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে দরজি বিশ্বজিৎকে রিফাতের মতোই কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। গত ২৬ জুন বরগুনায় সেই একই দৃশ্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, আমরা কি মানুষ? মানুষ হতে হলে মনুষ্যত্ব-বোধের উপস্থিতি থাকতে হয়। সম্ভবত আমরা আমাদের সেই বোধকে হারিয়ে ফেলেছি। কেবল খুনিরাই নয়, পাশে নীরব দর্শকের ভূমিকায় যারা দাঁড়িয়েছিলেন— তারাও প্রশ্নবিদ্ধ।

প্রশ্ন উঠেছে, শত শত মানুষের মধ্যে কি একজন নৈতিক মানুষও সেখানে ছিলেন না— যিনি এই অনৈতিক কর্মকা-ের প্রতিবাদ করার জন্য এগিয়ে আসতে পারতেন? রিফাতের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে বাঁচানোর ন্যূনতম চেষ্টা করতে পারতেন! দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বর্তমান বাস্তবতায় এমনটি ঘটেনি। একজন কোপ খাবে আর বাকিরা ভিডিও করবে, এটাই আজ আমাদের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

২০১৬ সালের ৩ অক্টেবর সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বদরুল আলম একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাথী খাদিজাকে চাপাতি দিয়ে আদিম বর্বরতায় কুপিয়েছিল। কিন্তু সেই সন্ত্রাসী বদরুল কিছুদিন জেল খেটে আদালত থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে এসে এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এখানেও অনেকটা সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।

রিফাতের খুনিদের মধ্যে নয়ন এলাকার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার পরও প্রশাসনের সামনে সে প্রকাশ্যে এভাবেই দাপিয়ে বেড়াতে পারে। এতটাই ক্ষমতা তার। আমরা লক্ষ্মীপুর মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের ক্ষমতার কথা জেনেছি। পুলিশ প্রশাসনের অনৈতিক ভূমিকার কথাও জেনেছি। জেনেছি পুরো সমাজের অবক্ষয়ের কথা।

তনু হত্যাকারীদের আজও ধরা যায়নি। সম্ভবত ডিপফ্রিজে চলে গেছে মিতু হত্যার বিষয়টিও। আফসানার নামও আর শোনা যাচ্ছে না। আমরা একে একে বিশ্বজিৎ দাস, তনু রিশা, আফসানা, নিতু এবং খাদিজার নৃশংস হত্যার কেবল দর্শক হয়েই রইলাম। আমাদের এই নেতিবাচক আচরণকে সমাজের বীর্জহীন মানুষরা ক্ষমা করলেও প্রকৃতি তার বিচার করবেই। কেননা বিজ্ঞান বলছে, ‘ইন এভরি অ্যাকশন দেওয়ার ইজ অ্যান ইক্যুয়াল অ্যান্ড অপজিট রিয়্যাকশন’। রিয়্যাকশনটি বর্তাবে ভবিষ্যতের ওপর। আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেই তার খেসারত দিতেই হবে।

সুতরাং, বিষয়টি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার আগেই তাকে নির্মূল করা আজ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। আমরা মনে করি, প্রধানমন্ত্রী সেই দাবির কথা স্মরণ করে, এরই মধ্যে তার নির্দেশনা দিয়েছেন।

পিডিএসও/তাজ