মানবসম্পদ ও টেকসই উন্নয়ন

প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৮:৫৩ | আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৯:১০

দিলীপ কুমার আগরওয়ালা

বাংলাদেশের মাথাপিছু সম্পদের পরিমাণ ১২ হাজার ৭১৪ মার্কিন ডলার বা ১০ লাখ টাকা। বিশ্বব্যাংকের দ্য চেঞ্জিং ওয়েলথ অব ন্যাশন-২০১৮ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই চমক লাগানো তথ্য দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এর মধ্যে ব্যক্তির উৎপাদিত সম্পদের বাজারমূল্য ৩ হাজার ৪৩৪ ডলার। প্রাকৃতিক সম্পদের মাথাপিছু মূল্য ২ হাজার ২৩৪ ডলার। বাংলাদেশে যে পরিমাণ চাষযোগ্য জমি রয়েছে তার আর্থিক মূল্য মাথাপিছু ১ হাজার ৫০১ ডলার। আর মানবসম্পদের মূল্য ধরা হয়েছে মাথাপিছু ৭ হাজার ১৭০ ডলার।

১৯৯৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১৪১টি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, মানবসম্পদ, উৎপাদিত সম্পদ ও বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য পর্যালোচনা করে প্রণীত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী মোট সম্পদের বড় অংশ এখন মানবসম্পদ। আর দরিদ্র দেশগুলোর অর্ধেকের বেশি সম্পদের উৎস প্রকৃতি। অর্থনৈতিক উন্নতির ধারা অব্যাহত রাখতে মানবসম্পদ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে দুনিয়াজুড়ে সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ওই দুই দশকে মধ্য আয়ের দেশগুলোর দ্রুত উন্নতি হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোর উন্নতি ছিল উল্লেখ করার মতো। তবে ধনী দরিদ্রের সম্পদের ব্যবধান অনেক বেড়েছে। অর্থনৈতিক উন্নতিতে প্রাকৃতিক সম্পদে একক নির্ভরতার দিন ফুরিয়ে আসছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে মানবসম্পদকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে দেশের মাথাপিছু আয় বেড়ে হয়েছে ১৬১০ মার্কিন ডলার। প্রতি ডলার ৮০ টাকা ধরে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার ৮০০ টাকা। জাতীয় আয় বাড়ার পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) চূড়ান্ত হিসাবে গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। বর্তমানে জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৯৬৮ কোটি ডলার। জিডিপির আকার ১০ হাজার কোটি ডলার ছাড়াতে স্বাধীনতার পর ৩৪ বছর সময় লেগেছে। বাংলাদেশ, ইথিওপিয়া ও কম্বোডিয়া এই তিনটি দেশেই পরপর দুই বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের বেশি হলো। তিনি মনে করেন, জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ ছাড়ানোর পেছনে দেশের কৃষক, শ্রমিক, বেসরকারি খাতসহ সবার অবদান আছে। এবারই প্রথমবারের মতো জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগ ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। গত অর্থবছরে জিডিপির সাড়ে ৩০ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছে। এর আগের অর্থবছর (২০১৫-১৬) এই হার ছিল ২৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জাতীয় মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪৬৫ ডলার। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২০ সালে প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে পৌঁছানোর কথা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ২০১৯ সালেই এটাকে আমরা ৮ শতাংশে নিয়ে যেতে পারব।

বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে পিছিয়ে থাকলেও বিপুল জনসংখ্যার কারণে মানবসম্পদে সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ রয়েছে। জনশক্তিকে জনসম্পদে পরিণত করতে হলে মানবসম্পদের উন্নয়নে তৎপর হতে হবে। মানবসম্পদকে সবচেয়ে বড় সম্পদ মনে করে টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে হবে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম প্রতিবেদনে এ বিষয়টি তুলে ধরে বলেছেন, মানবসম্পদকে সবচেয়ে বড় সম্পদ বিবেচনা না করলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে না। প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দ্রুত উন্নয়ন নিশ্চিত করেছে মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে। অথচ একই সময়ে প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ অনেক দেশের সম্পদ কমেছে মানবসম্পদকে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে। বাংলাদেশে দ্রুত উন্নয়ন ও সম্পদ বৃদ্ধি পেলেও ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান বৃদ্ধি একটি উদ্বেগের বিষয়। সুষম উন্নয়নই এ সমস্যার ইতি ঘটাতে পারে।

বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। এ জন্যই আন্তরিক ও নিবেদিতভাবে প্রত্যেকের কাজ করা উচিত, যাতে প্রিয় মাতৃভূমির সমৃদ্ধির পথে যে যাত্রা তা অব্যাহত থাকে এবং বিশ্বে এ দেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। যেকোনো মানবতার জন্য আত্মোৎসর্গে প্রস্তুত থাকা প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার যে মূল চেতনা তা সমুন্নত রেখে বাংলাদেশকে আমি বিশ্বে মর্যাদাপূর্ণ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই, জাতি হিসেবেও আমরা বিশ্বের বুকে মর্যাদার আসন নিয়ে বাস করতে চাই। ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। মাথাপিছু আয় বাড়ার পাশাপাশি দারিদ্র্যবিমোচনের হার শতকরা ২২ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। আমাদের লক্ষ্য অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে আমরা বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হব। পরিশেষে বলছি, বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ দেশ উন্নতির পথেও এগিয়ে যাবে।

লেখক : পরিচালক, এফবিসিসিআই

পিডিএসও/হেলাল