ধর্ম

শবেবরাত এবং আমাদের করণীয়

প্রকাশ | ০১ মে ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট: ০১ মে ২০১৮, ০৪:০২

যুবায়ের আহমাদ

‘শবেবরাত’ পরিভাষাটির অস্তিত্ব কোরআন হাদিসে কোথাও নেই। তবে আমাদের সমাজে শবেবরাত বলতে যে রাতটিকে বোঝানো হয় তার (১৫ শাবানের রাত) ফজিলত নির্ভরযোগ্য হাদিসে প্রমাণিত। এ রাতে কী আমল, তা সম্মিলিত, নাকি একাকী; এ রাতের বিশেষ পদ্ধতির কোনো নামাজ আছে কি নাÑতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে কিন্তু এ রাতের ফজিলত অস্বীকারের সুযোগ নেই। হাদিসে এ রাতকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বা মধ্য শাবানের রাত হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। নির্ভরযোগ্য হাদিস দ্বারা এ রাতের ফজিলত প্রমাণিত। হজরত আবু মুসা আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে তার সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং মুশরিক ও মুশাহিন (বিদ্বেষপোষণকারী) ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনে মাজা : ১/৪৪৫) মুহাদ্দিনগণ এ হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। বিখ্যাত হাদিস গবেষক নাসিরুদ্দিন আলবানীর (রহ.) মতে এ হদিসটি হাসান। (সিলসিলাতুল আহাদিস আস সহিহাহ : ৩/১৩৫) সুতরাং মধ্য শাবানের রাত বা শবেবরাত আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ক্ষমার এক বিশেষ সুযোগ এতে সন্দেহ নেই।

কিন্তু আমাদের সমাজের এক শ্রেণির মানুষ অজ্ঞাতাবশত এ রাত নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে করতে একে ‘ভাগ্য রজনী’ মনে করেন, যা সম্পূর্ণ হাস্যকর। এ রাতে হায়াত, মওত, রিজিক ইত্যাদি নির্ধারণ করা হয় এ ধারণা কোরআন হাদিসের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। সুরা দুখানের ৩-৪ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় কেউ কেউ এ রাতকে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছেন। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি একে (পবিত্র কোরআন) এক মুবারক রজনীতে অবতীর্ণ করেছি, আমি তো সতর্ককারী। এ রাতেই প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়। (সুরা দুখান : ৩-৪) এখানে একটি ব্যাপার স্পষ্ট, যে রাতে (লাইলাতুম মুবারাকা) গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো স্থির হয় তা হলো কোরআন নাজিলের রাত। আর কোরআনুল কারিম কোন রাতে নাজিল হয়েছে তা সচেতন মুসলিমমাত্রই জানার কথা। কারণ, কোরআন কোন রাতে নাজিল হয়েছে, তা কোরআনুল কারিমে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি একে (কোরআনকে) লাইলাতুল কদরে অবতীর্ণ করেছি। (সুরা কদর : ১) সুতরাং এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ স্থির হওয়ার যে রাতের কথা বলা হয়েছে তা নিঃসন্দেহে লাইলাতুল কদর। লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান (মধ্য শাবানের রাত বা শবেবরাত) নয়। সুরা দাখানের তৃতীয় আয়াতের ‘লাইলাতুম মুবারাকা’র ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসির বলেন, ‘কোনো কোনো লোক এ কথাও বলেছেন, যে মুবারক রজনীতে কোরআনুল কারিম অবতীর্ণ হয় তা হলো শাবানের পঞ্চদশতম রজনী। এটা সরাসরি কষ্টকর উক্তি। কেননা, কোরআনের স্পষ্ট ও পরিষ্কার কথা দ্বারা কোরআনের রমজান মাসে নাজিল হওয়া সাব্যস্ত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা সুরা বাকারার ১৭৭ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘রমজান ওই মাস যাতে কোরআনুল কারিম অবতীর্ণ করা হয়।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির : ১৬/৬১০)

মধ্য শাবানের রাতের ফজিলত অস্বীকার করা অথবা এর ফজিলত স্বীকার করতে গিয়ে একে ‘ভাগ্য রজনী’ বানিয়ে ফেলা দুটোই বাড়াবাড়ি। এ দুই ছাড়াছাড়ি ও বাড়াবাড়ি ছেড়ে ভারসাম্যপূর্ণ মাধ্যমপন্থা হলোÑএ রাতকে ক্ষমার রাত মনে করা। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা এ রাতে তাঁর বান্দাদের ক্ষমা করে দেবেন। তবে মুশরিক এবং হিংসাপোষণকারীকে এ রাতে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। উল্লিখিত হাদিসে একটি বিষয় স্পষ্ট, মধ্য শাবানের রাতে ক্ষমা পাওয়ার জন্য শর্ত হলো অন্তরকে শিরক ও হিংসা-বিদ্বেষ থেকে খালি করা। কেউ যদি সারারাত নফল নামাজ পড়ে কিন্তু তার অন্তরকে এ দু জিনিস থেকে মুক্ত না করে তাহলে সে ক্ষমার অন্তর্ভুক্ত হবে না। আবার কেউ যদি এ রাতে কোনো নফল নামাজ নাও পড়ে, কিন্তু তার অন্তরকে শিরক ও হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত করে তাহলে হাদিস অনুযায়ী তার ক্ষমা পাওয়ার আশা আছে। অবশ্য সে নফল ইবাদতের সওয়াব থেকে মাহরুম হবে।

