আন্তর্জাতিক

জয়তু মাহাথির মোহাম্মদ

প্রকাশ : ১২ মে ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১২ মে ২০১৮, ১৮:৩০

এস এম মুকুল

মালয়েশিয়ার ১৪তম সাধারণ নির্বাচনে জয় পেয়ে আবারও ক্ষমতার মসনদে বসতে যাচ্ছেন ৯২ বছর বয়সী মাহাথির মোহাম্মদ। আমরা জানি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এ নির্বাচন অনেক কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়াকে নেতৃত্ব দেওয়া মাহাথির মোহাম্মদ অবসর নেওয়ার দেড় দশক পর রাজনীতিতে ফিরেছেন তার একসময়ের অনুসারী নাজিব রাজাককে ক্ষমতাচ্যুত করতে। গুরু-শিষ্যের লড়াইয়ে নবতিপর মাহাথির চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন তারই দীর্ঘদিনের দল ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনকে (ইউএমএনও)। ১৯৫৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত মালয়েশিয়া ছিল দারিদ্র্যপীড়িত বৃক্ষমানব দেশ। দারিদ্র্যের সঙ্গে ছিল নিরক্ষরতা আর পশ্চাৎ-মুখিতা। টেংকু আবদুর রহমান প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বহুধাবিভক্ত দেশটিতে রোপণ করেন ঐক্যের বীজ। তিনি যে ধারার সূচনা করেছিলেন, তা থেকে বিচ্যুত হননি তার উত্তরসূরি আবদুল রাজ্জাক, টোয়াংকু ইসমাইল এবং ড. মাহাথির বিন মোহাম্মদ। শেষোক্তজন আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি ও রূপকার হিসেবে পৃথিবীতে নন্দিত এবং প্রশংসিত। তার হাত ধরে মালয়েশিয়া পৌঁছে যায় স্বপ্নলোকে।

১৯৮১ সালে ড. মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। নেতা হিসেবে তিনি নির্ভুলভাবে বুঝতে পেরেছিলেন জাতির সাইকি সম্পর্কে। সম্পদের ছড়াছড়িই যে শুধু একটি দেশের উন্নয়নের চাবিকাঠি, এমন বিশ্বাস করেননি তিনি। কেননা, তার চোখের সামনেই ছিল অনেক সম্পদশালী দেশের নিঃস্ব হওয়ার উদাহরণ। সে সময় মাহাথির পেয়েছিলেন অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত কৃষিনির্ভর একটি দেশ, যা ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি দ্বারা বহু বছর লুণ্ঠনের কেন্দ্রভূমি। তার নেতৃত্বে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়

সরকারি জমি। জমি বিতরণের পর যখন বিতরণযোগ্য

জমি আর রইল না, আহ্বান জানানো হলো বিদেশি পুঁজির। বারবির মতো বিখ্যাত রাবারের পুতুল, ডানলপের মতো বিশ্বখ্যাত

রাবার পণ্য প্রস্তুতকারক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান প্রথমেই

বিশাল পুঁজি নিয়ে আসে জনমানুষবিহীন দুর্গম রাবার

বনাঞ্চলে। বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন

দেশে যে কঠোর শর্ত আরোপ করে উৎপাদন আর ব্যবসার নামে, মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে তা দেখা গেল না। কারণ

মাহাথিরের ভাষায় মালয়েশিয়ার টেবিলের ওপর দুর্নীতির মাত্রা কম। তাহলে দুর্নীতি কি মালয়েশিয়ায় নেই? অবশ্যই আছে। দুর্নীতিমুক্ত রাজ্য পৃথিবীতে আছে! তবে মালয়েশিয়ার দুর্নীতি ন্যূনতম পর্যায়ের। সেই শক্তিতে বলীয়ান হয়েই তো মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার দুর্নীতি সম্পর্কে অস্ট্রেলিয়ান প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ডকে বাধ্য করেছিলেন তার মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে।

রাজনৈতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করে মালয়েশিয়ার জোট সরকার দেশের উন্নয়নের দিকে নজর দেয়। শুরুতে একমাত্র সম্পদ ছিল কৃষিজমি। সে সময় মালয়েশিয়ায় উৎপাদন খাতের কোনো বিশেষজ্ঞ, পুঁজি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও বাজার বিষয়ে জ্ঞান ছিল না। সে ক্ষেত্রে শিল্পায়নের একমাত্র উপায় ছিল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানানো। এই বিদেশি বিনিয়োগ থেকে সরকার যদি আর্থিকভাবে লাভবান নাও হয়, তাহলে তারা কিছু মনে করবে না যদি শ্রমিকরা কাজ পায়। এ জন্য সরকার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা দিয়েছে। একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে। এ বিনিয়োগের ফলে মালয়েশিয়া অনেক ক্ষেত্রেই লাভবান হয়েছে। শ্রমিকরা দক্ষ হয়েছে। ব্যবস্থাপনার মান বেড়েছে। অনেকে এখন নতুন পণ্য প্রস্তুত করতে শিখেছে। মালয়েশিয়া এখন উৎপাদিত পণ্য রফতানি করে শতাধিক বিলিয়ন ডলার আয় করে।

মাহাথির মোহাম্মদ মন্ত্রীদের কাছে ব্যবসায়ী সমাজের সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করেন। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ চলমান থাকে। তাদের অভিযোগ ও প্রস্তাব শুনে সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করতে হয়। মালয়েশিয়া যখন স্বাধীন হয়, তখন তাদের উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন না। এ জন্য ব্রিটিশ জনপ্রশাসককে তিন-পাঁচ বছর রেখে দিয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশীয় দক্ষ কর্মকর্তা তৈরি করেন।

মালয়েশিয়ার জনসংখ্যা কত বিচিত্র, কত স্বতন্ত্র। ২ কোটি ৪০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগ মালয়ি মুসলমান, ২৪ ভাগ চৈনিক, ৭ ভাগ ভারতীয় এবং ৯ ভাগ বিভিন্ন উপজাতীয় গোষ্ঠীর। মালয়েশিয়া এভাবে হাজারো প্রকরণে ছিল বিভক্ত, খ-চ্ছিন্ন। সম্পদের নিরিখেও জনসমষ্টি বিভিন্ন মানের। শিক্ষার ক্ষেত্রেও ভিন্নতা ছিল অত্যন্ত প্রকট। সব মিলিয়ে মালয়েশিয়ায় জাতীয় ঐক্যের ক্ষেত্র ছিল সংকুচিত। সেই সংকুচিত ক্ষেত্রকে প্রসারিত করে মাত্র সাড়ে চার বা পাঁচ দশকে মালয়েশিয়ার নেতৃত্ব জাতীয় জীবনের সব স্রোতধারাকে সম্মিলিত করে রূপান্তরিত করেছে স্রোতস্বিনীতে।

কিন্তু মাহাথির মোহাম্মদ এবং তার পূর্বসূরিদের রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল, জাতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। মাহাথির অতীতকে স্মরণে রেখে বর্তমানকে সাজিয়েছেন এবং বর্তমানকে সাজানোর সময় ভবিষ্যৎকে সুস্পষ্টভাবে মনে রেখেছেন। ১৯৭৮ সালে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশের প্রত্যেকের জন্য যেন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যাপারে মনোযোগী হন। এ লক্ষ্যে বাস্তবায়নে প্রথম পদক্ষেপ ছিল প্রধানত দুটিÑ এক. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা। দুই. বিনিয়োগকারীদের সর্বাধিক সহায়তা নিশ্চিত করা। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আইনশৃঙ্খলার অস্বাভাবিকতায় কেউ যেন ভীতসন্ত্রস্ত না হয়। বিনিয়োগকারী যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় না পড়েন। প্রত্যেকে যেন বিনিয়োগকৃত সম্পদ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন। তা তিনি দেশি হোন অথবা বিদেশি। কর্মীদের উচ্ছৃঙ্খলতায় যেন কোনোভাবে উৎপাদন বিঘিœত না হয়। দুর্নীতির কালো থাবা যেন উৎপাদন ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি না করে। তার এই বলিষ্ঠ পদক্ষেপ মালয়েশিয়াকে বাণিজ্যবান্ধব রাষ্ট্রে পরিণত করে। ফলে দেখা যায়, শুধু টিন ও রাবার রফতানিকারক পশ্চাৎপদ দেশ যে মালয়েশিয়া মাত্র দুই দশকের মধ্যে ইলেকট্রনিকস, ইস্পাত, বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি, এমনকি মোটরগাড়ি রফতানিকারক রাষ্ট্রে পরিণত হলো। স্বাধীনতার সময় যে মালয়েশিয়ার অধিকাংশ জনসমষ্টি ছিল বেকার অথবা অর্ধবেকার। মাত্র দুই দশকে সেই মালয়েশিয়ায় কর্মরত রয়েছেন বিদেশের লাখ লাখ কর্মী। স্বাধীনতার সময় এমনকি পরবর্তী সময়েও যে মালয়েশিয়া প্রায় প্রকম্পিত হয়েছে নিম্নস্তরের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়। সেই মালয়েশিয়া আজ রূপান্তরিত হয়েছে একটি সুস্থ, নিরাপদ, উদার, কল্যাণমুখী জনপদে।

