কালিমালেপন কেন ভালো কাজে

প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০১৯, ০৮:৪০

সম্পাদকীয়

সরকার যে কাজ করে, তার সবটাই কি খারাপ! সোজাসাপ্টা জবাবে বলতে হয়, না, সবটাই খারাপ না। তবে খারাপের দিকে যতটা যায়, তার বড় অংশের জন্য দায়ী কাজ সম্পাদনে দায়িত্বরত সরকারি অথবা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরা। তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে ভেঙে পড়ছে সরকারের নির্দেশনা। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জনকল্যাণমুখী কর্মকাণ্ড। কালিমালিপ্ত হচ্ছে সরকারের ভাবমূর্তি।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ কোনো মানুষ এদের এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেন না, অতীতেও করেননি। তারা এই অসৎ মানসিকতা ও মানুষের হাত থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে চান। পাশাপাশি সরকারের ভালো কাজের ভাবমূর্তিকে সমুন্নত রাখার পক্ষে। আর সে জন্যই বিষয়টির প্রতি সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করে।

লক্ষ্মীপুরের রামগতি থেকে চাঁদপুরের ষাটনল পর্যন্ত মেঘনা নদীর অভয়াশ্রমে মার্চ ও এপ্রিল মাসে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এ দুই মাসে বেকার জেলেদের জন্য বিনামূল্যে খাদ্যসহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করেছে এবং তা বলবৎও রয়েছে। কিন্তু বলবৎ থাকলেও তা যথাযথভাবে কার্যকর না হওয়ার অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।

পত্রপত্রিকার তথ্যমতে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের এক মাস পেরিয়ে গেলেও মেলেনি সেই সহায়তা। পাশাপাশি নিবন্ধিত জেলের তালিকায়ও রয়েছে নানা অসংগতি। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত জেলেদের বঞ্চিত করে ব্যবসায়ী, কৃষক ও রাজনৈতিক নেতা ও তাদের আস্থাভাজনদের মধ্যে এ খাদ্যসহায়তা বণ্টন করা হয়। ফলে বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়েই অভয়াশ্রমে মাছ ধরছেন জেলে সম্প্রদায়।

জেলা মৎস্য অধিদফতরও বিষয়টির ওপর প্রায় একই মত প্রকাশ করা হয়। অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরে ৬২ হাজারেরও বেশি জেলে রয়েছে। এর মধ্যে সরকারিভাবে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৫০ হাজার ২৫২ এবং আইডি কার্ড রয়েছে ৪২ হাজার ৩২৬ জনের। মার্চ-এপ্রিল দুই মাস অভয়াশ্রমে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা চলাকালে জেলার ২৫ হাজার ৯৪৭ জেলে পরিবারকে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় চাল দেওয়া হয়। তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের এক মাস পার হয়ে গেলেও বেশির ভাগ জেলে প্রতিশ্রুত খাদ্যসহায়তা পাননি। কোনো কোনো ইউনিয়নে এখনো বিতরণই শুরু হয়নি। বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান না থাকায় দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছে জেলে পরিবারগুলো। আর সে কারণেই বাধ্য হয়ে তারা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নদীতে যাচ্ছেন মাছ শিকারে। আর পেটের তাগিদে অন্য কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে ধরা পড়ছেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের হাতে। এতে জেল-জরিমানার খড়্গও নেমে আসছে সহায়-সম্বলহীন এসব জেলেদের ওপর।

ভাগ্যবিড়ম্বিত এই জেলেদের অভিমত হচ্ছে, সরকারি নির্দেশনার দিকে তাকিয়ে থাকলে তাদের না খেয়ে মরতে হবে। ফেব্রুয়ারি থেকে চাল বিতরণের কথা থাকলেও, এখনো তার দেখা মেলেনি। কিন্তু জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদফতর থেকে বলা হয়, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে অভয়াশ্রম জেলেদের মাছ ধরা থেকে বিরত রাখতে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় জেলেদের জন্য ৪ হাজার ১৫১ দশমিক ৫২০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানরা ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত প্রতি মাসে প্রতি জেলে পরিবারের হাতে ৪০ কেজি করে চাল হস্তান্তরের কথা। এখানে উল্লেখ না করলেই নয়, সহায়তা না পেলে জেলেরা মাছ শিকারে নামবেন—এটাই স্বাভাবিক। তবে আমরা এই স্বাভাবিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। সরকারের ভালো কাজে কিছু ব্যক্তি তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কালিমালেপনের চেষ্টা করবেন আর আমরা তা প্রতিহত না করে উদাসীনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হব—এমনটা হতে দেওয়া যায় না। সরকার নিশ্চয়ই যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন—এটাই প্রত্যাশা।

পিডিএসও/হেলাল