মিয়ানমারের স্বীকারোক্তি

প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০১৮, ১২:১১

সম্পাদকীয়

‘এতোক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে’। নাহ্; অনেক দেরিতে হলেও শেষ পর্যন্ত সত্যকে স্বীকার করল মিয়ানমার। ইতিহাসের নিকৃষ্টতম হত্যাযজ্ঞ এবং নিপীড়নের মাধ্যমে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে তাদের জন্মভূমি থেকে উৎখাত করে সে দেশের সরকার ও সেনাবাহিনী যে নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল বর্তমান বিশ্বে তা প্রকৃত অর্থেই বিরল। বিশ্বজুড়ে এর প্রতিবাদ হয়েছে। প্রতিবাদের মুখেও দেশটি তার ঔদ্ধত্যের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে বলেছে, তারা কোনো হত্যাযজ্ঞ করেনি। কোনো নাগরিককে জোর করে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়নি। তবে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে ১১ লাখেরও বেশি মিয়ানমার নাগরিক (রোহিঙ্গা) যে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বিষয়টি ধ্রুবতারার মতো সত্য।

এদের ফেরত পাঠানো বা ফেরত নেওয়ার ব্যপারে অনেক পানি ঘোলা হয়েছে। জাতিসংঘকেও উদ্যোগ নিতে হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই কোনো কাজ হয়নি। অবশেষে প্রস্তাব উঠেছে অর্থনৈতিক অবরোধের। সম্ভবত এরপর আমরা দেখলাম, ঈশান কোণে এত দিনের জমে থাকা মেঘের কোনায় এক চিলতে আলোর রেখা দেখা দিয়েছে। মিয়ানমার শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেছে, এত দিন রোহিঙ্গা সম্পর্কে তারা যা বলেছে তা সত্য নয়। বরং বাংলাদেশ যেসব অভিযোগ উত্থাপন করেছে তা-ই সত্য। অন্তত দেশটির শেষ সিদ্ধান্ত সে কথাই প্রমাণ করে।

প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৮ মাস আগে যে ৮ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারকে দেওয়া হয়েছিল তা মেনে নিয়েছে দেশটি। রোহিঙ্গারা কে কোন গ্রাম থেকে এসেছে তা মিলিয়ে দেখেছে দুই দেশ। চলতি সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যকার বৈঠকে বাংলাদেশ ১ হাজার ৬৭৩ রোহিঙ্গা পরিবারের ৮ হাজার ৩২ জনের নামের তালিকা মিয়ানমারকে হস্তান্তর করে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে গত বছর ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে মিয়ানমার। বস্তুত মিয়ানমার থেকে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করলেও চুক্তিতে ৮ লাখ ফেরত নেওয়ার কথা লিপিবদ্ধ হয়েছে।

আমরা মনে করি, মিয়ানমার তার অনঢ় ভূমিকা থেকে কিছুটা হলেও সরে এসে তাদের অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছে। ৮ হাজার শরণার্থী ফেরত নেওয়ার ছাড়পত্রে স্বাক্ষর করে তারা প্রমাণ করেছে—এত দিন বাংলাদেশ তাদের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা সম্পর্কিত যেসব অভিযোগ উত্থাপন করেছে তার পুরোটাই সত্য। সুতরাং আজ হোক আর কাল হোক মিয়ানমারকে তার এই ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। মাতৃভূমিতে ফেরার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিয়ে বসবাসের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

পাশাপাশি বাংলাদেশকে তার কূটনৈতিক তৎপরতাকে আরো জোরদার করতে হবে। মরচে পড়ার আগে চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি এ কথা না বললেই নয়, ৮ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার বিষয়টি কোনো দৈব কারণে সংঘটিত হয়নি। এর পেছনে বাংলাদেশের কূটনীতির একটি বড় অবদান রয়েছে। আমরা সেই অবদানের কথা মনে রেখেই বলতে চাই, এ তৎপরতা অব্যাহত থাকবে এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের কূটনীতিরই জয় হবে। এটাই সবার প্রত্যাশা।

পিডিএসও/হেলাল