বিশ্বের অর্ধেক মানুষ এখনো গরিব

প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:১৭

মোহাম্মদ আবু নোমান
ama ami

এটা কোনো গুজব নয়! সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘প্রভার্টি অ্যান্ড শেয়ার প্রসপারিটি বা দারিদ্র্য ও সমৃদ্ধির অংশীদার ২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঁচটি দেশেই বিশ্বের অর্ধেক গরিব লোক বাস করে। এই দেশগুলোর মধ্যে একটি বাংলাদেশ। বাকি দেশগুলো ভারত, নাইজেরিয়া, কঙ্গো ও ইথিওপিয়া।

ইতোপূর্বে অনেক ঢাক-ঢোল পেটানো হয়েছিল—দেশে নাকি কোনো গরিব নেই, গরিব থাকবে না! আমরা নাকি বিশ্বের মডেল, সবাই আমাদের অনুসরণ করছে! অথচ স্বাধীনতা-পরবর্তী গত প্রায় পাঁচ দশকে এদেশে অনেকটাই ‘গরিব পোষার রাজনীতি’ চলেছে। এ দেশের সরকারগুলো যেমন মুদ্রাস্ফীতির মতো জনসংখ্যাস্ফীতির সুফল ভোগ করছে, ঠিক একই অনৈতিক সিস্টেমের সুবিধা নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা ও উপযুক্ত শিক্ষার অভাব থাকায়, ব্যবসায়ীরা এই বিপুল জনসংখ্যা নিয়ে বাণিজ্য করছেন। এই খেটে খাওয়া মানুষের যথাযথ পারিশ্রমিক না দিয়েই ‘অতি ধনী’ অথবা রাষ্ট্রের তহবিল তছরুফ (দুর্নীতি) করে বিশ্বে ধনকুবের বৃদ্ধির উত্থানে শীর্ষে আমরা! এই গরিবীর খবর অতি ধনীর বা ধনকুবের কাছে যেমন আনন্দের ও বিশ্বাসের! একই ব্যক্তিরাই আবার দ্রুত ধনী হওয়া দেশ, কিংবা ভবিষ্যতের উন্নত জিডিপি গ্রোথের বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টে চিত্তানন্দ উপভোগ করে থাকেন!

গরিব মানুষদের নিয়ে রাজনীতি করা অনেক সহজ। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কম টাকায় গরিব মানুষকে ভাড়া করা যায়। আবার ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা খুব সহজেই এদের রক্ত চুষে খান! গরিবের সবরকম অধিকার হরণ করা যায়। কারণ, গরিবরা নিজেদের পেটের চাহিদা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। তারা অধিকার আন্দোলন খুব কমই বুঝে। মনে রাখতে হবে, এখনও মানুষ অভাব অনটনে জর্জরিত হয়ে ভিটেমাটি বিক্রি করে, পরিবারের মায়া ত্যাগ করে একটু সচ্ছলতার আশায় নিজের জীবনকে বাজি রেখে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। এখনো যে দেশের অনেক মানুষ তিন বেলা পেটপুরে খেতে পায় না। ডিগ্রি বা মাস্টার্স পাস হকার বা ফেরিওয়ালা বেশুমার। সে দেশে শুধু ‘সূচক’ কাজির কাগজে-কলমে নয়, আগে সর্বসাধারণের বেঁচে থাকার ন্যূনতম জীবনমানের পর্যায় থাকাই প্রথম। না খেয়ে, ক্ষুধার্থ থেকে কেউই সুন্দর বা উন্নয়নশীল দেশ চাইতে পারে না। আগে মানুষ খেতে চায়, পরতে চায়, নিরাপত্তা চায়। কার আমলে মানব উন্নয়ন সূচক কত বেড়েছে তা সাধারণ মানুষের দেখার বিষয় নয়। কে কত কোটি টাকা বিদেশে পাচার করল তা-ও সাধারণের জেনে লাভ নেই। জনগণ নিজে সারা দিন খেটে দুই মুঠো ডাল-ভাত খেয়ে আর নিজের পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তা নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়।

সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার সঠিক পথে নেই। শ্রমবাজারে অনানুষ্ঠানিক খাতের বিস্তার ঘটছে। বেকারত্বের হার বেড়ে ২০১৬-১৭ সাল নাগাদ ৪ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। যদিও ২০২০ সালের মধ্যে তা ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য আছে। এ দেশের মানুষের আয় বাড়ছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। ২০২০ সালের মধ্যে এই আয় আরও ২০ শতাংশ বৃদ্ধির ও রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এখন আছে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। তাই এত অল্প সময়ে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির যে হার নির্ধারণ করা হয়েছে, তা কী সম্ভব?

