ভারসাম্যের রাজনীতি ও একটি প্রশ্ন

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০৯:১১

শেখর দত্ত

ক্ষমতার কেন্দ্রে ভারসাম্য সৃষ্টি করা ভিন্ন কোনো দেশের কোনো সরকারই রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। প্রবহমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ক্ষমতার কেন্দ্রে ভারসাম্য বজায় রাখা আমাদের মতো দেশে এক কঠিন ও জটিল কাজ। রাজনীতির ক্ষেত্রে এটা যেমন শিল্পকলা, তেমনি বিজ্ঞানও। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার বর্তমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে নানা প্রতিকূলতা ও টানাপড়েনের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারছে বলেই ক্ষমতায় টিকে থাকতে সক্ষম হচ্ছে। কেবল টিকে থাকাই নয়, একটু খেয়াল করলেই বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করা যাবে, যে দেশটি ঘন ঘন হরতাল-অবরোধ ইত্যাদির ভেতর দিয়ে অশান্ত-অস্থির হয়ে থাকত, হত্যা-ক্যু ইত্যাদিসহ ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন আর সেই সঙ্গে সংবিধান কাটাকাটির হতো বিধিলিপির মতো অখন্ডনীয়; সেই দেশে ১১ বছর ধরে একটি সরকার তিন তিনটি নির্বাচন পার করে তৃতীয়বারের মতো দেশ পরিচালনা করতে সক্ষম হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, আমরা স্বাধীনতার ৪৮ বছর অতিক্রম করছি। কালবিচারে এ সময়কাল খুব একটা বেশি না হলেও একটা দেশের জন্য এটা খুব কম সময় নয়। কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তানে আমরা যত দিন ছিলাম, তার দ্বিগুণেরও বেশি সময় ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। প্রায় ৫০ বছরে আমরা উন্নতি-সমৃদ্ধি ও জীবন-জীবিকার মানোন্নয়নে যতটুকু অগ্রসর হতে পেরেছি, নানা টানাপড়েন ও ঝড়ঝাপটা না থাকলে আরো যে অগ্রসর হতে পারতাম, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিগত ১১ বছরের আওয়ামী লীগ আমলের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিচ্ছে, যদি ক্ষমতার কেন্দ্রে ভারসাম্য বজায় রেখে অস্থিরতা-অশান্তি-অরাজকতা নিয়ন্ত্রণে রেখে অগ্রসর হওয়া সম্ভবপর হয়, তবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সব সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের ধারায় অগ্রসর হয়ে ইপ্সিত লক্ষ্য অর্জন কঠিন ও জটিল হলেও আয়াসসাধ্য নয়।

আজ যে প্রশ্ন সবচেয়ে বড় হয়ে জাতির সামনে দেখা দিয়েছে, তা হলো চলমান এ ভারসাম্য আগামী দিনগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল ধরে রাখতে পারবে কি? দুবারে ১৫ বছরেরও বেশি রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার ভেতর দিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তা দিয়ে কি তিনি আগামী দিনগুলোতে ক্ষমতার কেন্দ্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হবেন? বলাই বাহুল্য, এ প্রশ্নটা বড় হয়ে দেখা দিত না, যদি সরকার পরিবর্তন হলে সংবিধান থেকে শুরু করে দেশের জন্মলগ্নের আদর্শ ও মর্মবাণীসহ ইতিহাস-ঐতিহ্য সব কলমের খোঁচায় ঘোষণার মাধ্যমে পাল্টে না যাওয়ার সম্ভাবনা থাকত। এমন একটা দেশ আমাদের যেখানে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হয় জাতীয় আত্মপরিচয়ের খোলনলচের পরিবর্তন। জাতিসত্তা থেকে জাতির পিতা! শিকড় ধরে টান পড়ে, শিকড় দেয় নাড়িয়ে। মূলত ও প্রধানত এ কারণেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের দ্বারপ্রান্তে এসে বর্তমান দিনগুলোতে ক্ষমতার কেন্দ্রে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

