মানবসম্পদ উন্নয়নে অর্থনীতিতে গতি

প্রকাশ : ১০ মে ২০১৯, ১১:১২

রেজাউল করিম খোকন

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অগ্রগতি সহজেই চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশের উন্নয়ন এখন বিশ্বব্যাপী আলোচনার বিষয়। তর তর করে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। ছোট্ট একটি ভূখন্ডে আমরা অনেক মানুষ বাস করি। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৮০ লাখ। মোট আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যার চাপ বেশি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে অভাব, দারিদ্র্য, বেকারত্ব রয়ে গেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যে গতিতে এগিয়ে চলেছে, বাংলাদেশ ঠিক সেভাবে এগিয়ে যেতে পারছে না।

বাংলাদেশের অর্থনীতি একসময় পুরোপুরি কৃষিনির্ভর ছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে তৈরি পোশাকশিল্প। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ হিসেবে উজ্জ্বল অবস্থানে পৌঁছে গেছে এরই মধ্যে। এ ছাড়া আমাদের রফতানি পণ্য তালিকায় নতুন নতুন আইটেম যুক্ত হচ্ছে। আজকাল বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত বিভিন্ন শিল্পজাত সামগ্রী, ইলেকট্রনিক্স পণ্য পৃথিবীর অনেক দেশে যাচ্ছে। এগুলোর বেশ ভালো চাহিদা রয়েছে। কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে একসময়ে বাংলাদেশের যে পরিচিতি ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, তা থেকে অনেকটাই সরে এসেছে সময়ের পালাবদলে। প্রযুক্তির নানা বিকাশ, শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির রাজত্ব গোটা বিশ্বের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক কাঠামোয় এনেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন।

এখন বিশ্বব্যাপী কারিগরি জ্ঞানের কদর খুব সহজেই চোখে পড়ে। বিদেশে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এক কোটিরও বেশি মানুষ বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাঙাভাব সৃষ্টি করে রেখেছে অনেক দিন ধরে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশসহ আমেরিকায় বাংলাদেশের অগণিত মানুষ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। জনশক্তি খাত থেকে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে বর্তমানে তা আরো কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের অদক্ষ, কারিগরি জ্ঞান না থাকা অশিক্ষিত কর্মীরা অন্যান্য দেশের দক্ষ-অভিজ্ঞ কারিগরি জ্ঞান জানা শিক্ষিত কর্মীদের তুলনায় অনেক কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারে বাংলাদেশ এখনো অনেকটা পিছিয়ে আছে। ফলে বাংলাদেশ জনশক্তি রফতানি খাত থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে ব্যর্থ হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ এ খাত থেকে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারত। যদি কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তেমন উপযুক্ত কাজ নিয়ে বাংলাদেশের কর্মীরা বিদেশে যেতে পারেন, তা হলে প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারে অন্যান্য দেশের কর্মীদের টেক্কা দিতে পারবেন।

এ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে বিদেশে চাকরি নিয়ে যাওয়ার আগে বিভিন্ন ধরনের কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের ব্যাপারে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। সরকার দেশব্যাপী কারিগরি শিক্ষা লাভের জন্য অনেক ইনস্টিটিউট, ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছে। যেখানে মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, সিভিল, অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কোর্স করার ব্যবস্থা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে স্বল্প খরচে নানা ধরনের কারিগরি বিষয়ে জ্ঞান লাভের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষ, অভিজ্ঞ, কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মী হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে চাহিদাসম্পন্ন করে তোলা সম্ভব। আজকাল অনেকেই এ বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। ফলে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী তরুণ-তরুণীর সংখ্যা বাড়ছে। দেশেই হোক, বিদেশেই হোক, শ্রমবাজারে নিজের দাম বাড়াতে হলে কারিগরি শিক্ষা অর্জনকারী দক্ষ-অভিজ্ঞ কর্মীরা বেশ ভালো এবং সুবিধাজনক অবস্থায় থাকেন। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগেও বিভিন্ন জেলা শহরে এমনকি উপজেলা পর্যায়েও কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আবার কোথাও কোথাও এনজিও কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত তেমনি কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের কারিগরি জ্ঞান এবং প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন অনেক বেকার তরুণ-তরুণী। এভাবেই নিজেদের প্রশিক্ষিত করে তারা দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করছে। শ্রমবাজারে তাদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা মূল্যায়নের মাধ্যমে পারিশ্রমিক, বেতনের ব্যাপারে দরকষাকষির সুযোগ পাচ্ছেন তারা। এভাবেই তারা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছেন।

