এই পৈশাচিকতা বন্ধ হোক

প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৪:৫৩

শেখ সালাহ্উদ্দিন আহমেদ

পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো অত্যন্ত লজ্জাকর খবরগুলো। শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশেই যেন ছড়িয়ে পড়ছে ন্যক্কারজনক এসব ঘটনা। শিশু থেকে মাধ্যবয়সী নারী, স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কর্মজীবী নারী—কেউ বাদ যাচ্ছে না নরপশুদের হাত থেকে। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞরা ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে নানা কারণকে দায়ী করলেও সবচেয়ে বেশি দায়ী করছেন দ্রুততম সময়ে উপযুক্ত বিচারের মাধ্যমে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে না পারাকে। প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, তদন্তে গাফিলতি ও তদন্ত প্রতিবেদনের বিকৃতি, তথ্য-প্রমাণের অভাব ও সাক্ষীর সাক্ষ্য দিতে অনীহাসহ নানাবিধ কারণে অধিকাংশ অপরাধী বিচারে খালাস পেয়ে যায়। অথচ, প্রকৃত হিসাব পেলে দেখা যাবে, অপমান সইতে না পেরে ধর্ষণের শিকার নারীরা আত্মহত্যা করেছে তার চেয়েও বেশি।

ধর্ষণ এমন এক সমস্যা, যা শুধু নারীদের নয়, দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। অথচ, এই সমস্যা মোকাবিলায় রাষ্ট্রের সীমাহীন উদাসীনতা আমাদের প্রতিনিয়ত পীড়িত করছে। ধর্ষণ মামলার বহু আসামি ধরা পড়ে না। আবার যারা ধরা পড়ে, তাদেরও অধিকাংশ জামিনে বেরিয়ে যায় এবং মামলার বাদীকে চাপ দিয়ে কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করে। সাক্ষী সুরক্ষা আইন না থাকায় অধিকাংশ সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে ভয় পায়। প্রভাবশালীদের চাপে এবং ঘুষ নেওয়ার কারণে তদন্ত প্রতিবেদন বিকৃত করা হয় বলেও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। আবার ধর্ষণের শিকার নারীদের পরিবার আর্থিক ও সামাজিক দিক থেকে দুর্বল হওয়ায় শেষ পর্যন্ত মামলা চালিয়ে যেতে পারে না। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুততম সময়ে এসব মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করতে হবে, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে এবং মামলা পরিচালনায় রাষ্ট্রের সব রকম সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।

পরিবর্তনের হাত ধরে উন্নয়নের পথেই হাঁটছে বাংলাদেশ। কিন্তু সব জায়গায় কি সেই ইতিবাচক পরিবর্তনের দেখা মেলে? নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রেই আমরা দেখি এর ভিন্ন রূপ। বিগত বছরের তুলনায় এ বছর নারী নির্যাতনের হার ছিল বেশি। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বহু। সে সঙ্গে যোগ হয়েছে শিশু নির্যাতনের বিষয়টিও। কন্যাশিশু ধর্ষণ এ বছর উল্লেখযোগ্য হারে দেখা গেছে। ২০১৭ সালের প্রথম ১০ মাসে ধর্ষণসহ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৭৩৭টি। গত বছর ১২ মাসে একই ধরনের ঘটনার সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৫৩টি। সে হিসাবে এসব ঘটনা বেড়েছে ২৮৪টি। ১৪টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নারী নির্যাতনের এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে মহিলা পরিষদ। ২০১৬ সালে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৭০৫টি, চলতি বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩৪টি। একইভাবে গণধর্ষণ ১৩৯ থেকে ১৯৩ এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ৩১ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫২টি। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের অভাব, পিতৃতন্ত্র ও বৈষম্যমূলক আইন নারী নির্যাতন বাড়ার পেছনে দায়ী। ২০১৬ সালে নথিভুক্ত মোট নারী নির্যাতনের মধ্যে মেয়েশিশু নির্যাতনের হার ২০ শতাংশ। মেয়েশিশুদের মধ্যে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি (৬০.৬৩%) নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ১৮ বছরের নিচে প্রতিদিন গড়ে ১ দশমকি ৭ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। আর মেয়েশিশু ছাড়া অন্য নারীদের ক্ষেত্রে নির্যাতনের হার ৮০ শতাংশ। ২০১৬ সালে ৫৫টি জেলায় ও ৩৭৯টি উপজেলায় নির্যাতনের শিকার নারীদের তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে ব্র্যাক একটি জরিপ চালায়। নথিভুক্ত তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, মোট নির্যাতনের মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের হার ৬৭ শতাংশ, যৌন নির্যাতনের হার ১৯ শতাংশ এবং মানসিক নির্যাতনের হার ১৪ শতাংশ। নারীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঘটেছে শারীরিক নির্যাতন এবং শিশুদের মধ্যে যৌন নির্যাতন। যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে ১৮ বছরের নিচে শিশুদের মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ১ দশমিক ৭ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