এটা তো সর্বাংশে সত্য যে, ভারসাম্য রক্ষা করা হচ্ছে এক চলমান প্রক্রিয়া। এখানে একটু এদিক-ওদিক হওয়ার জো নেই। প্রসঙ্গত, খাতার পাতায় বা কথায়-বক্তৃতায় কর্মসূচি কিংবা করণীয় তুলে ধরা সহজ। কিন্তু বাস্তবায়ন সব সময়ই কঠিন ও জটিল। লাখো-কোটি মানুষের ভাগ্য সরকারের কর্মকান্ডে জড়িত। বিভিন্ন স্বার্থের এবং এমনকি বিপরীত স্বার্থও এখানে রয়েছে জড়াজড়ি করে। চিন্তাচেতনার ক্ষেত্রে আছে আকাশ-পাতাল ফারাক। এ অবস্থায় একদিকে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে আরেকদিকে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়। ভারসাম্যহীনতা যে কখন, কোথা থেকে সৃষ্টি হতে পারে কিংবা ছোট থেকে বড় হতে পারে এবং তা যে কখন জনমনে কোনো ধরনের বিরূপতা-বিক্ষুব্ধতা জাগ্রত করতে পারে, তা অনেক সময়ই আগে থেকে আন্দাজ করা যায় না। সর্বোপরি রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে ঘটনা আকস্মিকতায় পূর্ণ। কোনো ঘটনা কখন কীভাবে সৃষ্টি হয় এবং সরকারকে কোন ধরনের চাপে ফেলতে পারে, তা ধারণা করাও পূর্বাহ্নে সম্ভব হয় না।

এদিক বিচারে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনায় কোথায় তাল কাটছে আর কোথায় কোথায় তাল কাটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে, তা বিবেচনায় নেওয়া অপরিহার্য। ৪৮তম স্বাধীনতা দিবসের খুব ভোরে শহীদদের উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যাওয়ার আগে কলামটা লিখছি আর তাই স্বাধীনতার পর নবজাত দেশে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের সাড়ে তিন বছরের সময়কালের কথা স্মরণে আসছে। মনে পড়ছে জাতির পিতা তখনকার সমাজতন্ত্র-ধনতন্ত্র ঠান্ডাযুদ্ধ যুগে নবজাত দেশে কতটা প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে! উন্নত-সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক মানবিক দেশ গড়ে তোলা ছিল তার লক্ষ্য। এটাই তো সত্য যে, পাকিস্তানি আমলের ২৪ বছরের গণ-আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে চার নীতি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র আমাদের জাতীয় জীবনের মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এ জাতীয় চার নীতি বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

কিন্তু ভারসাম্যের ক্ষেত্রে সমস্যাটা সেখানেই সৃষ্টি হয়েছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না, সমাজতন্ত্র অবাধ গণতন্ত্রের সঙ্গে খাপ খায় না। তখনকার বিশ্ব বাস্তবতায় তাই সমাজতন্ত্রের সঙ্গে একদলীয় ব্যবস্থা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। এখনো যেসব দেশ সমাজতন্ত্র ব্যবস্থাটি ধরে রেখেছে, সেসব দেশে একদলীয় ব্যবস্থা চলছে। তবে কেবল সমাজতন্ত্র নয়, সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাও ছিল আমাদের জাতীয় পছন্দ এবং জাতীয় চার নীতির এক নীতি। তাই ভারসাম্য রক্ষা করতে সংবিধান রচনা করে বঙ্গবন্ধু একদিকে অবাধ সংসদীয় গণতন্ত্র কায়েম করলেন আর অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক অভিমুখী অর্থনীতি চালু করলেন। মণি সিংহ নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে বলা হলো, দেশে বিপ্লবী প্রক্রিয়া চলছে। আজ অর্ধশত বছর পর প্রশ্ন জাগে, মুক্তিযুদ্ধ তথা দেশের ইতিহাসের প্রথম রাজনৈতিক-সামাজিক বিপ্লবের পর অবাধ সংসদীয় গণতন্ত্র ও ‘বিপ্লবী প্রক্রিয়া’ চালু রেখে ক্ষমতার কেন্দ্রে কি ভারসাম্য রাখা আদৌ সম্ভব ছিল? নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির সঙ্গে অবাধ গণতন্ত্র কি কখনো ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে?

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সমাগত। শত বিপর্যয়ের মধ্যেও এটা জাতির সৌভাগ্য বলতেই হবে যে, অর্ধশতবর্ষ উৎসব জাতি যখন পালন করবে, তখন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল থাকবে ক্ষমতায়। তাই এখন জাতীয় চার নীতি বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে কোথায় কোথায় ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হচ্ছে, কোথায় কোথায় তাল-লয় কাটছে, তা বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এ বিবেচনা স্বাভাবিকভাবে সবার এক রকম হবে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা বিদ্যমান বাস্তবতায়ও চাই অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। কিন্তু এটাই বাস্তব যে, দেশে কওমি মাদরাসায় পড়ে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী। সেখানে জাতীয় সংগীত গাওয়ার রেওয়াজ পর্যন্ত ছিল না। ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে যখন এ শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয় মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তখন বামদিক থেকে গেল গেল রব ওঠে। আবার যখন পহেলা বৈশাখে বোনাস দেওয়া হয়, তখন ডানদিকে থেকে গেল গেল রব ওঠে। প্রতি উপজেলায় একটা করে নতুন মসজিদ তৈরির যখন প্রস্তাব নেওয়া হয়; তখন যেমন তেমনি ১৮১২টি মন্দির সংস্কারে যখন অর্থ প্রদান করা হয়, তখনো উল্টোদিক থেকে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এসব ধরনের ভারসাম্যহীন অবস্থা প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায় ডান কিংবা বাম যেকোনো দিক থেকেই দেখা হোক না কেন গঠনমূলক পর্যালোচনা-সমালোচনা ভালো। আসলে সমালোচনা হচ্ছে গোলাপ গাছের কাঁটার মতো, পারতে গেলে হাতে তা বিঁধবেই। রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে তাই এসব সমালোচনার মূল্য অপরিসীম এবং তা ভারসাম্য রক্ষার সহায়ক।

