মতামত

পরাধীন সময়ের দৃশ্যায়ন

প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১০:৩৮ | আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১৫:০৮

ওয়াহিদ জালাল
ama ami

আমি আর কিছু বুঝি না। যে সন্তানদের সামনে তাদের মাকে চরম পাশবিকতায় ধর্ষণ করা হলো, নির্মম অত্যাচার করা হলো দলবেধে, আর সেই মাত্রাতিরিক্ত নীপিড়ন সহ্য করতে না পেরে অবশেষে চারটি অবুঝ সন্তান রেখে হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরায় তাদের মা, এই সন্তানগুলো তাদের জীবনের এই দুর্বিসহ স্মৃতি নিয়ে চিরকাল কি করে বেঁচে থাকবে? কিভাবে ভুলবে তাদের প্রিয় মাকে লাঞ্ছনার এই জঘন্যতম ঘটনা? স্বাভাবিক মানসিকতা কি কোনোদিন ফিরে পাবে তারা?

বাবাকে হাত-পা বেধে এবং তাদেরকে ঘরে আটকে রেখে, উঠোনে ফেলে হিংস্র পশুরা পালাক্রমে ধর্ষণ করছে তার মাকে, আর চিৎকার করে রাতের আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে সাহায্যের জন্য কাতরাচ্ছে নিরপরাধ অসহায় চার সন্তানের জননী। ভাবতেই গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়, মনে পড়ে ঊনিশশো একাত্তরের কথা। হুবহু এভাবেই দৃশ্যায়িত হতো তখন স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার জন্য ঘটে যাওয়া আমাদের সেইসব দৃশ্যগুলো। কিন্তু সেই নির্মম অত্যাচার আমরা মেনে নিয়েছিলাম দাঁতে দাঁত চেপে, একটা ভীষণ রকম আশায়। আজ কেন মানবো? আজ তো স্বাধীনতার লাল টকটকে সূর্য শোভিত করে রেখেছে আমাদের প্রিয় পতাকার নির্দিষ্ট আয়তন। আজ কেন প্রিয় স্বাধীন দেশে আমাদের দেখতে হবে সেই সব পরাধীন সময়ের দৃশ্যায়ন?

যেকোনো মানুষ অপরাধ করতে পারে, মানুষের চরিত্র স্বাভাবিকভাবেই বদলে যায়। ভুলের বিচার আছে, সমাজ ও পরিবার তার বিচার করতে পারে। তাই বলে হত্যা কিংবা ধর্ষণের মতো জঘন্য কাজটি করার অধিকার কারোরই নেই। আর কি অপরাধ ছিল তার? ভোটাধিকার প্রয়োগ একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার, আর সেই অধিকার বলে, তার পছন্দমতো দলকে সে ভোট দিতেই পারে এবং তাতে যদি বাধা আসে সে নির্দ্বিধায় প্রতিবাদ করতেই পারে। তার জন্য এতটা হিংস্রতা? এতটা অমানবিকতা? ন্যাক্কারজনক এসব ঘটনা ঘটেই চলেছে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের জমিনে। বিষয়টি নিয়ে যেন কারো কোনো কিছু যায় আসে না ভাব। 


আজীবন বিভীষিকাময় এই দুঃস্বপ্ন বয়ে বেড়াবে নিষ্পাপ শিশুগুলো। প্রতিশোধের আগুন যদি দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে তাদের বুকে এবং একদিন মায়ের উপর নির্দয় অত্যাচার ও বিচারহীনতার চাপা ক্ষোভ যদি তাদেরও তাড়িত করে অপরাধী হতে, তবে কে তার দায় বহন করবে? এভাবেই একটি অন্যায়, অবলীলাক্রমে জন্ম দেয় আরেকটি অন্যায়ের। একটি বিচারহীনতা মজলুমকে নীরবে ঠেলে দেয় আরেকটি বিচারের কাঠগড়ায়