যে দেশে গরিব থাকে; যে দেশে গরিবের বসবাস, সে দেশকে তো সবাই গরিবই বলবে। চারপাশে তাকালেই বোঝা যায়, আমাদের দেশে কত গরিব লোক বাস করে। যারা চায় বাংলাদেশ এগজিস্টিং দরিদ্রতা থেকেও মুক্তি। তাহলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শ্রমের মূল্য বাড়াতে হবে। বেকারদের কর্মসংস্থান ও প্রান্তিক লোকজনের সঙ্গে মধ্যবিত্ত আর ধনীদের বেতন ও মাথাপিছু আয়ের ফারাকটা কমাতে পারলে মধ্যম আয়ের দেশ হতে চার থেকে পাঁচ বছরের বেশি সময় লাগার কথা নয়।

গত সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্স বলেছে, অতি ধনী বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ প্রথম। সম্প্রতি একই প্রতিষ্ঠান আরেকটি প্রতিবেদনে বলেছে, ধনী বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ তৃতীয়। আগামী পাঁচ বছর বাংলাদেশে ধনী মানুষের সংখ্যা ১১ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বাড়বে। যে পাঁচটি দেশে বিশ্বের অর্ধেক গরিব লোক বাস করে, বিশ্বব্যাংক ২০১৮ সালে এসে ওই পাঁচটি দেশে কত গরিব লোক বাস করে, সেই হিসাবও দিয়েছে। সেই হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১ কোটি ৬২ লাখ মানুষের দৈনিক আয় ১ ডলার ৯০ সেন্টের কম, অর্থাৎ ১৬০ টাকার নিচে! আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখা অনুযায়ী, এরা গরিব।

দেশে অতি ধনীর সম্পদ বাড়ছে। এর একটা ভালো দিক হলো, দেশের সম্পদ বাড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সে সম্পদ কী তারা সঠিক পথে আয় করেছেন? তার ন্যায্য আয়কর কী তারা দেন? নাকি ওভার ইনভয়েস করে সে টাকা বিদেশে পাচার করে দেন? বুঝতে হবে, ৫ থেকে ১০ হাজার ধনীর সম্পদ বাড়লে দেশের লাভ নেই। তার চেয়ে শিক্ষিত বেকার মানুষের কর্মসংস্থান বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া জরুরি, যেটা বর্তমানে খুব বাজে অবস্থায় আছে। বর্তমানে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ তরুণ-তরুণী রয়েছেন যারা কোনো কাজ করেন না, আবার পড়াশোনাও করছেন না। এ হার দেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ প্রায়। তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বেকারত্ব বেশি, এটা দেশের অন্যতম জ্বলন্ত সমস্যা। যা বড়ই উদ্বেগের বিষয়। এমন তরুণ-তরুণীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অথচ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে ২০২০ সালের মধ্যে কাজ ও পড়াশোনা কোনোটিই করেন না, এমন তরুণ-তরুণীর হার ২২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসডিজিতে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য রয়েছে, একথা ইতোপূর্বে অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেছেন। মূল কথা হলো, লক্ষ্য যে উচ্চাভিলাষী তা কেউ স্বীকার করুক বা নাই করুক, একথা তো ঠিক যে, এসডিজির এই লক্ষ্য অর্জনে বেসরকারি খাতের সহযোগিতা অতি জরুরি।

তরুণ-তরুণীদের মধ্যে উৎপাদনশীল খাতে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। বড় ডিগ্রির সার্টিফিকেটের চেয়ে দক্ষতাভিত্তিক ছোট সার্টিফিকেটের ডিমান্ড বেশি। এই কারণেই হাজার হাজার উচ্চ সার্টিফিকেটধারী বেকার। লেখাপড়া করে ফেলেছি, এখন আমার বড় অফিসার হতেই হবে, এ মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে। আধুনিক কৃষি, পশুপালন, মৎস্য খামারের মতো উদ্যোক্তা হওয়ার কাজ তারা করবেন কেন? সবাই বিসিএস দিবেন। চান্স না পেলে প্রেসক্লাবের সামনে চাকরির বয়স বাড়ানোর জন্য আন্দোলন করবেন...! নব উদ্যোক্তাদের জন্য বাধা ও সমস্যার কারণও রয়েছে। এলাকায় গিয়ে কিছু করতে গেলেই, এদের বিরুদ্ধে কুৎসায় লিপ্ত হয় তথাকথিত কিছু মুরুব্বি প্রতিবেশি। এজন্য সমাজের মানুষগুলো অনেকাংশে দায়ী। প্রথমে আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে, নিজে নিজে চলা শিখতে হবে। দেশে কোনো মানবসম্পদ পলিসি নেই। এ দেশে যে যার মতো পড়ালেখা করছেন। কিন্তু পড়ালেখা শেষে তিনি কী করবেন তার কোনো ধারণাই রাখা হয় না। ফলে শিক্ষাজীবন শেষে বেকারত্ব। অথচ দেশে এমন বহু খাত আছে যেখানে দক্ষ জনবলের অভাব প্রকট।

