এবার তিস্তা নিয়ে প্রত্যাশা

প্রকাশ : ১৫ মে ২০১৮, ০৯:২৭

সেলিম মণ্ডল

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের কারণে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের এবং পশ্চিমবঙ্গ বা পশ্চিম বাংলা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। কলকাতা বন্দরকে পলিমুক্ত রাখার লক্ষ্যে ভারত সরকার গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার অন্তর্গত রাজমহল ও ভগবানগোলার মধ্যবর্তী স্থানে ফারাক্কা বাঁধ অবস্থিত। ১৯৫৬ সালে ২.২৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু এবং ১৯৭০ সালে শেষ হয়। এই বাঁধের উদ্দেশ্য হচ্ছে, ভাগীরথী নদী দিয়ে ৪০,০০০ কিউসেক পানি প্রত্যাহারের মাধ্যমে কলকাতা বন্দরকে সচল রাখা। ফারাক্কায় একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে ভূপ্রকৃতি, কৃষি, নৌপরিবহন, মৎস্যসম্পদসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ব্যাপক ক্ষতি হয় পূর্ব বাংলায়। ফলে দেশের অর্থনীতি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারত সরকার শুকনা মৌসুমে ফারাক্কার উজানে পানি প্রত্যাহার করে। তাই ফারাক্কার ভাটিতে বাংলার অংশে নদীতে পানিপ্রবাহ হ্রাস পায় এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়। পরিণতিতে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যায়। এর ফলে নদীর পানি ধারণক্ষমতা হ্রাস পায়। বর্ষা মৌসুমে বাঁধের নিয়ন্ত্রক গেট খুলে দেওয়া হয়। সে সময়ে তীব্রবেগে ধেয়ে আসা পানি বন্যা ঘটায়। এসব পরিস্থিতির কারণে বাংলার কৃষকদের বারবার ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে।

১৯৫১ সালে পাকিস্তান সরকার গঙ্গার পানিপ্রবাহের বিষয়ে ভারত সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও ভারত এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা দখল করেন এবং দীর্ঘ ১১ বছর স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায় দেশ শাসন করেন। পাকিস্তানের পূর্ব এবং পশ্চিম অংশের মাঝে শুধু যে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্ব তাই নয়, দুই অংশের অধিবাসীদের মধ্যেও ছিল বিরাট পার্থক্য। পশ্চিম অংশের সঙ্গে চেহারা, ভাষা, পোশাক, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সবকিছু ছিল ভিন্ন, শুধু একটি বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্বাংশের মানুষদের সঙ্গে মিল ছিল—সেটি হচ্ছে ধর্ম। এ রকম বিচিত্র একটি দেশ হলে সেটি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে আলাদাভাবে একটু বেশি চেষ্টা করার কথা, কিন্তু পাকিস্তানের শাসকরা সেই চেষ্টা করলেন না।

দেশ ভাগের সময় পশ্চিম অংশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় দুই কোটি, পূর্বাংশের ছিল চার কোটি। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, অধিকারভোগ ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে ছিল বিরাট বৈষম্য। সবকিছুতেই পশ্চিম অংশের ভাগ ছিল শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ। বাজেটের ৭৫% ব্যয় হতো পশ্চিমাংশে, ২৫% ব্যয় হতো পূর্বাংশে; অথচ পূর্ববাংলা থেকে রাজস্ব আয় ছিল বেশি, শতকরা ৬২ ভাগ। এসব বিষয়ে ন্যায্য হিস্যার দাবিতে পূর্ব বাংলার কৃষক-শ্রমিক ও সর্বসাধারণের স্বাধিকার আদায়ের স্বার্থে এবং ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতির মুক্তির আকাক্সক্ষায় ১৯৫৫ সালে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের যাত্রা শুরু হয়। পূর্ব বাংলার সব ধর্মের লোকজন আওয়ামী লীগের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাঙালির বিভিন্ন অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যুক্ত হয়। আবহমান নদীমাতৃক পূর্ব বাংলার মানুষদের প্রথম ও প্রধান পেশা ছিল কৃষি। কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনে পানিসেচব্যবস্থা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। কৃষকদের এ সমস্যা সংকট সমাধানের দাবিতে পূর্ব বাংলার আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছিল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সালে ভারত ও বাংলাদেশের পানিবিশেষজ্ঞদের নিয়ে যৌথ নদী-কমিশন গঠিত হয়। এই কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শুকনা মৌসুমে ভারতের অংশে ফারাক্কা ব্যারাজের ভাটিতে এবং বাংলাদেশ অংশে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ভাটিতে যৌথভাবে পানিপ্রবাহের জন্য সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত তথ্যাদি উভয় দেশের মধ্যে নিয়মিত বিনিময় করা হয়। কমিশনের দীর্ঘ বৈঠকের পরও বাংলাদেশ তার পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়। বাংলাদেশের পক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের পক্ষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানিবণ্টন বিষয়ে এক যৌথ বিবৃতি দেন। এই যৌথ বিবৃতি অনুসারে বাংলাদেশ অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য শুকনা মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে (ব্যারাজের ভাটিতে) ৪৪,০০০ কিউসেক পানি (১ কিউসেক বা প্রতি সেকেন্ডে প্রবহমান এক ঘনফুট পানি) পাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে উভয় পক্ষের চুক্তির বাস্তবায়ন শুরু হয়। ১৬ মে চুক্তির বাস্তবায়ন শুরু হওয়ায় দিনটিকে ফারাক্কা দিবস হিসেবে গণ্য করা হয়। আর ওই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় ১৯৭৫ সালের ৩১ মে তারিখে।