কি বেদনা নিয়ে আজকের সূর্য আকাশের বুক চিড়ে বেরিয়ে এলো। যে মাকে তার সন্তানদের সামনে এরকম জীবন মৃত্যুর লড়াই করতে হচ্ছে, সে মা আজ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলে, জীবনের মতো সুন্দর ভবিষ্যতের পথ তাদের কে দেখিয়ে দিবে? সব সময়ের মতো কিছু আশা আর ভরসা দিয়েই একদম নীরবে নিভৃতে বসে থাকবে বিশ্বাসের জবান। আজীবন বিভীষিকাময় এই দুঃস্বপ্ন বয়ে বেড়াবে নিষ্পাপ শিশুগুলো। প্রতিশোধের আগুন যদি দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে তাদের বুকে এবং একদিন মায়ের উপর নির্দয় অত্যাচার ও বিচারহীনতার চাপা ক্ষোভ যদি তাদেরও তাড়িত করে অপরাধী হতে, তবে কে তার দায় বহন করবে? এভাবেই একটি অন্যায়, অবলীলাক্রমে জন্ম দেয় আরেকটি অন্যায়ের। একটি বিচারহীনতা মজলুমকে নীরবে ঠেলে দেয় আরেকটি বিচারের কাঠগড়ায়। 

পৃথিবীতে কোথাও এমন কোন দৃষ্টান্ত নেই যে, উপযুক্ত শাস্তি ছাড়া কোনো অপরাধ কম হয়েছে অথবা বন্ধ হয়েছে। একজন অপরাধী, শুধুই অপরাধী। সে কোনো দলের, কোনো জাতির, কোনো ধর্মের, কোনো গোষ্ঠীর তার দলীয়করণ না করে যতদিন উপযুক্ত বিচারের আওতায় না আনা হবে ততদিন সমাজ ক্ষয় হতেই থাকবে। নানামূখী অপরাধ অসুস্থ করে তুলবে সমাজের স্থিতিশীলতা, আর অসুস্থ সমাজ নিয়ে কখনোই একটা সুস্থ রাষ্ট্র গড়ার কথা আমরা ভাবতে পারি না। 

আমাদের সমাজ, আমাদের নতুন প্রজন্ম এগিয়ে যাচ্ছে দূর-বহুদূরে, উন্নয়ন ও সেবা পাচ্ছে কিছু কিছু মানুষ, দেখে শুনে ভালোও লাগে। সব সময় লক্ষ্য করেছি, দেশের মানুষ যখন তার কষ্টের কথা বলে, অপরাধীর বিচার চায়, তখন শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে আইন প্রয়োগকারীদের চেনা জানা মধুর বাণীগুলো! কি নেই আমার সোনার বাংলাদেশে? এমন মাটি, এমন জনবল, এমন মেধাবী তরুণ, সর্বোপরি সব ধরনের সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আমার প্রিয় স্বাধীন স্বদেশ আর কতকাল কিছু ভুল নিয়ে হোঁচট খেতে খেতে পথ চলবে? আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে কোনো সরকারের পক্ষেই দেশকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। 

পৃথিবীর অসংখ্য দেশে ধর্ষণ, হত্যার বিচার উন্মুক্তভাবে করা হয়, যা দেখে এমন নিকৃষ্ট অপরাধে না জড়ানোর ভয়ে ভীত থাকে মানুষ। আমাদের দেশে সব সময়ই দেখি কথা বলা হয় বড় করে আর বিচার হয় গোপনে! যদি বলি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত হাতে গুনা কিছু বিচার ছাড়া এখনো আশানুরূপ কোনো বিচার হয়নি হত্যা, ধর্ষণের মতো অপরাধের। প্রতিটি দিন ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেই চলেছে । একটি নারী তাহলে পথে নামবে কি করে, যখন নিজের ঘরেই সে নিরাপদ নয়। তা হলে আমরা কোথায় যাচ্ছি, কোন পথে পা বাড়িয়ে আমরা শুধু চিৎকার করে বলছি সবি তো ঠিক আছে!

