প্রকাশ্যে দান কোনো দান নয়

প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৮, ০৯:১১

সম্পাদকীয়

দান অর্থাৎ দুস্থ লোককে সাহায্য করা। কাজটি যে মহৎ, এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়। তবে বিতরণ প্রশ্নে ভিন্নমত রয়েছে। প্রকাশ্যে ঢাকঢোল পিটিয়ে দানছত্র করাকে ধর্মীয়ভাবে কখনো উৎসাহিত করা হয়নি। ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে, তুমি এমনভাবে দান করবে সেই দানের বিষয়টি যেন তৃতীয় কোনো পক্ষ জানতে না পারে। বলা হয়েছে, ‘ডান হাতে দান করলে বাম হাতও যেন টের না পায়’। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষমতাধররা কখনো কোনো নিয়মনীতি মান্য করে চলেছেন—এমন নজির খুঁজে পাওয়া ভার। আর সে কারণেই ক্ষমতাহীন মানুষরা পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে মরছেন অহরহ। কখনো পায়ের তলায়, কখনো গাড়ির চাকায়, কখনো আইনি অসভ্যতায়, আবার কখনোবা দুর্নীতির জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়ে। তবু চলছে দেশ, চলছে সমাজ, চলছে জীবন।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় গত সোমবার এ রকম একটি মহৎ কর্মযজ্ঞে অংশ নিতে গিয়ে প্রাণ হারালেন ১০ জন দুস্থ নারী। আহত অর্ধশত। কবির স্টিল রি-রোলিং মিলের (কেএসআরএম) পক্ষ থেকে এসব ইফতার বিতরণ করা হচ্ছিল। পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিতরণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে নিহতদের প্রতিটি পরিবারকে ৩ লাখ টাকা এবং কর্মক্ষম ব্যক্তি থাকলে চাকরি প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়। নিহত নারীদের সবাই হতদরিদ্র। দূর-দূরান্ত থেকে এসে ইফতারসামগ্রীর জন্য অপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত ফিরতে হলো লাশ হয়ে।

বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত কমিটির ঘোষণা দিয়েছে সরকারের পুলিশ ও প্রশাসন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ তদন্তের পর আমরা কি কোনো ফল পাব? বাস্তবতা বলছে, কোনো সমাধান নেই। প্রতিবারই রোজার আগে বা পরে এভাবে হতদরিদ্রদের মাঝে করুণা ছড়াতে গিয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিরা সেসব হতদরিদ্র মানুষের জীবনের নিরাপত্তা হরণ করছেন। এ প্রশ্নে কাউকে কখনো কোনো জবাবদিহি করতে হয়েছে বলে শোনা যায়নি।

আমরা মনে করি, কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রশ্নে সবাইকেই সেই ধর্মের অনুশাসন মেনে চলাই হবে উত্তম কর্ম। কিন্তু আমরা না ধর্ম না রাষ্ট্র—কোনো অনুশাসনকেই অনুসরণ করছি না। বিষয়টির একটি স্থায়ী সমাধান হওয়া আজ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

দান করতে কোনো বাধা নেই। তবে সে দান এমনভাবে করতে হবে; যাতে দান করার সময় বাম হাতও টের না পায়। যারা দান করতে আগ্রহী, তারা তাদের দানসামগ্রী নিজ দায়িত্বে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিন অথবা সরকারের জাকাত ফান্ডে জমা করুন। ধর্ম পালনের নামে জাতিকে যেন আর এমন মৃত্যুর মুখোমুখি হতে না হয়। সরকার এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছে এটাই প্রত্যাশা।

পিডিএসও/হেলাল