সর্বজনীন উৎসব

* মঙ্গল শোভাযাত্রার ইউনেসকোর স্বীকৃতি লাভ * অর্ধশত বছর পার করল রমনায় ছায়ানটের বর্ষবরণ * ২৫ জেলায় নতুন করে বসছে পুরনো লোকজমেলা * কয়েক হাজার কোটি টাকার বৈশাখী কেনাকাটা হচ্ছে

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০১৮, ১১:০১

প্রতীক ইজাজ

পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নতুন বছর বরণ এখন সর্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। এ উৎসব এখন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক। রাষ্ট্রীয়ভাবে এদিন ছুটি থাকে। দেশজুড়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ মেতে ওঠে উৎসবে। ফিরে আসে বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি এবং জীবনাচারণের নানা অনুষঙ্গ ও ঐতিহ্য। শহর থেকে মানুষ ছুটে যায় স্বজনের কাছে, সম্মিলিতভাবে উৎসব পালনে। এমনকি দেশ ছাড়িয়ে এ উৎসব এখন উদযাপিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষাভাষী সব দেশে ও অঞ্চলে। সম্রাট আকবরের আদেশ মতে, তৎকালীন বাংলার জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন ও আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সন বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাস থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময় ৫ নভেম্বর, ১৫৫৬ থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। সে সময় থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়।

সেই পহেলা বৈশাখ এখন দেশের লোকজের সঙ্গে নাগরিক জীবনের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধ হয়ে উঠেছে বলে মত গবেষকদের। তাদের মতে, পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ বরণ উৎসব এখন বাঙালি জাতিকে একত্রিত করে জাতীয়তাবোধে, অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিতে। বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম, ত্রিপুরাসহ দেশে-বিদেশে বসবাসরত প্রতিটি বাঙালি এই দিন নিজ সংস্কৃতিতে নিজেকে খুঁজে পায়। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান পরিণত হয় প্রতিটি বাঙালির কাছে শিকড়ের মিলন মেলায়। এই উৎসবের রং একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়তে বাঙালি জাতিকে এগিয়ে নিচ্ছে।

দেশ ছাড়িয়ে পহেলা বৈশাখের বেশকিছু অনুষঙ্গ এখন বিশ্বময় স্বীকৃত। এর মধ্যে অন্যতম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের মঙ্গল শোভাযাত্রার ইউনেসকোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি লাভ। এর আগে ২০১৩ সালে জামদানি শাড়ি ও ২০০৮ সালে বাউল সংগীত ইউনেসকোর স্পর্শাতীত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে ১৯৬৭ সালে ছায়ানট রমনার বটমূলে বর্ষবরণের যে উদ্যোগ নিয়েছিল; নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে সে বর্ষবরণ গত বছর পার করেছে অর্ধশত বছর। বর্ষবরণ ও চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় (রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) উপজাতীয়দের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’ও নতুনমাত্রায় রূপ নিয়েছে।

এ ছাড়া সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমিসহ সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ফিরে আসতে শুরু করেছে বাঙালির লুপ্তপ্রায় সংস্কৃতি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রামীণ মেলা, খেলাধুলা, পূজা অর্চনা ও জীবনাচারণ। বিশেষ করে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র দেশের অর্থনীতির চাঙ্গাভাব এই উৎসবের সর্বজনীনতার অন্যতম উদাহরণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান উৎসব উল্লেখ করে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ও লোকগবেষক শামসুজ্জামান খান বলেন, পহেলা বৈশাখ এখন সর্বজনীন উৎসব। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এর ব্যাপ্তি বাড়ছে। মহামিলনের আনন্দ উৎসব থেকেই বাঙালি ধর্মান্ধ অপশক্তির কূট ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করার এবং কুসংস্কার ও কূপমন্ডূকতার বিরুদ্ধে লড়াই করার অনুপ্রেরণা পায়। অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনায় জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়।

এই গবেষক বলেন, নতুন বছর মানেই নতুন সম্ভাবনা, নতুন আশায় পথচলা। বছরের প্রথম দিন থেকেই বুকভরা আশা নিয়ে নতুন উদ্যমে ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ হবে জাতি। আরো সোচ্চার হবে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি মৌলবাদ ও জঙ্গি নিধনের দাবিতে। এটা বাংলাদেশের সব মানুষের উৎসব। তাই এই অর্জন এ দেশের সবার।

গবেষকরা পহেলা বৈশাখের সর্বজনীন উৎসব হয়ে ওঠার পেছনে বেশকিছু অনুষঙ্গের উদাহরণ দিয়েছেন। এগুলো হলোÑ

মঙ্গল শোভাযাত্রা : সর্বজনীন উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের মঙ্গল শোভাযাত্রা। গত ২০১৬ সালে জাতিসংঘের সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতির তালিকায় মঙ্গল শোভাযাত্রাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এ ব্যাপারে চারুকলা অনুষদের ডিন ও শোভাযাত্রা শুরুর অন্যতম উদ্যোক্তা নিসার হোসেন বলেন, এই মঙ্গল শোভাযাত্রা ১৯৮৯ সাল থেকে নিয়মিত হয়ে আসছে। ইউনেসকোর স্বীকৃতি দেওয়ার মূল কারণ, এটা শুধু একটা সম্প্রদায়বিশেষের নয়, এটা গোটা দেশের মানুষের, সারা পৃথিবীর মানুষের। ধর্ম-বর্ণ-জাতি-লিঙ্গ-নির্বিশেষে দেশের সব মানুষের একই চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের বিষয়টিও ইউনেসকোর এই স্বীকৃতি লাভের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।

