খাদ্যের নামে কী খাচ্ছি

প্রকাশ : ২৭ মে ২০১৮, ১১:২৩

সাবরিনা শুভ্রা

আমরা খাবার হিসেবে যাই খাচ্ছি, মনের ভেতর থেকে সরছে না সন্দেহ। মনে হচ্ছে, বিষ খাচ্ছি না তো! আর তা মনে হওয়াটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। ফরমালিনের দৌরাত্ম্য আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি। রাজধানীর বাজারগুলোয় তো বটেই, দেশের সর্বত্রই ফরমালিনযুক্ত খাবার। কিছুতেই ফরমালিন নামের এই বিষের বিস্তার রোধ করা যাচ্ছে না। ফলমূল, মাছ, মাংস ও খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন ব্যবহারের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান চালানো হলেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের নিবৃত্ত রাখা সম্ভব হচ্ছে না নকল-ভেজালের দুষ্কর্ম থেকে। আতঙ্কগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতে রাজধানীতে গড়ে উঠছে একের পর এক ফরমালিনমুক্ত বাজার। বলা হচ্ছে প্রতিটি পণ্য পরীক্ষা করে এসব বাজারে ঢোকানো হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে তথাকথিত ফরমালিনমুক্ত বাজারেও রাসায়নিকমিশ্রিত পণ্যের বেচাকেনা চলছে। ফরমালিনমুক্ত পণ্য এই অজুহাতে অতিরিক্ত দাম রাখা হলেও ক্রেতারা টাকা দিয়ে কার্যত কিনছেন মৃত্যুপরোয়ানা।

দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। উৎপাদনে এসেছে আধুনিকতা। মাঠে উৎপাদন বেড়েছে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে চাষাবাদ লাভজনক হয়ে উঠেছে। কৃষিবাজার ব্যবস্থাপনায়ও এসেছে নতুনত্ব। নতুন নতুন ফসলের প্রতি কৃষকের আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে। নতুন নতুন ফসল বাজারে আসছে। একই মাঠে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। নতুন নতুন গবেষণা থেকে দেশের কৃষি উৎপাদনে রীতিমতো বিপ্লব এসেছে বলা যেতে পারে। ভবিষ্যতে আরো উন্নতির আশা করছে বাংলাদেশ। শুধু ধান কিংবা গম নয়, বিভিন্ন জাতের মৌসুমি সবজি উৎপাদনেও এগিয়ে গেছে দেশ। দেশের বিভিন্ন স্থানে সবজি চাষ করেও লাভবান হচ্ছে কৃষক। এর পাশাপাশি পশু পালনও এখন গ্রামাঞ্চলে পেশা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। পশু পালন আমাদের অর্থনীতিতে গতি এনেছে, পুষ্টি চাহিদাও পূরণ করছে। তবে কেন আজও এ প্রশ্ন উত্থাপিত হবে, ‘খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে কী খাচ্ছি আমরা’? প্রশ্নটা এখন বেশ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে জমিতে সার ও কীটনাশকের ব্যবহার। কীটনাশক ব্যবহার করতে গিয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কৃষক মাত্রা না বুঝে মাঠে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করে থাকেন। মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে অনেক সবজিই খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়ে।

কয়েক বছর ধরেই আমাদের দেশে খাদ্যে ফরমালিনসহ রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ে হইচই হচ্ছে। উচ্চ আদালত থেকেও এই মর্মে কিছু নির্দেশনা এসেছে। খাদ্যে ফরমালিন এখন এক ভয়াবহ আতঙ্ক না হলেও আতঙ্ক কাটেনি। মর্গে মানুষের লাশ ও গবেষণাগারে প্রাণীর মৃতদেহ সংরক্ষণে যে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়, সেই ফরমালিন এখন ব্যবহার করা হচ্ছে খাদ্যদ্রব্যের পচন রোধ করার কাজে। মাছ বিক্রেতারা মাছের পচন রোধে ফরমালিন ব্যবহার করছেন। একইভাবে দুধ যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্যও ফরমালিন ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ যারা ব্যবহার করছেন তারা ভালো করেই জানেন, ফরমালিন মানবদেহে ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে, কিডনি, লিভার ও শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। উন্নত বিশ্বে শুধু খাদ্যে নয়, অন্যান্য সামগ্রীতেও এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কারণ নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি ফরমালিনযুক্ত দ্রব্যের সংস্পর্শে থাকলে অ্যালার্জি, শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ নানাবিধ শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে এর আমদানি ও ব্যবহার চলছে অবাধে। তার বিরূপ প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যের ওপর। আদালতের নির্দেশনাগুলোর মধ্যে ছিল বন্দরগুলোয় রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো ফল আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা, বাজারের আড়তগুলোয় প্রতিদিন ফলের রাসায়নিক পরীক্ষা করা ও দোষীদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা। কিন্তু এসব নির্দেশনার যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

ফরমালিনসহ ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগের অভাবে অপরাধীরা যা ইচ্ছা তাই করার সুযোগ পাচ্ছেন। জনস্বাস্থ্য জিম্মি হয়ে পড়েছে অসৎ ব্যবসায়ীদের কাছে। এ অবস্থার প্রতিকার ঘটাতে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত হওয়া দরকার। ফরমালিন ব্যবহারকারীদের কঠোর শাস্তিই তাদের অপরাধপ্রবণতায় বাদ সাধতে পারে।

দেশের প্রতিটি হাটবাজারে ফরমালিন ও ভেজাল শনাক্তকরণ যন্ত্র ভোক্তাদের হাতের নাগালে পর্যাপ্ত রাখা দরকার। যেমন ব্যাংকগুলোয় রাখা হয় জালটাকা শনাক্তকরণ যন্ত্র। কোন মাছে কতটা ফরমালিন, কোন শাকসবজিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের উপস্থিতি, কোন খাদ্যদ্রব্য কতটা ভেজাল, তা সহজে শনাক্ত করতে না পারার কারণে অসাধু কারবারিদেরই যেন রামরাজত্ব। বাজারে এমন একজন ভোক্তাও পাওয়া যাবে না, তিনি জেনেশুনে ক্ষতিকর ভেজালদ্রব্য কিনবেন। যে ব্যক্তি ভেজাল করেন তিনিও নিজের বেলায় ভালোটাই খোঁজেন।

বাজারে ফলফলাদি নিশ্চিন্তে কেনার জো নেই, খেজুরের গুড়! তাতেও নেই সেই স্বাদ। মাছ? মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে কিছুটা স্বস্তি মিললেও অভিযান ঝিমিয়ে গেলে পূর্বাবস্থায় ফিরতে সময় লাগে না। গুঁড়ো মসলার কথা না বলাই ভালো। কোনটার সঙ্গে কোন ধরনের অখাদ্য কু-খাদ্য যে মেশানো হয়, তা বোঝা ভার। সরষের তেল? ঝাঁজটা বেশি হলেও আসলটা বাজারে নেই বললেই চলে। ভাবছেন, এক-দুমুঠো মুড়ি খাবেন? তাতে ইউরিয়ার উপস্থিতি স্পষ্ট। এই যখন পরিস্থিতি, তখন প্রতিকারের উপায়! কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখবেন কি?

লেখক : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও কলামিস্ট
shuvraa7@gmail.com

পিডিএসও/হেলাল