শুধু একজনের উদার, আদর্শিক যোগ্য ভিশনারি নেতৃত্ব আর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে মালয়েশিয়ানদের জীবনচিত্র। রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই তার দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর মাহাথিরের আগ্রহ ছিল সুগভীর। তাই একটি জাতির উন্নয়নে শিক্ষার ভূমিকা তার কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। সরকারি নীতি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের মধ্যে তিনি একটি সমঝোতা এবং সখ্য গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। সরকারি মালিকানাধীন সংস্থাগুলোর বেসরকারীকরণ মালয়েশিয়ার দ্রুত শিল্পায়নের সহায়ক হয়েছে। তিনি সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ আর সহযোগিতায় বেসরকারি খাতকে লাভজনক পর্যায়ে করতে মালয়েশিয়ান বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করেছেন। কিন্তু কীভাবে দেশকে এ তো সমৃদ্ধিশালী করলেন? সেটা অনেকের কাছেই প্রশ্ন। জাতির উন্নয়ন রেনেসাঁর প্রতীক হয়ে তিনি মালয়িদের মনে স্বপ্নসমৃদ্ধির বীজ বুনে দিলেন। চোখে এঁকে দিলেন ভবিষ্যৎ মালয়েশিয়ার ছবি। বিশ্বব্যাংক আইএমএফ বা দাতা সংস্থার পরামর্শ এড়িয়ে নিজের চিন্তা-চেতনায় দেশের জন্য যা মঙ্গলকর তাই করেছেন। মালয়েশিয়া মাত্র দুই দশকে অনগ্রসরতার পাতাল থেকে সগর্বে আরোহণ করছে অগ্রগতির পাহাড়ের চূড়ায়। ডা. মাহাথির এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন তার জাতীয় অগ্রগতির স্বপ্ন মালয়েশিয়ার জনগণের চোখে

এঁকে দিয়ে। তার আকাশচারিতার স্বপ্নসমগ্র মালয়েশিয়ায়

ছড়িয়ে দিয়ে। বাইশ বছরের শাসনকালে মালয়েশিয়াকে

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য পুরোদস্তুর তৈরি করে ভিশন ২০২০-এর দ্বারপ্রান্তে দেশকে রেখে তিনি স্বেচ্ছায় অবসর নিলেন। একটি সুখী সমৃদ্ধিশালী দেশের

প্রধানমন্ত্রিত্ব স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেওয়ার মতো যোগ্য ব্যক্তি

যে তিনিই শুধু, পরে ইতিহাস তা গভীর আগ্রহভরে লক্ষ করবে। কিন্তু এবার ক্ষমতাসীন হয়ে মাহাথির মোহাম্মদ কোন মিশন নিয়ে বিশ্বকে তথা মুসলিম বিশ্বকে কী চমক দেখাবেনÑসেটাই এখন দেখার বিষয়।

লেখক : সাংবাদিক, কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

lekhokmukul@gmail.com

"