বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চলচ্চিত্র

প্রকাশ | ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:১৭

মোতাহার হোসেন

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে ইতিহাস থেকে তাঁকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, আইন করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসও বিকৃত করার অপচেষ্টা চালিয়ে ছিল বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ঘাতক দালালরা। তারা নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে দেয়নি। এ অবস্থা অপরিবর্তিত ছিল ৭৫-পরবর্তী দীর্ঘ ২১ বছর। কিন্তু বাস্তবে বঙ্গবন্ধুকে বাঙালির হৃদয় থেকে মুছে ফেলা যায়নি। বরং যতই দিন যাচ্ছে, ততই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ক্রমেই এ জাতির জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠছে।

এই জাতির উন্নতি ও বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন, ২০০৮ সাল থেকে টানা দুই মেয়াদে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় থাকায় জাতির জনকের সেই অসমাপ্ত স্বপ্ন বিশেষ করে জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি তথা সোনার বাংলা আজ সত্যিকার অর্থেই বাস্তবায়নের পথে। ইতোমধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে বাংলাদেশ। দুঃখজনক হলেও সত্য, বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে এখনো ষড়যন্ত্র চলছে। এ অবস্থায় শেখ হাসিনার সরকারের অন্যতম কাজ হওয়া উচিত এসব ষড়যন্ত্রকারীকে দমন করা এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নে আরো অধিক মনোযোগী হওয়া।

অবশ্য বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে, বিশ্বকে জানাতে ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’, মোতাহার হোসেনের ‘বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা’ শিরোনামের একটি তথ্যবহুল গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটিতে সর্বমোট ৪৪টি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। ২০০ পৃষ্ঠার এই মূল্যবান গ্রন্থটির দাম রাখা হয়েছে ৪০০ টাকা। অনুরূপ বঙ্গবন্ধুর ১০০ ভাষণ নিয়ে ‘বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতাসম্ভার’ শিরোনামে আরেকটি বই প্রকাশ করছে বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন। এর মুখবন্ধ লিখছেন বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্যকন্যা ও আমাদের প্রাণপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত এ কে আবদুল মোমেন সম্প্রতি এই গ্রন্থটি প্রকাশের ঘোষণা দেন। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুকে জানার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত ভাষণ থেকে নির্বাচিত ১০০ ভাষণ নিয়ে প্রকাশিত মূল্যবান গ্রন্থটিও অন্যতম সহায়ক হতে পারে।

অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনীভিত্তিক একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বিশাল উদ্যোগ। এই চলচ্চিত্র নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে ভারতের চলচ্চিত্র পরিচালক শ্যাম বেনেগালকে। সম্প্রতি সচিবালয়ে নিজের দফতরে তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী এই চলচ্চিত্র পরিচালনায় বাংলাদেশের তিন সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল তাকে সহযোগিতা করবে। পাণ্ডুলিপি তৈরির পর বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের দেখিয়ে নিয়ে মূল কাজ শুরু হবে। বঙ্গবন্ধুর জীবনীচিত্র নির্মাণে ভারতের পক্ষ থেকে পরিচালক শ্যাম বেনেগাল, গৌতম ঘোষ এবং কৌশিক গাঙ্গুলীর নাম প্রস্তাব করা হলেও পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ ও দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পাওয়া শ্যাম বেনেগালকেই বেছে নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। শ্যাম বেনেগাল নেতাজি সুভাষ বোসকে নিয়ে জীবনীভিত্তিক একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তার কর্মের এই বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েই তাকে নির্বাচন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে চলচ্চিত্র নির্মাণে বাংলাদেশের তিন সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল থাকবে। যেখানে চলচ্চিত্র বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, বঙ্গবন্ধুকে জানেন, চেনেন এমন একজন এবং ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে চেনেন এমন একজন ইতিহাসবিদ থাকবেন। তারা পরিচালককে সহায়তা করবেন।