প্রসঙ্গত, আমাদের এই মানচিত্রে ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের ভ্রুণ সৃষ্টি হওয়ার সত্তর বছর অতিক্রান্ত হচ্ছে। উপমহাদেশ বিবেচনায় সময়টা খুব বেশি নয়। অসাম্প্রদায়িক ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষের কমবেশি অর্ধেক সময়। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের সাম্প্রদায়িক সমস্যার দিকে তাকালে আমাদের সমস্যার গভীরতা অনুধাবন করা সহজ। আর পাকিস্তানে তো এখনো অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ এজেন্ডায়ই আসতে পারেনি। তাই ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ প্রশ্নে ধৈর্য, সহনশীলতা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সমালোচনা, সংশোধন ইত্যাদি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে অগ্রসর হওয়া ভিন্ন বিকল্প দেখি না। আর দুঃখী মানুষের মুখে হাসি, যা জাতীয় চার নীতির এক নীতি সমাজতন্ত্র শব্দের ভেতর দিয়ে অভিব্যক্ত, তা নিয়েও রয়েছে ভারসাম্যহীনতা এবং সমালোচনা। ধনবৈষম্য বাড়ছে। বেকারিও রয়েছে। তা কমানো বা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা হচ্ছে এখনকার সংগ্রাম। কিন্তু এরই মধ্যে জাতি হিসেবে আমরা যে দারিদ্র্য ও গরিবির হার কমাতে সক্ষম হয়েছি, এটা আমাদের অহংকার। আমাদের মতো দেশ বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায় এ ক্ষেত্রে আমরা আছি সব দেশ থেকে এগিয়ে। তবে এতে আত্মসন্তুষ্টির অবকাশ নেই। এ নীতির যথাযথ বাস্তবায়নের লক্ষ্যেও সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া ভিন্ন বিকল্প দেখি না।

সবশেষে বলতেই হয় সরকার পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারসাম্যের রাজনীতি সফল হলেও তাল-লয় সবচেয়ে বেশি কাটছে চার নীতির এক নীতি গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে। কেন যেন মনে হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে তাল-লয় বলে আর কিছু থাকছে না। নির্বাচনী ব্যবস্থা সত্যিকার অর্থেই পড়েছে চরম ঝুঁকির মধ্যে। কল্পনাও করা যায় না, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীরা জয়লাভ করছেন। বয়কট আর ক্ষমতার অপব্যবহার নির্বাচন পরিস্থিতিকে ক্রমেই ভয়াবহ অবস্থার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় জীবনের ৪৮ বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিচ্ছে, জাতীয় চার নীতির যেকোনো এক বা একাধিক নীতিকে নিয়ন্ত্রিত কিংবা শর্তযুক্ত করে অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা, অরাজকতার নিরসন অসম্ভব। বঙ্গবন্ধুর একদল বাকশাল সমস্যা-সংকটের সমাধান দেয়নি বরং পরিণতিতে সংকট গভীরতর হয়েছে। একইভাবে জিয়া-এরশাদের দ্বিজাতিতত্ত্ব মার্কা জাতীয়তাবাদ কিংবা হুকুমের গণতন্ত্রও জাতিকে হত্যা-খুন-ক্যু-সামরিক আইনের অন্ধগলিতে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। তাই গণতন্ত্র ও নির্বাচন ইস্যুতে জাতি কীভাবে সমস্যার সমাধান করার পথে অগ্রসর হবে—এই প্রশ্নটি অমীমাংসিত রেখেই ৪৯তম স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস অতিক্রান্ত হলো। আর প্রশ্ন রেখে গেল, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের দিনগুলোতে পারবে কি জাতি বিপন্ন গণতন্ত্রের তাল-লয় ঠিক করতে?

পিডিএসও/হেলাল