ফেসবুক-বিকাশে ‘ভয়ংকর’ ফাঁদ

প্রযুক্তিতে প্রতারকরা গ্রাহকের চেয়েও দক্ষ *নজরদারির যন্ত্র কিনছে সরকার

প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০১৭, ১০:১৫ | আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০১৭, ১৪:২৯

জুবায়ের চৌধুরী

‘দোস্ত, আমার ১৪ হাজার টাকা লাগবে, এক্ষুনি। পাঠাতে পারবি? আমার মুঠোফোনেও ব্যালেন্স নেই। তাই তোকে ফোন করতে পারছি না।’ ফেসবুক ইনবক্সে হঠাৎ বন্ধু জাফিউল বাবুর এমন ‘জরুরি’ বার্তা চোখে পড়ে জাকিরুল আহসানের। বন্ধুর বার্তা পেয়ে জাকির ভাবেন, নিশ্চয়ই বিশেষ প্রয়োজনে টাকা দরকার পড়েছে জাফিউলের। আশপাশে হয়তো কোনো ব্যাংকের বুথও নেই। সাত-পাঁচ না ভেবেই বন্ধুর পাঠানো বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠিয়ে দেন জাকির। প্রায় একই সময়ে জাফিউল বাবু ফেসবুকের ইনবক্সে আরেক বন্ধু আবু তালেবের কাছে ১০ হাজার টাকা চান। আবু তালেব তার সঙ্গে দেখা করে টাকা নিয়ে যেতে বলেন। কিন্তু জাফিউল একটি বিকাশ নম্বর দিয়ে জরুরি টাকা পাঠানোর অনুরোধ করেন।

বন্ধুর বিপদ বুঝে সঙ্গে সঙ্গে জাফিউলকে ফোন করে তালেব। ফেসবুক ইনবক্সে টাকা চাওয়ার বিষয়ে কথা বললে জাফিউল তা অস্বীকার করেন। একপর্যায়ে দুই বন্ধুই বুঝতে পারেন, অল্পের জন্য ভয়ংকর প্রতারণার শিকার থেকে রক্ষা পান তারা। একপর্যায়ে অনেক কষ্টে জাফিউল তার হ্যাক হয়ে যাওয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি রক্ষা করেন। পরে পোস্টে অন্য বন্ধুদের সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করেন। এরপর জাফিউল জানতে পারেন, ইতোমধ্যে তার নামে চারজনের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারকরা।

কেস স্টাডি-২ : একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তাজুল ইসলাম। প্রতিদিনের মতো অফিসে কাজ করছিলেন তিনি। একদিন দুপুরে তার মুঠোফোনে একটি বিকাশের বার্তা আসে। তাতে লেখা ছিল, ‘ইউ হ্যাভ রিসিভড টাকা ৫০০০ ফ্রম...’। বিকাশের এই বার্তা দেখে তাজুল ভেবে পাচ্ছিলেন না, কে তাকে টাকা পাঠিয়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার কাছে একজন লোক ফোন করেন। তিনি জানান, ভুল করে তার নম্বরে পাঁচ হাজার টাকা পাঠানো হয়েছে। তাজুলকে সেই ফেরত দিতে অনুরোধ করেন লোকটি। সাত-পাঁচ না ভেবে তাজুল ওই লোকের বিকাশ নম্বরে টাকা ফেরত দেন। পরে তিনি নিজের বিকাশ অ্যাকাউন্ট চেক করে বুঝতে পারেন তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। কিন্তু ততক্ষণে টাকা চলে যায় প্রতারকদের পকেটে!

শুধু জাফিউল কিংবা তাজুল নয়, ফেসবুক-বিকাশের মাধ্যমে এভাবে প্রতিদিন নিত্যনতুন প্রতারণার জালে পা দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। না বুঝে প্রতারকদের টোপে নিঃস্ব হচ্ছেন বিকাশ গ্রাহক কিংবা সাধারণ ফেসবুক ব্যবহারকারীরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফেসবুক হ্যাক করার পর আইডির প্রকৃত মালিকের কাছেও টাকা দাবি করছে ডিজিটাল অপরাধীরা। টাকা দিলে ফেরত দেওয়া হয় আইডি। প্রতিদিনই এ রকম অভিযোগ আসছে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কাছে। তবে যে হারে মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, সে হারে মামলা হচ্ছে না। অর্থাৎ মানুষ ঝামেলা এড়াতে পুলিশের কাছে যান না। তাই ডিজিটাল এই প্রতারণার জাল কতদূর গড়িয়েছে সে বিষয়ে অনেকটাই অন্ধকারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ডিজিটাল এসব ফাঁদ প্রতিরোধ করতে না পারলে ভবিষ্যতে আরো ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবে দেশ।

চলতি বছরের আগস্টে লাক্স তারকা মেহজাবিন চৌধুরীর ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়েছিল। পরে ওই হ্যাকারকেও গ্রেফতার করে সাইবার ক্রাইম ইউনিট। একইভাবে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর আইডি হ্যাক করে তার স্বজনদের কাছ থেকে টাকা দাবি করা হচ্ছিল। গুলশান থানায় জিডি করার বিষয়টি জানাজানি হলে তার আইডিটি ফেরত পান তিনি। জানুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার এক পুলিশ কনস্টেবলের ফেসবুক হ্যাক করে তার পরিচিত লোকজনের কাছ থেকে অর্ধলাখ টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারক চক্র। এ ঘটনায় পুলিশ কনস্টেবল আসাদুজ্জামান বাদী হয়ে সদর মডেল থানায় জিডি করেন। সম্প্রতি মনসুর ইবনে কামাল নামে এক হ্যাকারকে গ্রেফতার করেছে ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিট। তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ এই হ্যাকার মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিষয়ে লেখাপড়া করছে। দীর্ঘদিন থেকেই এই জ্ঞানকে নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মানুষের কাছ থেকে। ধারণা করা হচ্ছে, দেশি-বিদেশি একটি চক্রের সঙ্গে জড়িত মনসুর। এ বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করছে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট।

