উত্তরায় জমি দখলের উৎসব

মাইকিং করেও উচ্ছেদে নামে না রাজউক

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০৯:৪১

বদরুল আলম মজুমদার

রাজধানীর উত্তরায় বরাদ্দের বাইরে এবং মামলা জটিলতায় থাকা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কয়েক হাজার কোটি টাকা মূল্যের প্লট দখল করে নিয়েছে স্থানীয় একটি চক্র। চক্রটি বিভিন্ন সময় সরকারি দলের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে এসব দখলবাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। মাইকিং করেও অজানা কারণে উচ্ছেদে নামে না রাজউক। বিশাল অঙ্কের এ অবৈধ উপার্জনের সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে রাজউকের কয়েক কর্মকর্তার। স্থানীয় থানা পুলিশও পালন করছে সহযোগীর ভূমিকা। দখল এবং আধিপত্য নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে রয়েছে উত্তেজনাও। যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।

জানা যায়, রাজউকের উত্তরা দ্বিতীয় প্রকল্পে ২০১৪ সালের পর কোনো উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করেনি। অথচ দখল হওয়া জমির পাহারা বা দেখভালের জন্য রাজউকের মাঠপর্যায়ের লোকজন বাধা না দিয়ে উল্টো ভাড়াটিয়ার মতো দোকানপ্রতি টাকা আদায়ে ব্যস্ত। আবার বারবার ঘোষণা দিয়ে উচ্ছেদের করার হাঁকডাক দিয়ে অভিনব কায়দায় টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে নেয় রাজউকের দ্বিতীয় প্রকল্পের প্রধান নির্বাহীসহ জড়িত কর্মকর্তারা। এতে দখলবাজরা আরো উচ্চ হারে ভাড়া আদায় করে সাধারণ দোকান থেকে। রাজউকের সহযোগিতায় এহেন কর্মকাণ্ডে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না রাজউক। ফলে বেপরোয়া দখলকাজে আরো বেশি বেপরোয়া দখলবাজরা।

মডেল টাউনের সবচেয়ে ব্যস্ততম সড়ক সোনারগাঁ জনপদের দুপাশে দশ কাঠা করে প্রায় ৪০টি প্লট রয়েছে। এ প্লটগুলো বাণিজ্যিক প্লট হিসেবে শুরুর দিকে বরাদ্দ দেওয়া হলেও মূল্য অবমূল্যায়নের কারণে প্রায় সব কটি প্লটে মামলা রয়েছে। মামলার কারণে প্রকৃত মালিকরা জায়গাগুলোতে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেয়নি। এসব খালি প্লট দখলের পন্থা হিসেবে প্রথমে ক্ষমতাসীন দলের একটি সাইনবোর্ড ঝুলানো হয়। পরে ধীরে ধীরে পার্টি অফিস ও সর্বশেষ হাজার হাজার দোকানঘর তৈরি করে বড় বড় মার্কেট তৈরি করে স্থানীয় দখলবাজরা। এসব স্থাপনার অধিকাংশই স্থায়ী স্থাপনার মতো তৈরি করা।

এ বিষয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখির পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে উচ্ছেদের নোটিস করে রাজউক। সেইসঙ্গে মাইকিং করে জানানো হয় কালকের মধ্যে রাজউকের জায়গা খালি করতে, অন্যথায় সবকিছু গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। যখন মাইকিং চলছিল, তখন উত্তরা স্কয়ারের পশ্চিম পাশের তিনটি খালি প্লটে চলছিল ফ্লোর ঢালাইয়ের কাজ। বর্তমানে সেই জায়গায় এখন সুবিশাল ফার্নিচার মার্কেট। সেই মার্কেট দেখে বোঝার উপায় নেই যে, জায়গাগুলো দখল করা। তখন মাইকিং করেও উচ্ছেদ করেনি রাজউক। অদৃশ্য কারণে সেই উচ্ছেদ অভিযান আজো পরিচালনা করা হয়নি। শোনা যায়, সেই সময়ে রাজউকের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে স্থানীয় দখলবাজদের মোটা টাকা লেনদেন হয়। ঘোষণা অনুযায়ী উচ্ছেদের দিন সকালে বেশ কিছু গণমাধ্যমকর্মী সংবাদ সংগ্রহের জন্য গেলে রাজউক উত্তরা দ্বিতীয় প্রকল্পের পরিচালক বাবুল মিয়া সাংবাদিকদের পুলিশ না পাওয়ার কারণে তারা উচ্ছেদে নামতে পারছেন না। পরে থানা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে উত্তরা পশ্চিম থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়, উচ্ছেদের ব্যাপারে কিছুই জানে না তারা। তা ছাড়া রাজউকের পক্ষ থেকেও কোনো লোকজন আসেনি পুলিশি সহযোগিতা নিতে। বিষয়টি অভিহিত করে বাবুল মিয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

অন্যদিকে, দখল বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীনদের দলের মধ্যে ছোটখাটো কয়েকটি সংঘর্ষের পাশাপাশি প্রায়ই চলে অবৈধ অস্ত্রের মহড়া। স্থানীয় আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন স্থানীয় নেতা এসব দখলবাজদের সহায়তা করছেন বলে শোনা যায়। সাধারণ ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা যেকোনো সময় বড় ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। দখলের জায়গা ব্যবসা করে এমন এক ব্যক্তি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, অবৈধ প্লটে দোকান বানিয়ে দখলদাররা ব্যবসায়ীদের থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ১০ কোটি টাকা। যার একটি টাকাও ফেরত পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। উত্তরা মডেল টাউন কাঁচাবাজার নামে পরিচিত মার্কেটটি নির্মাণ করা হয়েছে সম্পূর্ণ পাকা করে। দখলবাজদের দলে রয়েছে, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ীসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাও। আর এদের সহায়তা করছেন রাজউকের কর্মকর্তারা।

জানতে চাইলে রাজউকের (এস্টেট ও ভূমি ২)-এর উপপরিচালক মো. বাবুল মিয়া প্রতিবেদককে বলেন, সোনারগাঁ জনপদ সড়কের দুপাশের প্লটগুলোর মধ্যে কিছু প্লট নিয়ে আইনগত জটিলতা রয়েছে। তবে, অবৈধভাবে যারা রাজউকের জমি দখলে নিয়েছে তাদের উচ্ছেদ করতে আমরা চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত আবেদন করেছি। খুব শিগগিরই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। উচ্ছেদের পর কাঁটাতারের মাধ্যমে নিরাপত্তা বেষ্টনীও দেওয়া হবে।

পিডিএসও/হেলাল