সৃষ্টি-সুখের সন্ধানে

প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:০৯

এস এম মুকুল
ama ami

‘আজ থেকে বিশ বছর পর আপনি এই ভেবে হতাশ হবেন যে, আপনার পক্ষে যা যা করা সম্ভব ছিল, তা করতে পারেননি। তাই নিরাপদ আবাস ছেড়ে বেরিয়ে পড়ুন। আবিষ্কারের জন্য যাত্রা করুন, স্বপ্ন দেখুন আর শেষমেশ আবিষ্কার করুন—এমন অবিস্মরণীয় বাণীটি বিখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক মার্ক টোয়েনের। সৌন্দর্যপিপাসু মানুষদের কাছে ভ্রমণ একটি প্রিয় শখ। এ যেন সৌন্দর্য আবিষ্কারের নেশার মতো। ভ্রমণ কমবেশি সবাই ভালোবাসেন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করে দেখো, আল্লাহ কীভাবে সৃষ্টির সূচনা করেছেন, অতঃপর তিনিই আবার সৃষ্টি করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ের ওপর সর্বশক্তিমান।’ (সুরা আনকাবুত : ২০)। জ্ঞান অন্বেষণের জন্য রাসুল (সা.) ভ্রমণের প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে বলেছেন : ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অন্বেষণে রাস্তায় বের হবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে যাওয়ার পথ সহজ করে দেবেন।’

ইংল্যান্ডের পর্যটন সমিতির মতে, পর্যটন এক ধরনের অস্থায়ী, ব্যক্তির নির্দিষ্ট স্থানে স্বল্পকালীন চলাচলবিশেষ, যা নিজস্ব আবাসস্থল, কর্মক্ষেত্রের বাইরের কর্মকাণ্ড। এ ছাড়া এতে সব ধরনের উদ্দেশ্যমালা অন্তর্ভুক্ত থাকে। আমরা জানি, পর্যটনশিল্প, দর্শনীয় স্থান, ভ্রমণ সাহিত্য ও ভ্রমণ ইতিহাস একটি চমকপ্রদ বিষয়। মুসলিমদের মধ্যে সুলায়মান সায়রাফী, ইবনে বতুতা, আলবেরুনি, আরবের হিরোডটাস নামে খ্যাত আল মাসউদি বিখ্যাত পর্যটক ও ভ্রমণ ইতিহাসবিদ হিসেবে বিশ্বনন্দিত। তারা ভ্রমণ সাহিত্য রচনা করে খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেছেন। যদিও আমরা ভ্রমণ মানেই বিলাসিতা মনে করি আসলে ভ্রমণ কোনো বিলাসিতা নয়।

ভ্রমণ আমাদের মস্তিষ্ককে সৃষ্টিশীল করে তোলে, মানসিক স্বাস্থ্যও উন্নত হয়। বেশি সময় ধরে একটানা পড়াশোনা, পরীক্ষা কিংবা ক্রমাগত কাজের চাপে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে আসে অর্থাৎ ফলে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তখন মস্তিষ্কের জন্য প্রয়োজন বিশ্রাম ও স্বস্তি। তাই সে সময় ভিন্ন পরিবেশে ভ্রমণের মাধ্যমে মানসিক বিনোদন মস্তিষ্ককে ফুরফুরে করে তুলতে পারে। শিশুদের মননশীলতা, জ্ঞান ও স্মৃতির বিকাশে ভ্রমণ খুবই ফলদায়ক। আমরা দেখতে সচরাচর পাই, শিশুরা ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে। কিন্তু ব্যস্ততার অজুহাতে তাদের চাহিদা পূরণে অনাগ্রহ দেখান অভিভাবকরা। এমনটি মুটেও ঠিক নয়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের বলে থাকেন—ভ্রমণ হলো শিশুর সুষম বিকাশে সহায়ক কাজ। শিশুরা পরিবেশের চারপাশ থেকে যা দেখে তা থেকে জানে ও শেখে। ভ্রমণে তারা নতুন নতুন অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ জীবনকে সুন্দর করে তুলতে পারে।

