চক্রের ফাঁদে নিঃস্ব অনেকে

রাজধানীর আতঙ্ক ‘সালাম পার্টি’

প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৩:১৯ | আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৪:৫৮

জুবায়ের চৌধুরী
প্রতীকী ছবি

একেবারে স্যুটেড-বুটেড; বাংলায় যাকে বলে কেতাদুরস্ত! দেখলে মনে হবে কোনো করপোরেট অফিসের বড় কর্তা অথবা ব্যবসায়ী। বাচনভঙ্গি আর চালচলনেও আধুনিকতার ছোঁয়া। আচমকা এসেই আপনাকে ‘সালাম’ দেবে কিংবা চলতি পথে কারো সঙ্গে লাগাবে ধাক্কা। আর তখনই তার হাত থেকে পড়ে খানখান হয়ে যাবে মোবাইল ফোন। তখনই পাশে থাকা তার সহযোগীরা আপনার কাছ থেকে আদায় করে নেবে আগে থেকেই ভাঙা সেই মোবাইল ফোনের দাম।

রাজধানীতে এ চক্রের নাম ‘সালাম পার্টি’। সকাল থেকে সন্ধ্যা, নগরের এমন ব্যস্ততার ছবি এখন নিত্যদিনের। পাশ দিয়ে কে হেঁটে যাচ্ছেন, তা দেখার সময় নেই কারো। জীবিকার তাগিদে দম ফেলার সময় নেই প্রায় ২ কোটি মানুষের এ শহরের বাসিন্দাদের। সবার ব্যস্ততার এ সুযোগ নিয়ে অপরাধীরাও নিত্যনতুন ফন্দি এঁটে হরহামেশাই কেড়ে নিচ্ছে সর্বস্ব। তবে পুলিশ বলছে, এমন অবস্থায় আশপাশের মানুষের সহায়তা বা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে রক্ষা পেতে পারেন ভুক্তভোগীরা।

সম্প্রতি রাজধানীর চকবাজার এলাকা, রাস্তায় হেঁটে যাওয়ার সময় ভোলা জজকোর্টের আইনজীবী সুমনের ধাক্কা লাগে এক ব্যক্তির। পড়ে ভেঙে যায় তার হাতে থাকা মোবাইল ফোন। অভিযোগ করেন, সুমনের ধাক্কায় ভেঙেছে তার ফোনটি। দাবি তোলেন ক্ষতিপূরণের। সঙ্গে যোগ হন আরো দুজন। তাৎক্ষণিকভাবে ২ হাজার ৯০০ টাকা দিতে রাজি হলেও তাদের দাবি ৫ হাজার। একপর্যায়ে সুমনের মানিব্যাগ কেড়ে নিয়ে, পাশের এটিএম বুথে ঢোকে তারা। তিন দফায় তুলে নেয় ১৯ হাজার টাকা।

ভুক্তভোগী সুমন বলেন, ‘ওই ব্যক্তিরা আমার পরিচয় জানতে চায়। যখন বললাম আমি আইনজীবী। পরিচয় পেয়ে সঙ্গে সঙ্গেই মোবাইল আর মানিব্যাগটা ফেরত দেয়। এরপর আমাকে শাসিয়ে বলে, কোনো বাড়াবাড়ি করবেন না। তাহলে রড দিয়ে পিটিয়ে মাথা ফাটিয়ে ফেলব। এই কথা বলে চলে যায়।’

আরেকটি ঘটনা গত ১৪ জানুয়ারির। বকশীবাজারের নবকুমার ইনস্টিটিউটের সামনে ‘সালাম’ পার্টির কবলে পড়েন বিসিএস তথ্য ক্যাডারের এক কর্মকর্তা শামীম। ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকা তুলে নিউমার্কেটে রিকশায় করে গুলিস্তানের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি। আনন্দবাজার এলাকায় পৌঁছালে এক লোক তাকে ‘সালাম’ দেয়। তখনই আরো দুটি রিকশায় করে আরো তিনজন এসে সেখানে নামে। শামীমকে অপ্রস্তুত করে দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে তারা তার পকেট থেকে টাকাগুলো নিয়ে চলে যায়। তিনি বলেন, ‘আশপাশে অনেক পথচারী ছিল। কিন্তু আমার যে টাকা-পয়সা নিয়ে চলে যাচ্ছে পথচারীরা, তা বুঝতে পারেনি। তাদের কাছে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র বা ছুরি ছিল না। এত দ্রুত পকেটে হাত দিয়ে টাকা নিয়ে চলে গেল যে, চিৎকার করারও সুযোগ পাইনি।’

