ওরা আছেন বলেই পৃথিবী আছে

প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০১৯, ১৪:৪৮

সম্পাদকীয়

ওরা আছেন বলেই পৃথিবী এখনো টিকে আছে। অন্যথায় পৃথিবী এতদিনে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতো। আমরা ফায়ার সার্ভিসের এক বীর সৈনিকের কথা বলছি। আমরা সেই মৃত্যুঞ্জয়ী বীর সোহেল রানার কথা বলছি। যিনি এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করতে গিয়ে গুরুতর আহত হন। আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু তার মৃত্যুকে ঠেকানো যায়নি। ৫০ ঘণ্টা চিকিৎসা শেষে গত রোববার রাত ২টা ১৭ মিনিটের কিছু আগে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। টানা ১০ দিন তাকে মৃত্যুশয্যায় থাকতে হয়েছে। বাহ্যিকভাবে তিনি এ লড়াইয়ে হারলেও বাস্তবতায় তিনি মৃত্যুকে জয় করেছেন। জয় করেছেন মানবতার বিশ্বকে।

২৮ মার্চ এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের পর দুপুর ১২টা ৫১ মিনিটে কল পাওয়া মাত্রই ফায়ার সার্ভিসের কুর্মিটোলা স্টেশন থেকে তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে আসে। একটি ইউনিটে ছিলেন ফায়ারম্যান সোহেল রানা। তাৎক্ষণিক শুরু হয় আগুনের সঙ্গে যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে অংশ নেন সোহেল রানা। একপর্যায়ে ল্যাডার বেয়ে বহুতল ভবন থেকে আটকে পড়া ৯ নর-নারীকে উদ্ধার করতে থাকেন তিনি। একে-একে চারজনকে উদ্ধার করার পর অকস্মাৎ নেমে আসে দুর্ঘটনা। ল্যাডারের বাস্কেটে তখন উদ্ধার করা পাঁচ-ছয়জন। আটকে পড়াদের জায়গা করে দিতে সোহেল রানা ল্যাডারের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে থাকেন। কিন্তু ল্যাডারটি তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিচের দিকে নামতে শুরু করে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ল্যাডারটি তখন সংকুচিত হতে থাকে। আর তখনই সোহেল রানার পা ল্যাডারের ভেতরে আটকে যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাম পাটি টুকরো টুকরো হয়ে যায়। অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান সোহেল রানা।

অকুতোভয়ে আগুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা তেজোদীপ্ত এই সৈনিকের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর শোকের ছায়া নেমে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ তাকে বীর বলে আখ্যায়িত করেন। দেশের প্রতিটি ঘরে এ রকম বীরের যেন জন্ম হয়, সেই প্রার্থনাও করেছেন অনেকেই। তার মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীও গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি তার শোকবার্তায় বলেছেন, অন্যের জীবন রক্ষার্থে, নিজের জীবন উৎসর্গ করার ক্ষেত্রে সোহেল রানা এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন।

দৃষ্টান্ত হয়ে থাকার বিষয়টি চিরন্তন সত্য। পাশাপাশি আরো একটি সত্য হচ্ছে, সোহেলের মৃত্যুতে তার পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সোহেলের বাবা গুরুতর অসুস্থ। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে সোহেল বড়। তার ওপরই নির্ভরশীল ছিল পুরো সংসার। তার অবর্তমানে সংসারের চাকা ঘোরানোর আর কেউ থাকল না। সর্বশেষ ২৩ মার্চ ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিলেন মহান এই বীর। আসার সময় মাকে বলেছিলেন, শিগগিরই আবার বাড়িতে ফিরবেন। তিনি বাড়িতে ফিরেছেন ঠিকই। তবে তার মায়ের বুকফাটা আর্তনাদের সিঁড়িতে পা রেখে।

আমরা মনে করি, এ আর্তনাদের কিছুটা কি আমরা আমাদের বুকের ভেতরে ঠাঁই দিতে পারি না। এগিয়ে যেতে পারি না সোহেলের সংসারের জরাজীর্ণ দেয়ালে কিছুটা পলেস্তারা লাগাতে। এ প্রশ্নে আমাদের বোধোদয় হোক, বোধোদয় হোক প্রশাসন ও সরকারের।

পিডিএসও/হেলাল