এরপর নানা চড়াই-উতরাই শেষে গঙ্গার পানিবণ্টন বিষয়ে ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর ৫ বছর মেয়াদি এক চুক্তি স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজী দেশাই। এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ শুকনা মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে ৩৪,৫০০ কিউসেক পানি পাবে। ১৯৮২ সালের ৪ নভেম্বর তারিখে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। তারপর রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে ১৯৮২ ও ১৯৮৫ সালে ভারতের সঙ্গে দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

কিন্তু সবশেষে ফারাক্কার পানি ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারত সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারত সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়া। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ফারাক্কা পয়েন্টে পানিপ্রবাহ ৭০,০০০ কিউসেক হলে ভারত ৫০% এবং বাংলাদেশ ৫০% পাবে। পানিপ্রবাহ ৭০,০০০ থেকে ৭৫,০০০ কিউসেক হলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫,০০০ কিউসেক এবং অবশিষ্ট পাবে ভারত। পানিপ্রবাহ ৭৫,০০০ কিউসেকের বেশি হলে ভারত ৪০,০০০ কিউসেক এবং অবশিষ্ট অংশ পাবে বাংলাদেশ। এই চুক্তিটি বর্তমানে কার্যকর আছে। ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গা নদীর পানি চুক্তি ভারত ও বাংলাদেশের মাঝে একমাত্র পানি চুক্তি। (উৎস : Ganges Water Treaty,1996, AppendixA)। আগামী ২৫-২৬ মে (সম্ভবত) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার প্রথম বিশ্বভারতী-সফর। আমরা নিশ্চিত, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও আগে কখনো বৃক্ষচ্ছায়াময়, কারুকৃতিপূর্ণ এ চত্বরে আসেননি। প্রধানমন্ত্রীর ভারত-সফরকে ঘিরে কিছু বাড়তি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সদিচ্ছা, সামগ্রিক অভিপ্রায়ের জোর অনেক বেশি। বিশেষ করে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের খুঁটি আরো মজবুত হোক। শত শত নদনদীকে সমানভাবে অনুভব করত দুই বাংলার সমতলের জনসাধারণ। ধর্মের পার্থক্য সত্ত্বেও একই আকাশ, একই সমুদ্রতট, একই ভৌগোলিক অবস্থানসূত্রে দুই বাংলার মানুষেরই একই পরিচয় বাঙালি। রাজনীতির বাইরে ভেতরে ও এসবের পেছনে, এখানকার বহু মনোভাব যাই হোক না কেন, সম্মিলিত ইচ্ছার মাধ্যমে ঢাকার সঙ্গে দিল্লির ঘটতে পারে দ্বিপক্ষীয় অনেক আলোচনা।

প্রসঙ্গক্রমে তিস্তার পানিবণ্টন, বেশ কয়েক দফায় বৈঠকের পর মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তার চূড়ান্ত চূক্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই সফরেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নারাজির কারণে তিস্তা চুক্তি আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৫ সালে মমতা বাংলাদেশ সফরে আসেন এবং তিস্তা চুক্তির বিষয়ে আশ্বাস দিয়ে যান। এরপর ওই বছরের ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে আসেন। ওই সময় মোদির সঙ্গে মমতার আসার কথা থাকলেও পরে তিনি পিছিয়ে যান। ফলে আবার তিস্তা নিয়ে হতাশ হতে হয় বাংলাদেশকে। ওই সময় প্রচারমাধ্যমে সংবাদ হয়েছিল, মমতায় আটকে আছে তিস্তা চুক্তি। এ বছর যেহেতু বিশ্ব ভারতীতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই তিনজনের একত্র হওয়ার সুযোগ ঘটছে, কাজেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির একটি ইতিবাচক সুরাহার প্রত্যাশায় আমরা অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
salimm159@gmail.com

পিডিএসও/হেলাল