মাদকবাণিজ্যে কালোটাকার প্রভাব!

হঠাৎ অঢেল সম্পদে ফুলে ফেঁপে উখিয়া

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২০, ১৫:১৫

কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া

হঠাৎ অঢেল অর্থসম্পদ ও প্রাচুর্যে ফুলে ফেঁপে উঠেছে কক্সবাজারের মিয়ানমার সীমান্তবর্তী জনপদ উখিয়া। কয়েক দিন আগেও যারা ছিলেন নিঃস্ব কপর্দকহীন, তারা এখন রাতারাতি গাড়ি-বাড়ির মালিক বনে গেছেন। গড়ে উঠেছে সুরম্য ভবন, বিলাসবহুল পণ্যের দোকান আর ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর শোরুম। দেদার চলছে বেচাকেনা। হঠাৎ সম্পদশালী হওয়ার পেছনে মাদক বাণিজ্যে কালো টাকার গন্ধ রয়েছে বলে মনে করছেন সুশীল সমাজ। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে অনেক মাদক চোরাচালান ধরা পড়লেও গডফাদার ও ইয়াবা ব্যবসায়ীরা পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ সুশীল সমাজের। তবে গত রোববার উখিয়া উপজেলা পরিষদ হলরুমে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। সভায় উপস্থিত সব সদস্য সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে গাড়ি-বাড়ি ও অঢেল সম্পদের মালিকদের বিরুদ্ধে তদন্ত করার জন্য কর কমিশন এবং দুদককে লিখিতভাবে চিঠি দেওয়া হবে। সেখানে হঠাৎ অঢেল সম্পদ অর্জনকারীদের বিরুদ্ধে তদন্তে সহযোগিতার সিদ্ধান্ত হয়। একে নাগরিক সমাজ সাধুবাদ জানিয়েছেন। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, পালংখালী বালুখালী থাইংখালী কুতুপালং উখিয়া সদর স্টেশন, হাজিরপাড়া, হিজলিয়া, কোটবাজার, মরিচ্যা, সোনার পাড়া, ডেইল পাড়া, ইনানী, মনখালি, হলদিয়া পালং, পাতাবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে রাতারাতি নতুন নতুন বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে, আরো পাকা ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে। এছাড়াও কোটবাজার, উখিয়া, মরিচ্যা, কুতুপালং, থাইংখালী, পালংখালী, বালুখালীতে অসংখ্য ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর শোরুম খোলা হয়েছে। অনেকে জানিয়েছেন এসব শোরুমের মালিকদের আগে অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই অসচ্ছল ছিল। হঠাৎ তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য দেখে মনে হয় যেন আলাউদ্দিনের চেরাগ হাতে পেয়েছে। এমন কি একজন ব্যক্তি অনেক শোরুমের মালিক। তারা আবার সেখানে বসে না। মূলত এ ব্যবসার আড়ালে তারা ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

দেখা যায়, কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের দুই ধারে কোটি কোটি টাকার মূল্যের জমি ক্রয় করে অনেকে তৈরি করেছে বাউন্ডারি ওয়াল। এসব মালিকদের রয়েছে নোহা, মাইক্রোবাস, ট্রাক মিনি ট্রাক, প্রাইভেট কার ও হায়েস গাড়ি। বিশেষ করে কোটবাজারে একাধিক ইলেকট্রনিক্স শোরুমের রাতারাতি মালিক হওয়ার স্থানীয়রা অবাক। কীভাবে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করল তা সবার কাছে অজানা। স্থানীয়দের মতে প্রশাসন খতিয়ে দেখলে আসল রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে।

স্থানীয়দের অভিমত ইয়াবা পাচার অথবা চোরাকারবারি ব্যবসার মাধ্যমে আয়কৃত কালো অর্থ দিয়ে এসব সম্পদ ক্রয় করেছে। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে ও আমলাদের আশীর্বাদ নিয়ে তারা বহাল তবিয়তে রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উখিয়া, কোটবাজার ও মরিচ্যাবাজার ব্যাংকগুলোতে এমন ব্যক্তিদের একাউন্টে অস্বাভাবিক টাকার লেনদেন হচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে তিন শতাধিক ব্যক্তি হঠাৎ অঢেল সম্পদের মালিক ও কালো টাকার পাহাড় গড়েছে। তারা প্রতিটি স্টেশনে একের অধিক ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী শোরুমসহ জুতা, সেন্ডেল এবং কাপড়ের দোকান খুলে বসেছে। জানা গেছে, ৩০/৪০ লাখ টাকা অগ্রিম সালামি দিয়ে এসব দোকানের কক্ষ বা পজিশন ভাড়া নিয়েছেন।

স্থানীয় নাগরিক সমাজের অভিযোগ, সীমান্তবর্তী টেকনাফের পরই ইয়াবার কারবারের কেন্দ্র উখিয়া। দেশের বিভিন্ন স্থানে ইয়াবা পাচার করে কোটিপতির তালিকায় নাম লিখিয়েছে অসংখ্য চোরাকারবারিরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান কিংবা ধরপাকড়েও কাজ হচ্ছে না। অনেকেই র‌্যাবের ইয়াবাবিরোধী অভিযানে সন্তুষ্ট হলেও অন্যান্য সংস্থার ভূমিকা নিয়ে চরম নাখোশ।

সুশীল সমাজের দাবি বাংলাদেশ কর বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশন হঠাৎ অঢেল সম্পদের মালিক হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সঠিক তদন্ত এবং অনুসন্ধান করলে কালো টাকার উৎস বা থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।

এ প্রসঙ্গে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নিকারুজ্জামান চৌধুরী জানান, হঠাৎ করে বিপুল অর্থের মালিক ও অঢেল সম্পদ অর্জনকারীর আয়ের উৎস অনুসন্ধান খতিয়ে দেখা উচিত। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এসব নব্য অর্থ বিত্তশালীদের বিষয়ে তদন্ত করার জন্য আমরাও একমত হয়েছি। খুব শিরগিরই আমরা তদন্ত বা অনুসন্ধান চালানোর জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে চিঠি দেওয়া হবে।

এদিকে উপজেলা প্রশাসনের এমন ইতিবাচক সিদ্ধান্ত শুনে উখিয়ার নাগরিক সমাজ সাধুবাদ জানালেও তারা দৃশ্যমান বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করেছেন।

পিডিএসও/রি.মা