এবারও বাংলা নববর্ষ ১৪২৫-পহেলা বৈশাখ উদযাপনে চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এবার মঙ্গল শোভাযাত্রায় থাকছে রং-বেরঙের লোকজ ঐতিহ্যের প্রতিরূপ হিসেবে বক ও মাছ, মা ও পাখি, সূর্য, হাতি, সাইকেলে চড়া ট্যাপা পুতুল। পাশাপাশি ফুল, রাজা-রানীসহ বিভিন্ন লোকজ মোটিফ। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্যÑ ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।’

রমনায় ছায়ানটের বর্ষবরণ : সর্বজনীন অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ছায়ানটের রমনার বটমূলের বর্ষবরণ উৎসব গত বছর অর্ধশত বছর পূর্ণ করেছে। ১৯৬৪ সালে ছায়ানট পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু করে। কিন্তু রমনা বটমূলে এর যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৭ সালে। মূল লক্ষ্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা। পাকিস্তানি শাসকদের নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করে সেদিন রমনায় যে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল, তা পরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকনির্দেশনাও স্থির করে দিয়েছিল সেদিন সাংস্কৃতিক কর্মীদের এই প্রতিবাদী অবস্থান। ঐতিহ্য অনুযায়ী এবারো ছায়ানট রাজধানীর রমনায় আয়োজন করেছে বর্ষবরণ উৎসবের। ছায়ানটের দেড় শতাধিক শিল্পী আবৃত্তিসহ ১৬টি একক ও ১২টি সম্মেলক গান পরিবেশন করবেন। এবার ছায়ানটের মূল সুরÑ বিশ্বায়নের বাস্তবতায় শেকড়ের সন্ধানে।

বৈশাখী কেনাকাটায় অর্থনীতির চাঙ্গাভাব : চার বছর ধরে সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বৈশাখে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে উৎসব ভাতা পাচ্ছেন। বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারা-কর্মচারীরাও পাচ্ছেন ভাতা। সবশ্রেণির মানুষ এখন পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে নতুন পোশাক কেনে। হালখাতা উপলক্ষে বৈশাখে মিষ্টির দোকানের ব্যবসা চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। এভাবে সামাজিক, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বর্ষবরণের ব্যাপ্তি বাড়ছে। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের ধারণা, বৈশাখকেন্দ্রিক কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, অন্যান্য উৎসবে বিদেশি জিনিস কেনার একটা প্রবণতা থাকে। তবে লোকজন নববর্ষে সচেতনভাবে দেশীয় পণ্য ব্যবহার করেন। এখন বৈশাখী ভাতা দেওয়া হচ্ছে। বৈশাখী মেলার সংখ্যা বাড়ছে। উৎসব এখন শহর-গ্রাম সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে বৈশাখের অর্থনীতির আকার প্রতিবছরই বাড়ছে।

বসছে লোকজ মেলা : বাংলা একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে শহর ও গ্রামাঞ্চলে লুপ্তপ্রায় লোকজ মেলাগুলো পুনরায় বসতে দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্তত ২৫ জেলায় পুরনো লোকজমেলা নতুন করে বসছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঢাকার নিকটবর্তী শুভাঢ্যার বৈশাখী মেলা, টঙ্গীর স্নানকাটা মেলা, মিরপুরের দিগাঁও মেলা, সোলারটেক মেলা, শ্যামসিদ্ধি মেলা, ভাগ্যকুল মেলা, কুকুটিয়া মেলা এবং রাজনগর মেলা। দিনাজপুরের ফুলতলী, রানীশংকৈল, রাজশাহীর শিবতলীর বৈশাখী মেলাও বর্তমানে বিরাট উৎসবে রূপ নিয়েছে।

লোক গবেষকরা জানান, মেলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগায়ক ও লোকনর্তকরা যাত্রা, পালাগান, কবিগান, জারিগান, গম্ভীরা গান, গাজীর গান, আলকাপ গানসহ বিভিন্ন ধরনের লোকসংগীত, বাউল-মারফতি-মুর্শিদি-ভাটিয়ালি ইত্যাদি আঞ্চলিক গান পরিবেশন করেন। লাইলী-মজনু, ইউসুফ-জুলেখা, রাধা-কৃষ্ণ প্রভৃতি আখ্যানও উপস্থাপিত হয়। পুতুলনাচ, নাগরদোলা, সার্কাস ইত্যাদি মেলার বিশেষ আকর্ষণ। থাকে বায়োস্কোপও।

ফিরছে পুরনো উৎসব : কালের বিবর্তনে নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত বিলুপ্তপ্রায় অনেক পুরনো উৎসব ফিরে আসছে বলে জানান বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। তিনি বলেন, ঢাকার ঘুড়ি ওড়ানো এবং মুন্সীগঞ্জের গরুর দৌড় এখন আবার হচ্ছে। ঘোড়দৌড়, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, পায়রা ওড়ানো, নৌকাবাইচ, বহুরূপীর সাজ ইত্যাদি গ্রামবাংলার জনপ্রিয় খেলা ফিরে আসছে। বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন আঞ্চলিক অনুষ্ঠানের মধ্যে চট্টগ্রামের বলীখেলা এবং রাজশাহীর গম্ভীরা প্রবল উৎসাহ-উদ্দীপনায় অনুষ্ঠিত হয়।

পিডিএসও/রিহাব

 

"