অনিয়মই নিয়ম

প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ১২:৩৩

সম্পাদকীয়

অনিয়ম যখন নিয়মে পরিণত হয় তখন নৈতিকতা মৃত্যুবরণ করবে—এটাই স্বাভাবিক। আর সে কারণেই আমাদের সমাজে নৈতিকতার অবনমন ঘটছে ধারাবাহিকভাবে। অর্থনীতিকে সব কিছুর চালিকাশক্তি হিসেবে ধরা হয়। সেই অর্থনীতি যখন অনৈতিকতার বেড়াজালে নিজেকে আটকে রাখে, তখন সমাজে কারো জন্য আর নৈতিকতার পথ উন্মুক্ত থাকে না। অথবা বলা যায়, রুদ্ধ হয়ে পড়ে নৈতিকতার পথ। একইভাবে রুদ্ধ হয়ে পড়েছে ব্যাংকসমূহের নৈতিক অবস্থান।

ব্যাংকিং খাতে লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে খেলাপি ঋণ। যাকে কেবল উদ্বেগজনক বললে ভুল বলা হবে। দেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে এটি একটি অশনিসংকেতও বটে। হালনাগাদ প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮২ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। বেসরকারি ৪০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩৫ হাজার ৬১০ কোটি টাকা।

এ ছাড়া বিদেশি ৯ ব্যাংকের খেলাপি ২ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এর বাইরে আরো ২ বিশেষায়িত ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। এটাই হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকসমূহের সার্বিক চিত্র। সহসা এ চিত্রের কোনো পরিবর্তন হবে- এমন সম্ভাবনা খুবই কম।

মূলত ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম, ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব, সুশাসনের অভাব এবং সরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা শিথিল হওয়ার কারণেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা।

একই সফঙ্গ তারা মনে করছেন, অনেকটা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। অথচ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে শাস্তির নজির থাকলেও এ দেশে তার কোনো চিহ্ন নেই। বিপরীতে বলা যায়, যে যত বড় ঋণখেলাপি সমাজে তার প্রতিপত্তি তত বেশি। অথচ ভারত, নেপাল ও চীনে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ভিআইপি ট্রেন বা বিমানে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

কিছু অসৎ ব্যাংক কর্মকর্তার অসৎ উদ্দেশ্যকে পরিণতির দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য যে অনিয়মের চর্চা করা হয়, তারই ফলে বেড়ে ওঠে খেলাপিদের মেদবহুল শরীর। এই মেদবহুল শরীর থেকে মেদ কমিয়ে আনার কোনো যন্ত্র এখনো ইমপোর্ট করা হয়নি। যন্ত্রটি আমদানি এবং তার ব্যবহার করে দেখা যেতে পারে। তবে যন্ত্রটি দেহে প্রতিস্থাপন করলেই ফলাফল শুভ নাও হতে পারে। সরিষার ভেতর থেকে ভূত তাড়ানোর ব্যবস্থাও নিতে হবে। এখানেও সেই প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে। ভূত তাড়াবে কে! অর্থাৎ বলা যায়, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

আমরা মনে করি, যত দিন না পর্যন্ত বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার জন্য কাউকে পাওয়া না যায়, তত দিন আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হবে। তবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এবার তারা নির্বাচনে জয়লাভ করলে আগামীতে দেশের প্রতি ইঞ্চি ভূমি থেকে দুর্নীতিকে উচ্ছেদ করা হবে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর এই আশ্বাসবাণীর দিকে তাকিয়ে রইলাম।

পিডিএসও/হেলাল