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ক্রমবর্ধমান ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে বিপিও খাত। বিপিও মানে বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং। টেলিকমিউনিকেশন, ব্যাংক, বিমা, হাসপাতাল, হোটেলের ব্যাক অফিসারের কাজ, হিউম্যান রিসোর্স ডিপার্টমেন্ট, আইটি, অ্যাকাউন্টস ডিভিশন সব কিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। আইসিটি খাতে বর্তমানে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। এ খাতে বাংলাদেশের যে অগ্রগতি এবং পরিবর্তনের গল্প, তার উল্লেখযোগ্য অবদান হচ্ছে বিপিও খাতের। বছরে প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আসে এই আইসিটি খাত থেকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণার প্রসার ঘটায় দেশজুড়ে আইসিটি খাতে নবজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। আইসিটি খাতটিকে উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় ভেবে এ ক্ষেত্রে দক্ষ-অভিজ্ঞ যোগ্য মানবসম্পদ গড়ে তোলার উদ্যোগও চলছে বেশ জোরেশোরে। বাংলাদেশে এখন বিপিও একটি নতুন সম্ভাবনার নাম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ এখানকার বিপিও ব্যবসার প্রবৃদ্ধি বছরে শতকরা ১০০ ভাগের বেশি।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিপিওর বাজার ৫০০ বিলিয়ন ডলার। সেখানে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ দখল করতে পেরেছে মাত্র ১৮০ মিলিয়ন ডলার। অতএব এখান থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, বিপিও খাতে একটি বিশাল সম্ভাবনাময় বাজার পড়ে আছে। এ মুহূর্তে যদি বাংলাদেশ বিপিও খাতে আলাদাভাবে নজর দেয়, তা হলে গার্মেন্টস খাতের পরই এটা হবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় খাত। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে আইসিটি খাতকে সর্বোচ্চ অবদান রাখতে সক্ষম করে তুলতে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং অর্থাৎ বিপিওকে আরো অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য এবং জনপ্রিয় করে তুলতে হবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাপানে এ মুহূর্তে কম্পিউটার প্রোগ্রামের প্রয়োজন প্রায় ২০ লাখ। আগামী ৫ বছরে ২০ লাখ প্রোগ্রাম কোডারের প্রয়োজন হবে জাপান, ইউরোপ এবং আমেরিকাতে। ওইসব দেশে যথেষ্ট পরিমাণে তরুণ বয়সী জনশক্তি নেই। জাপানে ৫০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর বয়স ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে। ইউরোপ, আমেরিকাতেও তাদের তরুণ প্রজন্মের সংকট বিরাজ করছে। বাংলাদেশে যদি কয়েক বছরের মধ্যে উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক তরুণকে দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং যোগ্য করে তোলা যায়, তা হলে আগামী ৫ বছরে ইউরোপ, আমেরিকা, জাপানের বাজার আমাদের দক্ষ-অভিজ্ঞ তরুণরাই নিয়ন্ত্রণ করবে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি লাভ করছেন। তাদের মধ্যে বড় একটি অংশ যদি বিপিও সেক্টরে কাজ করতে আসেন তা হলে দারুণ এক বিপ্লব ঘটে যেতে পারে। যেকোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার মানুষের এখানে কাজ করার বিরাট সুযোগ রয়েছে। ২০০৯ সালে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের আয় ছিল মাত্রা ২৬ মিলিয়ন ডলার। ৬ বছরের মধ্যে এ খাতে আয় ৩০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে দেশে বিপিও সেক্টরে ৪০ হাজারের বেশি লোক কাজ করছে। আগামী ২০২১ সাল নাগাদ এ খাতে প্রায় ১ লাখ লোক কাজ করবে। বিপিও খাতে আয় যত বাড়বে দেশ অর্থনৈতিকভাবে ততই এগিয়ে যাবে। তরুণদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন শাখায় কাজে লাগানোর মতো দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং যোগ্য করে তুলতে হবে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে, করপোরেট প্রতিষ্ঠানে বিদেশি বহু বিশেষজ্ঞ, অভিজ্ঞ, দক্ষ জনশক্তি নিয়োজিত রয়েছে। তাদের উচ্চহারে বেতন দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এভাবে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা বিভিন্ন দেশে চলে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দেশে প্রয়োজনীয় কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ জনশক্তি গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা বেশ বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করতে পারি। একটি বিষয় সবাইকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে যে, আমাদের যে বিপুল জনসংখ্যা, তাকে জনশক্তি বা জনসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে জনসংখ্যার বিরাট বোঝার চাপে আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক কাঠামো নানাভাবে বিপর্যস্ত হবে। দিনে দিনে ভয়াবহ সংকট আমাদের সামনে এসে দাঁড়াবে। সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা, অপরাধপ্রবণতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদকাসক্তি প্রভৃতি অনাকাক্সিক্ষতভাবে বাড়তেই থাকবে।

একটি দেশের বেশির ভাগ নারী-পুরুষ উপার্জনক্ষম হলে সে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি স্বাভাবিকভাবেই মজবুত হতে বাধ্য। দেশকে সমৃদ্ধ-উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে হলে, জনসংখ্যার বিরাট বোঝাকে অভিশাপ মনে না করে আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি শিক্ষার বিস্তারের কোনো বিকল্প নেই। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরাই আমাদের অর্থনীতির চেহারাটা আরো বদলে দিতে পারে।

পিডিএসও/হেলাল