ডিজিটাল প্রতারণার বিষয়ে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের (সাইবার ক্রাইম) উপকমিশনার মো. আলিমুজ্জামান জানান, টার্গেট করা ব্যক্তির ফেসবুকের ইনবক্সে ও কমেন্টে ম্যালওয়ার ব্যবহার করে মনসুর। এতে ক্লিক করলেই ফেসবুকের পাসওয়ার্ড চলে যায় তার কাছে। এভাবেই ফেসবুক হ্যাক করত মনসুর। দীর্ঘদিন ধরে ফেসবুক হ্যাক করে প্রতারণামূলকভাবে অর্থ আদায় করছিল সে। জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। মনসুরের সঙ্গে কোনো চক্রের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। বিষয়টি নিশ্চিত হতে তদন্ত করা হচ্ছে। মনসুর স্বীকার করেছে, হ্যাক করার জন্য সে নিজেই ম্যালওয়ার তৈরি করত। হ্যাক করে সহজেই লাখ লাখ টাকা আয় করা যায় বলে এতে ঝুঁকে যায় কম্পিউটার বিজ্ঞানের এই ছাত্র।

আলিমুজ্জামান আরো জানান, ‘নানাভাবে সাইবার অপরাধ হচ্ছে। ফেসবুক হ্যাক করে টাকা আদায়ের ঘটনাও এর মধ্যে অন্যতম। আমরা প্রতিটি অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করে জড়িতদের গ্রেফতার করছি।’ এ বিষয়ে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ফেসবুকের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কোনো লিঙ্কে জেনে-বুঝে ক্লিক করতে হবে। সচেতন হলে অনেক সাইবার অপরাধই কমে যাবে বলে মনে করেন ডিসি আলিমুজ্জামান।

সোশ্যাল মিডিয়া পর্যবেক্ষণে যন্ত্র আসছে : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপি পর্যবেক্ষণে উচ্চপ্রযুক্তির কারিগরি যন্ত্র কিনতে যাচ্ছে সরকার। গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করতে এসব যন্ত্র কেনা হচ্ছে। তবে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সরাসরি ক্রয় বা ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) পদ্ধতি অনুসরণ করে এসব যন্ত্রপাতি কেনা হবে। ওয়াই-ফাই ইন্টারসেপশন সিস্টেম এবং মোবাইল ইন্টারসিপেটর-জিএসএম সেলুলার/ মোবাইল ডিভাইস সাবসক্রাইভার ‘অব দি এয়ার’ ম্যাস ইন্টারসেপশন সিস্টেম (জিএসএম+ডাউনগ্রেডেড ইউএমটিএস) যন্ত্র দুটি কিনতে লাগছে ৩৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ওয়াই-ফাই ইন্টারসেপশন সিস্টেম কিনতে লাগছে ২৪ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং মোবাইল ইন্টারসিপেটর-জিএসএম সেলুলার/মোবাইল ডিভাইস সাবসক্রাইভার ‘অব দি এয়ার’ ম্যাস ইন্টারসেপশন সিস্টেম (জিএসএম+ডাউনগ্রেডেড ইউএমটিএস) কিনতে লাগছে ১৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো যন্ত্র দুটি কেনার প্রস্তাবে গত বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি অনুমোদন দিয়েছে।

সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে উচ্চপ্রযুক্তি বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম কিনতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গত ২৪ আগস্ট জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদফতর (এনএসআই) একটি প্রস্তাব পাঠায়। ওই প্রস্তাবে বলা হয়, বর্তমানে প্রায় প্রতিটি প্রতারণা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, হুমকি, জঙ্গিবাদ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড মুঠোফোন এবং মুঠোফোনভিত্তিক বিভিন্ন মাধ্যমে হয়ে থাকে। এসব অপরাধমূলক কর্মকা- নিরসনে এবং অল্প সময়ের মাধ্যমে অপরাধীদের চিহ্নিত করে গোয়েন্দা কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে মোবাইল ইন্টারসেপ্টর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া ইন্টারনেট প্রযুক্তির অপব্যবহারকারীরা বিকল্প ও উন্নত যোগাযোগ মাধ্যমের সহজলভ্যতায় দিন দিন ওয়েব বেজড ডাটা প্ল্যাটফরমের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

দ্রুত ধাবমান প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীরাও এসব নিত্যনতুন যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভ্যস্ত ও দক্ষ হয়ে উঠছে। ফলে অপরাধীদের যোগাযোগ ও বার্তা দেওয়ার বিভিন্ন মাধ্যম যেমন ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপি মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্ত করা এবং তাদের কার্যক্রম অবগত হওয়া ও তাদের সঠিক অবস্থান নিরুপণ করা চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে। এ কারণে বর্তমানে ওয়েব বেজড প্রযুক্তির ল’ফুল ইন্টারসেপশন বা ওয়াই-ফাই ইন্টারসেপশন সিস্টেম অত্যন্ত সময় উপযোগী।

পিডিএসও/হেলাল