মনে রাখতে হবে, ভেতরে পচন রেখে বাইরে ঔষধ দিলেও কাজ হবে না, তার ক্ষত ছড়াতে ছড়াতে একসময় নিজেকে, সংসারকে, পাড়া প্রতিবেশীকে এমনকি একটি রাষ্ট্রকে ও চরমভাবে অসুস্থ করে দিতে পারে। আর সেই অসুস্থ পরিবেশে যখন জন্ম নিবে একটি নতুন শিশু যাদের হাতে রেখে যাবো আমরা আগামীর বাংলাদেশ, সে কতোটা নীতি আদর্শে বিশ্বের বুকে তুলে ধরবে বাংলাদেশকে সেটা এখনই ভাবার বিষয়। এর কি কোনো প্রতিকার নেই, আর কতকাল আমরা দলীয় অন্ধত্ব নিয়ে ভুল পথে হাঁটব, এটা নিয়ে আমাদের একটা শক্ত অবস্থানে থাকতেই হবে যে, অপরাধের কোনো দল নেই, কোনো সমাজ নেই, কোনো রাষ্ট্র নেই। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধীকে ঢেকে রাখোর প্রবণতা বাদ দিয়ে নতুন পথে হাঁটার অঙ্গীকার করতে হবে।

আমরা যারা সাধারণ মানুষ দেশের দিকে, দেশের রাজনৈতিক নেতাদের দিকে অধীর আশায় বুক বেধে তাকিয়ে থাকি—তারা আমাদের সবার প্রিয় বাংলাদেশকে সঠিক দিকনির্দেশনায় পরিচালিত করবে, দেশে শান্তি বাজায় রেখে সাধারণ মানুষের পাশে থেকে তাদের সুখে দুঃখে এগিয়ে আসবে তার প্রমাণ দিতে হবে। এই বিশ্বাস মানুষের মনে জাগিয়ে তুলতে হবে যে, তারা রাজনীতি করেন দেশের মঙ্গলের জন্য এবং সাধারণ মানুষের শান্তির জন্য। একটা নেতার কাছে একটা সাধারণ জনগণ যেন নির্দ্বিধায় খুলে বলতে পারে তার সুখ-দুঃখের কথা। আমার মনে হয়, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সব ধরনের মানুষের সহজ যোগাযোগ থাকতে হবে, তবেই আমরা সুন্দর ভবিষ্যতের পথে এগোতে পারবো।

আমার বিশ্বাস, যতক্ষণ পর্যন্ত না অপরাধীকে আইন তার নিজস্ব দ্রুততম মৌলিক অবস্থানে থেকে কোনো তদবির উপেক্ষা করে বিচার না করবে, এগুলো চলতেই থাকবে। এই সমস্ত অপরাধের জন্য প্রশাসনের প্রধানদের বিশেষ ক্ষমতা রেখে তাদের বিচারিক অবস্থান থেকে রাজনৈতিক ছায়া দূরে রাখা অত্যন্ত জরুরি এবং টেকসই দক্ষতার বহিঃপ্রকাশ হবে বলে মনে করছি। সকল অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হউক । মানুষ নিরাপদে আছে আমরা সবাই যেন তা বুঝতে পারি। 

আর যেন এমন শুনতে না হয় যে, বিরোধী দলে ভোট কিংবা নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করার কারণে ধর্ষিত হতে হয়েছে কোনো নারীকে অথবা লাঞ্ছিত হতে হয়েছে কোনো সচেতন নাগরিককে। আমাদের মনে রাখতে হবে, অমানুষ ক্ষুধার্ত হলে সামাজ ও জাতির জন্য ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

০২.০১.২০১৯

লেখক : যুক্তরাজ্য প্রবাসী
কবি-গীতিকার ও সাংবাদিক

পিডিএসও/হেলাল