সাফল্য

মহাকাশে বাংলার নতুন ঠিকানা

প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৮, ১১:৫৯

মোহাম্মদ আবু নোমান

আমরা সফল! রচিত হলো আরেকটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। স্বপ্ন হলো সত্যি!! এবার মহাকাশের মহাকাব্য লেখার পালা। জীবনের স্মরণীয় স্বল্প কিছু ঐতিহাসিক মুহূর্ত থাকে, যাকে বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় এবং তা মনের ভেতর বিশেষ অনুভূতি সঞ্চারিত করে; আর সেই কাহিনিকর ও মর্যাদার মুহূর্তটি তাৎপর্যের কারণেই চিরঅমলিন থেকে যায়। বাঙালি জাতির জন্য তেমনই এক মাহেন্দ্রক্ষণ, বহুল প্রতীক্ষিত দেশের প্রথম ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’, যা পুরো জাতির জীবনে এক অনন্য উচ্চতা ও গৌরবের অনুভূতি।

কারণ, দেশের অসচ্ছল, সুখস্বাচ্ছন্দ্যবঞ্চিত ও সাধারণ জনগণের কষ্টার্জিত প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাওয়া জাতীয় জীবনে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। মহাকাশে নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার প্রত্যাশা পূরণের মাহেন্দ্রক্ষণ সফলভাবে অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ; যা দেশ ও জাতির জন্য এক অসামান্য সাফল্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এর সফল উৎক্ষেপণের মাধ্যমে আমরা পৌঁছে গেছি গৌরবের এক অনন্য উচ্চতায়। বিশ্বাঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বলতর হবে সফল মহাকাশ জয়ের এ মিশনের মাধ্যমে।

১২ মে শুক্রবারের নিশি রাতটি নিঃসন্দেহে অমোচনীয় ইতিহাস গড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উড়ে যায় যোগাযোগ উপগ্রহটি। রচিত হয়েছে মহাকাশ জয়ের এক অনন্য অধ্যায়, যা মহাকাশ জয়ের এক অনবদ্য বার্তাবাহী হয়ে থাকবে চিরদিন। মহাকাশের বাসিন্দা থেকে বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১৪ মিনিট রওনা হয়ে গেছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ অনুসন্ধান ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯ রকেট ফ্লোরিডার কেইপ ক্যানাভেরালের লঞ্চ প্যাড থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটকে নিয়ে উড়াল দেয়। ৮ থেকে ১২ দিনের মধ্যে এটি নির্ধারিত কক্ষপথে পৌঁছে যাবে। স্যাটেলাইটি উৎক্ষেপণের আগে স্পেসএক্সের পক্ষ থেকে যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করে সবুজসংকেত দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ার ইন্টারস্পুটিনিকের কাছ থেকে ২১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ে মহাকাশে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অরবিটাল সøট বা নিরক্ষরেখা (কক্ষপথ ভাড়া) পেয়েছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১।

স্যাটেলাইটের মূল অবকাঠামো তৈরি করেছে ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস। গত ৩০ মার্চ একটি বিশেষ উড়োজাহাজে করে ফ্রান্স থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল লঞ্চপ্যাডে সেটি পৌঁছে। গত ৪ মে স্পেসএক্স বঙ্গবন্ধু-১-এর রকেটের প্রাক-উৎক্ষেপণ পরীক্ষা (ফায়ার স্ট্যাটিক টেস্ট) চালায়। এটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে পরদিন টুইটারে একটি বিবৃতি দেয় থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস। উৎক্ষেপণের পর তিন বছর প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেবে তারা। এরপর বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশলীদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। সাড়ে তিন হাজার কেজি ওজনের জিওস্টেশনারি কমিউনিকেশন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটকে নিয়ে ফ্যালকন-৯ কক্ষপথের দিকে ছুটছে কেনেডি স্পেস সেন্টারের ঐতিহাসিক লঞ্চ কমপ্লেক্স ৩৯-এ থেকে। এ লঞ্চ কমপ্লেক্স থেকেই ১৯৬৯ সালে চন্দ্রাভিযানে রওনা হয়েছিল অ্যাপোলো-১১।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের পরপরই স্টেজ ওয়ান চালু হয়ে ওপরের দিকে উঠতে শুরু করে রকেট; ঘণ্টায় ১৫ হাজার কিলোমিটার রকেটটি ধাবিত হচ্ছে মহাকাশের দিকে। এটি শব্দের চেয়েও প্রায় ২৪ গুণ বেশি গতিতে মহাকাশের দিকে ছুটবে। দৃষ্টিসীমায় থাকবে মাত্র ৭ মিনিটের মতো। সরাসরি উৎক্ষেপণ দেখেছেন যারা, তারা ছিলেন ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে। এটি উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে মহাকাশে নিজস্ব উপগ্রহ স্থাপনের তালিকায় নাম লেখাল বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ফলে সৃষ্টি হবে নিজস্ব ব্রডকাস্টিং সেন্টার, যা টেলিযোগাযোগ খাতে অভূতপূর্ব উন্নতির সহায়ক। সরকারি-বেসরকারি খাত মিলিয়ে বর্তমানে বছরে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার ব্যয় হচ্ছে এ খাতে। উপগ্রহটি স্থাপনের পর এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে ব্যয় করা থেকে রক্ষা পাবে দেশ। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোকে ট্রান্সপন্ডার ভাড়া দিয়ে প্রায় সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। স্যাটেলাইটটির ৪০টি ট্রান্সপন্ডার ক্যাপাসিটি থাকবে। এর মধ্যে ২০টি ট্রান্সপন্ডার বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে। বাকি ট্রান্সপন্ডার ভাড়া দেওয়া হবে বিভিন্ন দেশকে। যাতে বছরে আয় হবে প্রায় ১৪ মিলিয়ন ডলার।

বর্তমানে দেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল, টেলিফোন ও রেডিও, বিদেশি স্যাটেলাইট ভাড়ায় ব্যবহার করে। এতে প্রতি বছর ভাড়া বাবদ বাংলাদেশকে প্রায় ১১০ কোটি টাকা ভাড়া গুনতে হয়। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট চালু হলে দেশের এ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের পর্যবেক্ষণ, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ইতোমধ্যে গাজীপুর ও রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় দুটি ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এ দুটি ভূ-উপগ্রহকেন্দ্র নিজেদের মধ্যে সুরক্ষিত অপটিক্যাল ফাইবার দ্বারা সংযুক্ত। যাতে যেকোনো কারিগরি সমস্যায় কোনো সেবা বন্ধ হয়ে না যায়। দুটি উপগ্রহ কেন্দ্রের মধ্যে গাজীপুর প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হবে এবং বেতবুনিয়া বিকল্প পরিচালনা কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।

শুধু কারিগরি বা ব্যবসার দিক থেকে নয়, দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয়ও। কিন্তু যদি এর যথাযথ ব্যবহার না করা হয়, তা হলে দেশ অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তাই এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতের বিষয়ে জোর দিতে হবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্প বাস্তবায়নের বিশাল কর্মযজ্ঞে যাদের মেধা ও নিরলস পরিশ্রমে সফল সমাপ্তি সম্ভব হয়েছে, সেসব কর্মকর্তা, কর্মচারী, পরামর্শক ও সংশ্লিষ্টজন সবাই ইতিহাসের গর্বিত সাক্ষী হয়ে থাকবেন।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

abunoman1972@gmail.com

পিডিএসও/তাজ