রাষ্ট্রের কাছে প্রবাসীদের অধিকার

প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০১৯, ১১:০৮

রায়হান আহমেদ তপাদার

তথ্যমতে বিশ্বের ১৫৭টি দেশে প্রায় ১ কোটির ওপরে প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন। এর মধ্যে জনবহুল তিনটি দেশ অর্থাৎ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ায় ভোটার করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রসঙ্গত, ১৯৯৮ সালে দেশের উচ্চ আদালত প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার সংবিধান স্বীকৃত বলে ঘোষণা দেন। এরপর ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে ড. এ টি এম শামসুল হুদার কমিশন। পাশাপাশি ড. হুদা কমিশন প্রবাসীদেরও ভোটার করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর অংশ হিসেবে তখন দুই নির্বাচন কমিশনার মুহম্মদ ছহুল হোসাইন ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বিদেশ সফর করেন। এরপর কেটে যায় আরো ১০ বছর। কিন্তু প্রবাসীদের ভাগ্য বদলায়নি আজও।

বাংলাদেশ সত্তরের দশক থেকেই জনশক্তি রফতানি করছে। শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির প্রধান বাজার। আশির দশক থেকে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশে জনশক্তি রফতানি শুরু হয়। লিবিয়া, সুদানসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশেও তখন থেকেই জনশক্তি রফতানি শুরু হয়। নব্বইয়ের দশক থেকে দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রুনাই, মিসর, মরিশাসসহ কয়েকটি নতুনবাজার সৃষ্টি হয়। নতুন সহস্রাব্দে ব্রিটেন, ইতালি, জাপানসহ এশিয়া ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে সৃষ্টি হয় জনশক্তির চাহিদা। বিগত কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ অ্যামেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশের জনশক্তির বাজার উন্মুক্ত হয়েছে। ইরাক, আফগানিস্তান, থাইল্যান্ড, স্পেন, তিউনিশিয়া, চিলি, পেরুসহ শতাধিক দেশে বাংলাদেশ বর্তমানে জনশক্তি রফতানি করছে।

এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবে ২৬ লাখ ৭৭ হাজার ৪৩৬, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৩ লাখ ৪৯ হাজার ৬৭২, কুয়েতে ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৬১২, ওমানে ১০ লাখ ৪৬ হাজার ৫১, কাতারে ৪ লাখ ৪৯ হাজার ২৫, বাহরাইনে ৩ লাখ ১৫ হাজার ১২৪, ইরাকে ৩৬ হাজার ৭৯৫, লেবাননে ১ লাখ ২৯ হাজার ৩৪২ ও জর্ডানে ১ লাখ ৩ হাজার ২৭০ জন বাংলাদেশি শ্রমিক হিসেবে গেছেন। আফ্রিকার লিবিয়ায় ১ লাখ ২২ হাজার ১২৫, সুদানে ৮ হাজার ৫১২, মিসরে ২১ হাজার ৮৯০ ও মরিশাসে ৪৩ হাজার ৯৮৪ জন বাংলাদেশি গেছেন শ্রমিক হয়ে। এছাড়া যুক্তরাজ্যে ১০ হাজার ৭০ ও ইতালি গেছেন ৫৫ হাজার ৫১৪ বাংলাদেশি শ্রমিক জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ১৬২টি দেশে ১ লাখ বাংলাদেশি কর্মী আছেন। প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১৩ ভাগ। পোশাক খাতকে ছাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রার জন্য এটিই শীর্ষ খাত।

প্রবাসীদের আয়ে কয়েক বছর কিছুটা ভাটা চললেও এখন আবার ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীরা ১ হাজার ৭৬ কোটি ১২ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন। গত অর্থবছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৯১৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। সেই হিসেবে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে প্রবাসী আয় বেড়েছে ১৭ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে রেমিট্যান্স আসে ১১৬ কোটি ডলার। নভেম্বরে ১২১ কোটি ৪৭ লাখ ডলার, অক্টোবরে ১১৬ কোটি ২৭ লাখ ডলার, সেপ্টেম্বরে ৮৫ কোটি ৬৮ লাখ ডলার, আগস্টে ১৪১ কোটি ৪৫ লাখ ডলার এবং অর্থবছরের শুরুর মাস জুলাইয়ে ১১৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠান প্রবাসীরা।

উল্লেখ্য, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৪৯৩ কোটি ১১ লাখ ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আসে ১ হাজার ৫৩১ কোটি ৬৯ লাখ ডলার আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রেমিট্যান্স আসে ১ হাজার ৪২২ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। ১৯৭৬ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত প্রবাসী কর্মীদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৭ লাখ ৭২ হাজার ৬৯৯ শত কোটি টাকা। এশিয়ার অন্যান্য দেশের মধ্যে মালয়েশিয়ায় ৭ লাখ ১০ হাজার ১৮৮, সিঙ্গাপুরে ৫ লাখ ৮৫ হাজার ২৩৯, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৩৩ হাজার ১১৫, জাপানে ১ হাজার ৩৬৬, ব্রুনাইয়ে ৫১ হাজার ৩৪ এবং অন্য দেশে ১ লাখ ১০ হাজার ২০৩ জন বাংলাদেশি বিভিন্ন কাজ নিয়ে গেছেন। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বাংলাদেশর ৫০ লাখের বেশি কর্মী আছেন। শ্রমিক ছাড়াও বাংলাদেশের অনেক নাগরিক ইউরোপ-অ্যামেরিকাসহ উন্নত বিশ্বে উচ্চপদে কাজ করছেন, ব্যবসা করছেন, করছেন গবেষণা এবং পড়াশোনা। সেই হিসেবে ১ কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশি এখন প্রবাস জীবনযাপন করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, লাশ পাঠাতে চাঁদা তুলতে হয়। অথচ আমাদের পাশের দেশ ভারত বা শ্রীলঙ্কান প্রবাসীরা যে মর্যাদা পান, আমরা কিন্তু তা পাই না। আমরা মুখে মুখে অনেক কথা বলি। কিন্তু বাস্তবে তারা নানা রকমের হয়রানির শিকার হন। তারা যাওয়ার সময় পাসপোর্ট করা থেকে শুরু করে বিমানবন্দর, দূতাবাস সবখানেই হয়রানির শিকার হন। আবার আসার সময়ও একই ধরনের হয়রানির শিকার হন। এমনকি প্রবাসীদের ভোটাধিকারও এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। তারা রাষ্ট্রকে যে পরিমাণ দিচ্ছেন, সেই তুলনায় রাষ্ট্রের কাছ থেকে পান না কিছুই।