রাজধানীতে এমন ঘটনা নতুন নয়। অপেক্ষাকৃত নতুন স্টাইলের এই ছিনতাইকারী চক্রের কবলে পড়ে অর্থ-সম্পদ খোয়াচ্ছে নগরবাসী। পুলিশ বলছে, ‘সালাম পার্টি’ নামে পরিচিত চক্রটি ছিনতাইয়ে চাকু বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার না করেও হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। পালিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো দ্রুতগামী যানও ব্যবহার করছে না। এরা টাকাসহ কাউকে অনুসরণ করে রিকশায় করে এসে সালাম দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে তার পকেটে থাকা টাকা ও মোবাইল ফোন হাতিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে। ঘটনার আকস্মিতায় শিকার ব্যক্তি যেমন হতভম্ব হয়ে যান, পথচারীদেরও ঘটনাটি বুঝতে সময় লাগে। এরমধ্যেই অপরাধীরা ‘পগার পাড়’ হয়ে যান।

শাহবাগ ছাড়াও বংশাল, চকবাজার, পল্টন ও ওয়ারী এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে। এমন ঘটনার কবল থেকে কেউ রক্ষা পায়নি; সবস্তরের মানুষ এ চক্রের কবলে পড়েছে। বছর দুয়েক আগের এই চক্রটির শুরুর দিকের তৎপরতার মধ্যে ঘটনা রোধে ওইসব এলাকায় পুলিশের টহল শুরু করা হয়। কিন্তু তাতে থেমে নেই এই অপরাধ। পুলিশ পুরো চক্রটিকে ধরতে ‘হন্যে হয়ে খুঁজলেও’ এবং ‘টহল সংখ্যা বাড়ালেও’ এখনো সফল হয়নি।

এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান জানান, সম্প্রতি দোয়েল চত্বর থেকে এই চক্রের এক সদস্যকে ধরা হয়েছে। কিন্তু তারপরও চক্রটির অপতৎপরতা বন্ধ হয়নি। চক্রটি নিউমার্কেট, পলাশী, বুয়েট, ঢাকা মেডিকেল চানখাঁরপুল হয়ে আনন্দবাজার সড়কটি ব্যবহার করছে। চক্রটিকে ধরতে প্রতিদিন পুলিশ সদস্যরা মোটরসাইকেল ও সাদা পোশাকে ‘ডিউটি’ দিচ্ছে। চক্রটি ছিনতাইয়ের জায়গা হিসেবে নীরব ও যানজটবিহীন সড়ক বেছে নেয়।

২০১৮ সালের ২৮ মার্চ পল্টন থানা পাঁচজনকে গ্রেফতারের পর ‘সালাম পার্টি’ নামে অভিনব এই চক্রটি আলোচনায় আসে। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পুলিশ জানিয়েছিল, চক্রটির সদস্যরা উন্নত মানের শার্ট, প্যান্ট, জুতা এমনকি শীতকালে কোট ও টাই পরে ঘুরে বেড়ায় টার্গেটের সন্ধানে। বিশেষ কায়দায় তারা চাকু ও চাপাতিসহ ধারালো অস্ত্র নিজেদের প্যান্ট বা কোটের পকেটে লুকিয়ে রাখে; যা বাইরে থেকে দেখলে বোঝার কোনো উপায় নেই।

চক্রটি ভদ্রলোকের বেশ ধরে দু-তিন ঘণ্টার জন্য রিকশা ভাড়া করে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করে। বিশেষ করে ব্যাংক অথবা এটিএম বুথের পাশে অবস্থান নিয়ে থাকে। লক্ষ রাখে কে টাকা নিয়ে বের হচ্ছে। পরে ওই লোকের পিছু নেয় সালাম পার্টির সদস্যরা। মোবাইলে তাদের অপর সদস্যদেরও অবস্থান জানিয়ে দেয়। পিছু নেওয়ার একপর্যায়ে সুবিধামতো জায়গায় রিকশা নিয়ে ঘোরাঘুরিকারীদের একজন সেই ব্যক্তির সামনে এসে সালাম দিয়ে বলে, ‘ভাই কেমন আছেন? আপনি অমুক না?’ এরই মধ্যে চক্রটির ছদ্মবেশী আরো কয়েকজন রিকশাটিকে ঘিরে ফেলে। নিজেরা নিজেদের গায়ে ধাক্কা দিয়ে তা না হলে অন্য কোনোভাবে আগে থেকে লক্ষ রাখা ব্যক্তির আশপাশে একটা জটলা তৈরি করে। এই সুযোগে অন্য সহযোগীরা পকেটে হাত ঢুকিয়ে যা পায়, তা নিয়ে সটকে পড়ে।

পিডিএসও/হেলাল