নিরাপদ সড়ক একটি জাতীয় দাবি

প্রকাশ : ২২ মার্চ ২০১৯, ১২:৫০

সম্পাদকীয়

গত এক দশকে বাংলাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে ব্যাপক। আক্ষরিক অর্থেই মহাসড়ক হয়ে উঠেছে অনেক সড়কই। ফ্লাইওভার, ব্রিজ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দরসহ হয়েছে আরো অনেক কিছুই। কিন্তু এর সব উন্নয়নই অবকাঠামোগত। এতে সামাজিক মানসিকতায় প্রয়োজনীয় ইতিবাচক পরিবর্তন তেমন পরিলক্ষিত হয়নি। সড়ক একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানে নানা ধরনের জনসম্পৃক্ততা ও নিয়মরীতি আছে। ব্যবহারকারী মানুষের একটা পরিচিতি ও অভ্যস্ততার বিষয়ও বিদ্যমান। মানুষ অভ্যাসের দাস। তবে রাতারাতি এ অভ্যাস পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

আমরা প্রতিনিয়ত যা দেখি তা হলো, মানুষ যেখানে-সেখানে পার্কিং করে, রাস্তার ডান-বাম মানে না, ফুটপাত মানে না। এসব বিষয়ই অভ্যাসগত, যতটা না সচেতনতাবিষয়ক। আমরা প্রত্যেকেই এর কুফল নিয়ে ওয়াকিবহাল, তবু পরিত্যাগ করছি না কেউ। এখানে অভ্যাস পরিবর্তনে রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ভেতর দিয়ে যাতায়াতকারীদের অভ্যাসে পরিবর্তন আনা সম্ভব হলে বাইরে সম্ভব হবে না কেন! এ প্রশ্নে অনেকেই তুলেছেন। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে গাড়িচালক থেকে পথচারী সবাই সোজা হয়ে চলাচল করেন। অর্থাৎ সততার সঙ্গে প্রফেশনাল দায়িত্ব পালন করলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসতে বাধ্য। দায়িত্ব পালনে সততার অভাবজনিত কারণে আজ আমরা এ মহাসংকটে।

সড়কের প্রাত্যহিক ঘটনা পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সামাজিক এ প্রতিষ্ঠান ঘিরে কয়েকটি পক্ষের তীব্র প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতা অন্য কিছু নিয়ে নয়। বেশি বেশি অর্থ সংগ্রহের প্রতিযোগিতা। এখানে মূলত কয়েকটি পক্ষের মাঝে দড়ি টানাটানিটা। একটি পক্ষে মালিক ব্যবসায়ী। দিনশেষে যারা কেবল অর্থের পরিমাণের দিকেই তাকিয়ে থাকেন। অন্যদিকে সেই সড়কে ব্যবসাকে কেন্দ্র করে রয়েছে বিশাল শ্রমিকশ্রেণি। যাদের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে মালিকদের লাভের ওপর। মালিকরা অধিক লাভে শ্রমিকদের কাছে পরিবহন ভাড়া দেন তাদের লাভের অঙ্ককে বাড়িয়ে উচ্চহারের চুক্তিতে। আর শ্রমিকরা তাদের পেশার তাগিদে তা গ্রহণ করে বেশি ভাড়া আয়ের প্রতিযোগিতায় নামেন। আর এ ভয়াবহ প্রতিযোগিতায় সাধারণ মানুষ অকাতরে শামিল হয় মৃত্যুর মিছিলে।

গত ১০ বছরের অবকাঠামোগত পরিবর্তনের সঙ্গে সামাজিক মানসিকতার যে পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল, সেখানে ঘাটতি অনেক। এ দুয়ের সমন্বয় আজ জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেই বললেই চলে। ফলে সারা দেশে যে উন্নয়নের সড়ক-মহাসড়ক ইৈর হয়েছে, তা ব্যবহার করার সক্ষমতা গড়ে উঠেনি। না মালিক, না চালক, না প্রশাসন, না সাধারণ মানুষের মগজে ও মননে। এ সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সর্বাগ্রে রাষ্ট্রীয় তৎপরতার পাশাপাশি সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। এ সক্ষমতা কোনোভাবেই কোনো এক পক্ষের কাঁধে তুলে দেওয়া দায়িত্বশীলতার পরিচয় বহন করবে না। কেবল দক্ষ ড্রাইভার আর হেলপার তৈরি করলেই হবে না। এখানে সাধারণ মানুষের অভ্যাসের পরিবর্তনের পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে সততার জায়গায় ফিরে আসতে হবে। আর এ কাজে সমন্বয়কের দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকেই।

পিডিএসও/হেলাল