বিশ্বব্যাংকের ‘প্রভার্টি অ্যান্ড শেয়ার প্রসপারিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা বিশ্বে এখন দৈনিক ১ ডলার ৯০ সেন্টের কম আয় করেন এমন দরিদ্র লোকের সংখ্যা ৭৩ কোটি ৬০ লাখ। তারা হতদরিদ্র হিসেবে বিবেচিত। এর মধ্যে উল্লিখিত পাঁচটি দেশেই বাস করে ৩৬ কোটি ৮০ লাখ গরিব লোক। এটা আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখা হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্বব্যাংক ২০১৮ সালে এসে ওই পাঁচটি দেশে কত গরিব লোক বাস করে, সেই হিসাবও দিয়েছে। সেই হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১ কোটি ৬২ লাখ মানুষের দৈনিক আয় ১ ডলার ৯০ সেন্টের কম। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখা অনুযায়ী, এরা গরিব। এছাড়া ভারতে ৯ কোটি ৬৬ লাখ, নাইজেরিয়ায় ৯ কোটি ৯২ লাখ, কঙ্গোয় ৬ কোটি ৭ লাখ এবং ইথিওপিয়ায় ২ কোটি ১৯ লাখ গরিব মানুষ বাস করে।

স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়া বা প্রমোশন পাওয়া জাতির জন্য বিরাট অর্জন হলেও একই সঙ্গে এটি হবে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। বড় অর্জনে চ্যালেঞ্জও অনেক বেশি। আলোর উল্টোপাশেই যেমন অন্ধকারের বাস, তেমনই এই সুসংবাদের উল্টোপিঠে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হবে দেশকে। দেশ এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। এখনো বাংলাদেশের বাজেটে আয় হিসেবে বিপুল অংকের বৈদেশিক ঋণের কথা উল্লেখ করতে হয়। তারপরও এখন থেকে যথাযথ প্রস্তুতি নিলে বাংলাদেশ তার সুফল নিতে পারবে। প্রশ্ন হচ্ছে আমরা যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পারব কী? যে দেশে দুর্নীতি কোথায় আছে না বলে, দুর্নীতি কোথায় হয় না বলতে হবে। যে দেশের রিজার্ভের টাকা চুরি হয়, ব্যাংক লুট হয়, শেয়ার মার্কেট দেউলিয়া হয়, সে দেশে এসব বিষয়ে ঠিকমতো পরিকল্পনা না থাকলে, রাষ্ট্রও দৈন্যদশাগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে।

এমন লাখো মানুষ রয়েছে, যাদের একমাসের বেতন দিয়ে ১৫ দিনও সংসার চালাতে কষ্ট হয়। এছাড়া পরের দেশে কামলা না খাটলে আমাদের অনেকের ফ্যামিলি না খেয়ে থাকতো। গুটিকয়েক মানুষ নয়-ছয় করে প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হয়েছেন। আর সেগুলোয় মাথাপিছু আয় হিসাবে দেখিয়ে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা নেওয়া হচ্ছে। যদি বলতেই হয় উন্নয়ন হচ্ছে, তাহলে বলতে হবে কিছু অসাধু লোক সম্পদের পাহাড় গড়েছে। ফলে বৈষম্য অনেক বাড়ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় একশ্রেণির শুধু সম্পদ বাড়বে, আর গরিবরা চিরকাল গরিবই থেকে যাবে? এ খবরে আমরা কি গর্বিত, না কলুষিত হচ্ছি? এটা দেশের জন্য মোটেই ভালো খবর নয়। এতে গৌরব করার মতো কিছু নেই।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
abunoman1972@gmail.com

পিডিএসও/হেলাল