এ রাতে নফল নামাজ পড়া ও আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করা যায়। তবে তা হবে ব্যক্তিগত, সমষ্টিগত নয়। নফল নামাজ, জিকির, দুআ ও তিলাওয়াত যাই হোক না কেন, সবই একাকীভাবে হওয়া উচিত। এ রাত কেন্দ্রিক দল বেঁধে মসজিদে সমাবেত হওয়া বিদআত। কারণ, এর কোনো প্রমাণ হাদিসে নেই। নবীজি (সা.) তা করেননি, সাহাবায়েকেরামের যুগেও এর প্রচলন ছিল না। (ইততিজাউস সীরাতিল মুস্তাকিম : ২/৬৩১) নফল নামাজ পড়লে তা একেবারেই সাধারণ সফল নামাজ হবে। এর জন্য বিশেষ ধরনের নামাজ আবিষ্কার করা, প্রতি রাকাতে বিশেষ কোনো সুরাকে ১০-২০ বার পড়ার বিশেষ ফজিলত মনে করা বিদআত ও পরিত্যাজ্য।

শাবানের শেষ কয়েক দিন ছাড়া নবীজি (সা.) বেশি বেশি রোজা রাখতেন। এর কারণ সম্পর্কে নবীজিকে (সা.) জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এ মাসে আল্লাহ তাআলার কাছে মানুষের কর্ম ওঠানো হয়। আমি চাই যে, রোজা রাখা অবস্থায় আমার আমল ওঠানো হোক।’ (নাসাঈ : ৪/২০১) তাই এ মাসের নফল রোজার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু মধ্য শাবানের রাত (শবেবরাত) উপলক্ষে এর পরদিন অর্থাৎ ১৫ শাবান পরদিন রোজা রাখার ব্যাপারে হাদিসে যা আছে তার বর্ণনার সূত্র খুবই দুর্বল। বর্তমান সময়ের প্রসিদ্ধ ইসলামিক স্কলার আল্লামা তাকি উসমানী তার ইসলামী খুতুবাতে বলেন, ‘শবেবরাতের পরবর্তী দিনে (১৫ শাবান) রোজা রাখার ব্যাপারে মাত্র একটি হাদিসের সমর্থন পাওয়া যায়। সনদ ও বর্ণনাসূত্রের দিক থেকে হাদিসটি খুবই দুর্বল। এ দিনের রোজাকে কেবল একটি হাদিসের ভিত্তিতে মুস্তাহাব বলা অনেক আলেমের মতোই অনুচিত। ইমাম ইবনে তাইমিয়ার মতে শুধু ১৫ শাবান রোজা রাখা মাকরুহ। তাই শুধু ১৫ তারিখে রোজা না রেখে আইয়ামে বীজের রোজা হিসেবে শাবানের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখলে একই সঙ্গে দুটোই হচ্ছে।

মধ্য শাবানের রাত আমাদের একটা সতর্কবার্তা দিয়ে যায় যে, আল্লাহ তাআলা যেমন শিরক ক্ষমা করেন না, তেমনি কোনো মুসলমান যদি অন্য ভাইয়ের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করে তা-ও আল্লাহ ক্ষমা করেন না। এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় গুনাহ হলো আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কাউকে শরিক করা। আর শবেবরাতের হাদিসে সেই শিরকের সঙ্গেই হিংসা-বিদ্বেষকে উল্লেখ করা হয়েছে। সংঘাতময় এ সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনতে মধ্য শাবানের রাতকেন্দ্রিক এ হাদিসখানা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সমাজ জীবনে ভিন্নমত বা মতবিরোধ থাকতেই পারে। তবে ভিন্নমত, বিরোধ আর হিংসা-বিদ্বেষ এক নয়। কারো কোনো বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করলেও তার হিংসা বা অমঙ্গল কামনা করা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হে বৎস, তুমি এমনভাবে জীবনযাপন করো যে সকালে সন্ধ্যায় (কখনো) তোমার অন্তরে কারো প্রতি ধোঁকা বা অমঙ্গল কামনা থাকবে না। এটা আমার সুন্নত। (তিরমিজি : ৫/৪৬) কারো অমঙ্গল কামনা করা মারাত্মক গুনাহ, জাহান্নামে যাওয়ার কারণ। আবার কাউকে ভালোবাসা এক মহান ইবাদত, জান্নাতে প্রবেশের কারণ। নবীজি (সা.) বলেন, ‘ইমানদার না হওয়া পর্যন্ত তোমরা কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর তোমরা পরস্পর পরস্পরকে না ভালোবাসা পর্যন্ত ইমানদার হতে পারবে না।’ (সহিহ মুসলিম : ১/৭৪) আল্লাহ তাআলার দরবার থেকে ক্ষমা পেতে হলে প্রতিটি মুসলমানের উচিত তার অন্তরকে শিরকমুক্ত করা এবং তার আত্মীয়-স্বজন, ভাইবোন, প্রতিবেশী কিংবা যে কারো প্রতি অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ বা অমঙ্গল কামনা থাকলে তা থেকে অন্তরকে মুক্ত করা। সেই ভাইয়ের কল্যাণ কামনা করে আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করা।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

jubayer.ahmad93@gmail.com

পিডিএসও/মুস্তাফিজ

"