বঙ্গবন্ধুর জীবনীভিত্তিক একটি চলচ্চিত্র এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে ২০১৭ সালের ২৭ আগস্ট নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীদের উপস্থিতিতে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরে বাংলাদেশের ১০ জন এবং ভারতের নয়জনকে নিয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হয়। মূলত বঙ্গবন্ধুর মতো একজন মহান নেতাকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হলে যুগ যুগ ধরে মানুষ তার সংগ্রাম ও কর্মময় জীবনের ইতিহাস জানতে পারবে। আরো জানতে পারবে তার জীবনের অনেক অজানা অধ্যায়। তখন প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সত্যিই আত্মোপলব্ধি করতে পারবে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই জাতির জন্য কতটা অপরিহার্য ছিলেন। বাংলাদেশের অনেক শিল্পী ও কলাকুশলী এই চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। আবার অন্য কোনো দেশ থেকে প্রয়োজনীয় কলাকুশলী নেওয়ার স্বাধীনতাও পরিচালকের থাকবে। যেকোনো শিল্প সৃষ্টিতে শিল্পীর স্বাধীনতা প্রয়োজন। আমরা যেন সেই সুযোগটি তাদের দিই, যাতে তারা এই মহতী উদ্যোগকে সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে নিয়ে যেতে পারেন। এই চলচ্চিত্রে বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে কে অভিনয় করবেন, সেটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই চূড়ান্ত করতে হবে বলে মনে করছেন একসময়কার ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী তারানা হালিম।

তিনি বলেন, পরিচালককে অনেক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। যেমন এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে যাকে নেওয়া হবে, তার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর হাঁটা-চলা এবং চেহারার সঙ্গে সামঞ্জস্য আছে কিনা—সেসব মিলিয়ে দেখা হবে। আমরা আশা করব, বিশ্বমানের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণে যা যা প্রয়োজন, সেই সহযোগিতাগুলো ভারতের কাছ থেকে পাওয়া যাবে। আমাদের বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধুর জীবনীভিত্তিক এই চলচ্চিত্রটি নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক মানের হবে। মনে রাখতে হবে, বিশ্বের একজন অন্যতম নেতাকে নিয়ে এ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হচ্ছে। ২০২১ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে চলচ্চিত্রটি শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই চলচ্চিত্র তৈরিতে বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশ ব্যয় বহন করবে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ৮০ শতাংশ ব্যয় বহন করতে চায় বলে ভারতকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে বাংলাদেশের পরিচালকদের শর্ট লিস্ট করা হয়েছে। সেখানে প্রবীণদের সঙ্গে নবীনদের নামও আছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এই প্রমাণ্যচিত্র নির্মাণে বাংলাদেশের পরিচালককে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে জানিয়ে তারানা হালিম বলেন, বঙ্গবন্ধুর জীবনকর্ম নিয়ে কেউ চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চাইলে তথ্য মন্ত্রণালয়ে সব ধরনের সহযোগিতা করবে।

এদিকে, ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ৪৩তম শাহাদাতবার্ষিকীতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ‘বঙ্গবন্ধু ও আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আর্ট ক্যাম্পের আয়োজন করে। এই আর্ট ক্যাম্পে দেশের খ্যাতিমান নবীন-প্রবীণ ৫০ জন শিল্পী নানা মাধ্যমে তাদের শিল্পীত ক্যানভাসে বঙ্গবন্ধুকে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছেন। যেখানে উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামমুখর জীবনের নানা চিত্র। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক নাট্যব্যক্তিত্ব লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আর্ট ক্যাম্পের উদ্বোধন করেন শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী। উদ্বোধনী ভাষণে দেশবরেণ্য শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী বলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এবারও শিল্পকলা একাডেমি আর্ট ক্যাম্প আয়োজন করে তার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছে। আমাদের খ্যাতিমান, তরুণ ও নবীন ৫০ জন শিল্পী এই ক্যাম্পে বঙ্গবন্ধুর ছবি এঁকে নিজেদের প্রজ্ঞাকে উপস্থাপন করছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যতই ছবি আঁকা হবে, তার সংগ্রামের বিষয়গুলো ততই চিত্রকর্মে উঠে আসবে। জাতির জনকের ওপর কয়েক বছর ধরেই একাডেমি নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শিল্পীদের আঁকা এসব চিত্রকর্ম একাডেমিতে সংরক্ষণ করা হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এসব চিত্রাবলি সংগ্রহে রাখবে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ ও লালন করেই তার অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। তবেই জাতির উন্নয়ন এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
motaherbd123@gmail.com

পিডিএসও/হেলাল