নারীদের প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় আইন করা হয়েছে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ১৯২৯ এবং সংশোধনী ২০১৬। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১। যৌতুক নিরোধ আইন ১৯৮০। পারিবারিক আদালত ১৯৮৫। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন ২০০৩। পারিবারিক

সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০। মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২। পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২। পিতামাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩। দণ্ডবিধি ৪৯৫ ধারায়, যদি কোনো ব্যক্তি পূর্বের বিবাহের কথা গোপন করে বিবাহ করে সে ক্ষেত্রে তার শাস্তি যেকোনো মেয়াদে ১০ বছর এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হতে পারে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন করা হলেও প্রয়োগের অভাবে বেড়েইে চলছে এ নির্মমতা।

একবিংশ শতাব্দীতে এসেও নারীরা নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হতে থাকবেন, এটাই যেখানে সমর্থনযোগ্য নয়, সেখানে দেখা যাচ্ছে শুধু শিকার হচ্ছেন এমন নয় বরং রাজধানী ঢাকাতেই নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের হার ৭০ শতাংশ বেড়েছে! আমরা মনে করি, এ বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং সার্বিক অর্থেই আশঙ্কার। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যেখানে নারীরা ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে। নিজ যোগ্যতার ভিত্তিতে দেশ-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ কাজে সফলতা অর্জন করছে। এমনকি এ দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় সংসদের স্পিকারও নারী। দেশের দুটো নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নারী। অথচ, সেই দেশের এই চিত্র! আমরা মনে করি, ব্যাপকভাবে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণপূর্বক এই পরিস্থিতি নিরসনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা অপরিহার্য। একইসঙ্গে এটা মনে রাখা দরকার, নারী নির্যাতন রোধ করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাহলে হয়তো নির্যাতনের হার একদিনেই নেমে আসবে না, কিন্তু এই হার ধীরে ধীরে কমে আসবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি।

এটা বলা প্রাসঙ্গিক যে, এই পরিস্থিতি নিরসনের জন্য ব্যাপকভাবে মানসিকতার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আর তা নিশ্চিত করতে হলে চিহ্নিত সমস্যাগুলো মোকাবিলা করার বিকল্প নেই। আর তার জন্য পরিস্থিতি অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে সরকারকেই। মানবাধিকার সংস্থার এক গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, বর্তমানে বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের হার ঊর্ধ্বমুখী। আর এই হার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার মূল কারণই হলো দারিদ্র্য, যৌতুক, বহুবিবাহ এবং অশিক্ষা। এ ছাড়া এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, ঢাকায় অবৈধ বস্তি গড়ে উঠেছে যেখানে উঠতি বয়সী মেয়েদের মা-বাবারা যখন কর্মস্থলে চলে যান, তখন তাদের কিশোরী মেয়েরা অনেকটাই অরক্ষিত থাকে। আর নিম্ন আয়ের বাবা-মা সন্তানদের ফেলে রেখেই যেতে বাধ্য হন জীবিকার প্রয়োজনে। ফলে এটা স্পষ্ট—নারী নির্যাতন, ধর্ষণের মতো ঘটনার জন্য যেসব কারণ চিহ্নিত করা যাচ্ছে, তা নির্মূল করতে আন্তরিক ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, জনগণের স্বাভাবিক জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারেরই দায়িত্ব। আমরা প্রত্যাশা করি, সরকার নারী নির্যাতনের মতো ঘৃণ্য প্রবণতাকে দমন করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে এবং একইসঙ্গে এর সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি প্রদানে কোনো রকম পেছপা হবে না। আমরা চাই, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো ঘটনা এই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র থেকে নির্মূল হোক এবং নিশ্চিত হোক নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা।

লেখক : অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

পিডিএসও/হেলাল