শুধু তাই নয়, এখান থেকে প্রবাসীরা তাদের চাহিদামতো ঋণও পান না। জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রার মহাসচিব রুহুল আমিন স্বপন ডয়চে ভেলেকে বলেন, আগে প্রবাসী কর্মী মারা গেলে ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পেতেন। এখন সেটা বাড়িয়ে ৩ ও ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। তারা আগের চেয়ে কম সুদে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে অভিবাসন ব্যয় মেটানোর ঋণ পান। এখন ‘ডাটাবেজ’ হওয়ার কারণে সেখানে রেজিস্ট্রেশন করে আগের চেয়ে কম খরচে কর্মীরা বিদেশে যেতে পারেন। জেলায় জেলায় এখন সরকারের উদ্যোগে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হওয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়ে কম খরচে বেশি বেতনের চাকরিতে যাওয়া যায়। স্মার্টকার্ড এবং মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট হওয়ায় এখন প্রতারণা সম্ভব নয়। এই সব সুবিধা আগে ছিল না। প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং নানা ঘটনায় তাদের সহায়তা দেওয়া এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য যেখানে আমাদের কর্মীরা বেশি আছেন, আমরা সেসব দেশের দূতাবাসে ‘লিগাল’ এবং ‘মিডিয়া উইং’ খোলার কথা বলছি। কারণ লেবার উইং দিয়ে সব কিছু করা সম্ভব নয়। তাছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্মার্টকার্ড প্রদান এবং মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের মেয়াদ ১০ বছর করার দাবি জানিয়েছেন ব্রিটিশ বাংলাদেশি আইনজীবীরা। সম্প্রতি লন্ডনে সেন্টার ফর ব্রিটিশ বাংলাদেশি পলিসি ডায়ালগ-সংক্ষেপে সিবিপিডির উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানিয়ে আইনীজীরা আরো বলেন, সরকার আন্তরিক হলে, বিদেশে বাংলাদেশি মিশনের মাধ্যমেই প্রবাসীদের এই সার্ভিস দেওয়া সম্ভব। এই দাবি আদায়ের জন্যে প্রবাসীদের সোচ্চার হওয়ার জন্য লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তা জানানো হয়।

নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট উল্লিখিত তথ্যানুযায়ী অন্তত ২২টি ক্ষেত্রে স্মার্টকার্ড আবশ্যক করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, অর্থ লেনদেন, জায়গা-সম্পত্তি বিক্রিসহ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে কিছু করতে হলে স্মার্টকার্ড দেখাতে হবে। কিন্তু অনেক প্রবাসীদের স্মার্টকার্ড না থাকার কারণে এরই মধ্যে বাংলাদেশে বিভিন্নভাবে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। তারা দেশে গিয়ে জায়গা-সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় করতে পারছেন না। ব্যাংকে জমা করা টাকায় হাত দিতে পারছেন না। তাই এ বিষয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয় সংবাদ সম্মেলন থেকে। অন্যদিকে মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের মেয়াদ পাঁচ বছর রাখার কারণেও প্রবাসে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা বিভিন্নভাবে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।

উল্লেখ্য, আমাদের কর্মীরা ওইসব দেশের আইন সম্পর্কে জানেন না। তাদের কাছে জরুরি তথ্যও থাকে না। ফলে তারা আইনি সুরক্ষা পান না। অনেক ক্ষেত্রে হয়রানিরও শিকার হন। আমাদের দেশ থেকে কর্মী পাঠানো হয় এমওইউ’র মাধ্যমে। তাই নানা ধরনের আইনি অধিকার অনেক সময় আদায় করা সম্ভব হয় না। আমাদের দেশ থেকে চেষ্টা করেও লেবার রিসিভিং কান্ট্রিগুলোকে আমরা আইনের আওতায় আনতে পারিনি। তাই সব প্রবাসীদের প্রস্তাব হচ্ছে, দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে কর্মী পাঠানো। এটা সম্ভব হলে অনেক সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে। সরকার সম্প্রতি দুবাইতে নিরাপদ অভিবাসনের জন্য হোম করার কাজ শুরু করেছে। বিশেষ করে ‘ডমেস্টিক ওয়ার্কার’ বা গৃহকর্মীদের জন্য। বলা বাহুল্য, গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া নারীরা সবচেয়ে বেশি ‘অ্যাবিউজড’ হচ্ছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবাসী কর্মীদের এই বিপুল অবদানের বিপরীতে তাদের জন্য কী করছে সরকার? বিশ্লেষকরা বলেন, বিদেশে বাংলাদেশের কর্মীদের সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। ওই দেশের আইনে বাংলাদেশের কর্মীরা যেন সুরক্ষা পান, তার ব্যবস্থা বাংলাদেশের সরকারকেই করতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
raihan567@zahoo.com

পিডিএসও/হেলাল