ইউএস ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশনের একটি সমীক্ষা বলছে, ভ্রমণ বয়স্ক, অবসরপ্রাপ্ত মানুষদের ডিমেনশিয়া, অ্যালঝেইমারসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। আবার এই সমীক্ষাতেই দেখা গেছে, যারা নিয়মিত বেড়াতে যান তাদের মধ্যে ৮৬ শতাংশ মানুষই নিজেদের জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট। জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও অনেক স্বচ্ছ হয়েছে। ভ্রমণ মানুষের জ্ঞানের বিকাশ, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য অতি আবশ্যিক বিষয়। লাইফহ্যাকের ভ্রমণ লেখিকা লরেন কুরাতোলার ভ্রমণ সম্পর্কিত স্বাস্থ্য সমীক্ষার রিপোর্টে অধ্যাপক ও ভ্রমণ লেখক অ্যাডাম গ্যালিনস্কির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, নিজের জায়গা ছেড়ে অন্য দেশ, শহর, রাজ্যে ভ্রমণ আমাদের শেখার ক্ষমতা ও চিন্তার গভীরতা বাড়ায়। ভ্রমণের মানুষ সর্বজনীন ও মানবীয় হতে শেখে। কেননা ভ্রমণের মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্ম, পেশা ও বর্ণের মানুষের সাথে মেলামেশার সুযোগ ঘটে। আর এভাবে একজন ভ্রমণকারী বিভিন্ন বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করতে শেখে। ভ্রমণের আরো দিকগুলো হচ্ছে—নতুন স্থান, যোগাযোগ-যাতায়াত, জাতি-গোষ্ঠি-সম্প্রদায়, আঞ্চলিক ভাষা, দৃশ্য, প্রসিদ্ধ বিষয় প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে জানার সুযোগ ঘটে। বিভিন্ন বিশ্লেষণ থেকে দেখা গেছে—বাংলাদেশের ভ্রমণপিপাসুদের আছে অর্থনৈতিক বাধা, নিরাপদ যাতায়াতের অনিশ্চয়তা, ট্যুরিজম স্পটে নিরাপত্তার ঘাটতি অন্যতম অন্তরায়। তারপরও ভ্রমণে জনপ্রিয়তা বাড়ছে। সচ্ছল পরিবারগুলো সাপ্তাহিক ছুটিতে ঘুরে বেড়ানোর ক্ষেত্রে একটি ট্রেডিশন তৈরি হচ্ছে। সৃষ্টি-সুখের আনন্দে মানুষ এখন দলবেঁধে ভ্রমণে বের হচ্ছে—দেশ থেকে দেশান্তরে। দ্য ফ্রেমিংহ্যাম হার্ট স্টাডি অনুযায়ী, যারা বহু বছর কাজ থকে ছুটি নিয়ে বেড়াতে যাননি, তাদের হার্টের অসুখে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। অন্যদিকে, যারা বছরে অন্তত একবার নিয়ম করে বেড়াতে যান তাদের এই ঝুঁকি অনেক কম। তার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ছুটি নিয়ে পেশা বা বাড়ি থেকে কিছুদিন দূরে থাকলে মানসিক উৎকণ্ঠায় কম ভোগেন।

হঠাৎ করেই ঘুরতে বেরিয়ে পড়লে নানা রকমের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে পারেন। সব কাজের আগেই সঠিক পরিকল্পনা করা ভালো। ভ্রমণের ক্ষত্রে যত দিন থাকবেন সে অনুসারে প্রয়োজনীয় তথ্য ও জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়া খুবই জরুরি। ভ্রমণের আনন্দকে সুন্দর ও পরিপূর্ণ করার জন্য যা প্রয়োজন ক্যামেরা, আবহায়ার উপযোগী পোশাক, প্রয়োজনীয় ওষুধ, খাবার স্যালাইন, খাবার পানির বোতল, স্যান্ডেল, রাতে ঘুমানোর জন্য আরামদায়ক পোশাক, মোবাইল ফোন ও চার্জার, চশমা, টুথপেস্ট, টুথব্রাশ, শেভ করার সরঞ্জাম। যেখানে ভ্রমণে যাবেন সেখানকার আবহাওয়া, প্রাকৃতিক অবস্থান, যাতায়াত-যোগাযোগ ব্যবস্থা, খাবার-দাবার সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা নিন। এটিএম কার্ড কিংবা চেক বই অথবা টাকা-পয়সা সাবধানে রাখুন। ভ্রমণে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র-পাসপোর্ট এবং ভিসা, ভ্রমণ বিমা ইত্যাদি ফটোকপি ও স্ক্যান করে সঙ্গে রাখুন। ভ্রমণের সময় আগন্তুক কিংবা অপরিচিতদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলুন। কোথাও ভ্রমণে গিয়ে বিত্তবৈভব কিংবা আপনার প্রাচুর্যতা দেখাতে যাবেন না। সে ক্ষেত্রে তা হিতে বিপরীত হতে পারে, মুখোমুখি হতে পারেন নানা ঝামেলার। দামি জিনিসপত্র বিশেষ করে স্বর্ণালঙ্কার ও ক্যামেরার কারণে ছিনতাইকারীদের টার্গেট হতে পারেন আপনি। অতিরিক্ত খাবার না খাওয়াটাই উত্তম, এতে আপনি অসুস্থ হয়ে যতে পারেন। পর্যটন এলাকায় নিষিদ্ধ স্থানে বা নিষিদ্ধ কোনো কাজ কোনো অবস্থাতেই করবেন না।

লেখক : উন্নয়ন গবেষক এবং বিশ্লেষক
writetomukul36@gmail.com

পিডিএসও/হেলাল