আমরা পাবলিক তাই দুর্ভোগ

প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৯:২৭

সম্পাদকীয়

নাগরিক হিসেবে সমাজে তিন শ্রেণির মানুষ বসবাস করে। প্রথম শ্রেণিতে সিআইপি, দ্বিতীয়তে ভিআইপি আর তৃতীয় বা শেষ অধ্যায়ে পাবলিক। যদিও দুর্ভোগ শব্দটি সবার ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের সমাজে তা হয় না। যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, দুর্ভোগ শব্দটি আজ পাবলিকের পার্সনাল প্রপার্টি হিসেবে সংরক্ষিত। যেখানে ভিআইপি, সিআইপিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। অথবা বলা যায়, সিআইপি, ভিআইপিদের স্পর্শ করার ক্ষমতা শব্দটির নেই। অর সে কারণেই দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত রাজবাড়ী জেলার গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট দৌলতদিয়া-পাথুরিয়া ঘাটে পাবলিকের দুর্ভোগ সব সীমাকে অতিক্রম করেছে। বছরের ৩৬৫ দিনই এ ঘাটে দুর্ভোগ বহাল থাকে। আর সেই দুর্ভোগের ফল ভোগ করতে হয় সাধারণ পাবলিককে।

ঘাটে দুর্বৃত্তদের অবাধ বিচরণ। বিচরণ ঠেকানোর কেউ নেই। লালনের জন্য আছে প্রশাসন। চলছে অবৈধ বাণিজ্য। একটি দালাল চক্রের হাত ঘুরে পুলিশ, পুলিশের মাধ্যমে দায়িত্বশীলদের পকেটে প্রতিদিন চলে যাচ্ছে লাখ লাখ টাকা। যানজট যত দীর্ঘ, অবৈধ বাণিজ্য ততই রমরমা। এলাকায় এ বাণিজ্যকে বলা হয় ‘সিরিয়াল বাণিজ্য’। আগে যাওয়ার সিরিয়াল নিতে গাড়িপ্রতি ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা দিতে হয় দালালদের হাতে। যানজট ছাড়াও রয়েছে বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙন, পানি বৃদ্ধি, তীব্র স্রোত, ফেরিস্বল্পতা, শুকনো মৌসুমে নাব্য সংকট, শীতকালে ঘন কুয়াশা, ফেরির দুর্বল ইঞ্জিন, ভাঙা পন্টুন, ভাঙাচোরা ঘাট আর ড্রেজিং সংকট। এ ছাড়া রয়েছে কৃত্রিম সংকট। দুর্ভোগ নিয়ে পুলিশ ও দায়িত্বশীলদের সঙ্গে রয়েছে দালাল চক্রের আঁতাত। দালালদের বেশির ভাগই বেতনভূক।

প্রায় প্রতিদিনই সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দৌলতদিয়া ঘাটের জিরো পয়েন্ট থেকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোয়ালন্দ ইউনিয়ন পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে ৫ শতাধিক বাস-ট্রাকসহ ছোট যানবাহন আটকা পড়ে থাকে। প্রতিদিন ৪০ হাজার মানুষের যাতায়াত এই পথে। রাজস্ব আয় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা। তবে অবৈধ উপার্জনের পরিমাণ এর চেয়ে বেশি। এটাই হচ্ছে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটের বাস্তব চিত্র। প্রকৃতির চালচিত্রের পট প্রতিদিনই পাল্টে গেলেও এ ঘাটের চালচিত্রের কোনো পরিবর্তন নেই। একই তালে, একই লয়ে চলছে বছরের পর বছর। আর এ জন্য দুর্ভোগে পিষ্ট সাধারণ পাবলিক।

দুর্ভোগ শব্দটির সঙ্গে পাবলিকের যেন একটি আত্মিক সম্পর্ক। নিয়তিই যেন এ সম্পর্ক তৈরি করে দিয়েছে। এটা অনেকের বিশ্বাস। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে অন্য কথা। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, দুর্ভোগ শব্দটি মানুষরাই জন্ম দিয়েছে। মানুষরাই লালন করছে। মানুষ যদি এই শব্দটিকে নির্মূল করতে চায়, তাহলে তা অসম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণই পরিত্রাণের একমাত্র উপায় এবং সে সিদ্ধান্তকে হতে হবে রাজনৈতিক।

পিডিএসও/হেলাল