মানব পাচার রোধে প্রতিরোধ জরুরি

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০১৯, ০৯:১২

সম্পাদকীয়

এক সময় ছিল মানুষ তার সার্বিক নিরাপত্তার জন্য একস্থান ত্যাগ করে অন্যত্র আবাসভূমি গড়ে তুলেছে। পরবর্তী সময়ে সেটি তার মাতৃভূমি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আরো পরে এসে, বিভিন্ন রাষ্ট্রের সমারোহে পৃথিবী বিভক্ত হওয়ার পর মানুষের এই অবাধ যাতায়াত রুদ্ধ হয়ে পড়ে। আইনের খড়্গ নেমে আসে এই অবাধ যাতায়াতে। এখন আর কেউ পৃথিবীর যে কোনো স্থানে ইচ্ছামতো পরিভ্রমণের জন্য যেতে পারে না। পারে না স্থায়ীভাবে বসবাস করতে। এতে মানব সম্প্রদায়ের কতটুকু লাভ বা ক্ষতি হয়েছে তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। বাস্তবতা হচ্ছে আইন লঙ্ঘন করে কেউ আর নিজ দেশের বাইরে যেতে পারছে না। এক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘনকারীকে বিশ্বের প্রতিটি দেশই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে। তবু আইনের চোখে ধুলা দিয়ে মানুষ দেশান্তরী হচ্ছে বা হওয়ার চেষ্টা করছে। পথে ভয়ঙ্কর বিপদের আশঙ্কা থাকলেও এ পথে যাওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের সংখ্যায় যেন ঘাটতি নেই। তবে এসব মানুষকে যারা এই পথে টেনে আনছে, তারা কোনোভাবেই ভালো মানুষ নয়। সাধারণ মানুষকে নানা প্রলোভনে আকৃষ্ট করে এরা তাদের স্বার্থকেই সংরক্ষণ করে। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে লাভের চেয়ে ক্ষতির দিকটাই বেশি। পথিমধ্যে জীবন হারানোর সম্ভাবনাকে মাথায় নিয়েও—তবু যাচ্ছে মানুষ।

দেশ বিবেচনায় দেশত্যাগের কারণ ভিন্নতর হলেও পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে এভাবেই বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে মানুষ। দেশত্যাগ করে এভাবে বিদেশে চলে যাওয়া মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়া মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক বিচারে আজ চরম আকার ধারণ করেছে। এতে মানব পাচারকারীদের অর্থনৈতিক উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। প্রতিনিয়ত ইউরোপ ও মালয়েশিয়ায় সাগরপথে মানব পাচার অব্যাহত রয়েছে। প্রতি বছরই নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। তিউনিসিয়ার উপকূলে গত ছয় দিন ধরে ৬৪ বাংলাদেশি নৌকায় ভাসছেন। তাদের তিউনিসিয়া গ্রহণ করতে চাইছে না। দেশে ফেরত পাঠানোর কথা ঘোষণা করেছে তিউনিসিয়া কর্তৃপক্ষ। ইতালি যাওয়ার পথে তারা তিউনিসিয়া উপকূলে ধরা পড়েন।

গত মাসের শুরুর দিকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে তিউনিসিয়ার একই উপকূলে নৌকাডুবিতে ৩৭ জন বাংলাদেশির প্রাণহানি ঘটে। ২০১৫ সালে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে সাগরে মারা যায় কয়েক হাজার মানুষ। এছাড়া থাইল্যান্ডে কয়েকটি গণকবরও পাওয়া যায়। ২০১২ সালে মানব পাচার আইন হওয়ার পর থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৫ হাজার ৭১৬টি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য মামলার নিষ্পত্তি সংখ্যা খুবই কম।

অভিযুক্তদের একই অভিযোগ, এসব মামলার অধিকাংশেরই এখন পর্যন্ত বিচার হয়নি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মানব পাচার প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ‘টায়ার-ওয়াচ লিস্টে’ রাখা হয়েছে। মানব পাচারের দিক থেকে বাংলাদেশের স্থান অনেক ওপরে।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গত বছরের পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর ৫০ হাজার নারী ভারতে পাচার হয়। এ তথ্য বিশ্বাসযোগ্য না হলেও প্রতি বছর যে নারী পাচার হচ্ছে এটা সত্যতার দাবি রাখে। সম্প্রতি শ্রম অভিবাসনের নামেও পাচার বাড়ছে। সুতরাং আরো বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হওয়ার আগে বিষয়টির দিকে সুনজর দেওয়া দরকার। আমরা মনে করি, এ দায়িত্ব সরকারের। সাধারণ মানুষকে সচেতন করার দায়িত্বও বর্তায় সরকারের ওপর। পাশাপাশি সাধারণেরও সাবধান হওয়া জরুরি। মনে রাখতে হবে, জীবনই যদি চলে যায় তাহলে সম্পদের মূল্য কোথায়! যখন মানুষের ভোগের জন্য সম্পদ তখন সম্পদ আগে নয়, জীবনটাই আগে।

পিডিএসও/হেলাল