কাউন্সিলর মঞ্জুর উত্থান যেভাবে

বাসের টিকিট মাস্টার থেকে দখলদারি-চাঁদাবাজিতে ‘রাজত্ব’

প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০১৯, ১১:২০

নিজস্ব প্রতিবেদক

আশির দশকে জীবন ও জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আসেন ময়নুল হক মঞ্জু। ঠাঁই নেন গোপীবাগের এক আত্মীয়ের বাসায়। এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে বাসের টিকিট মাস্টারের কাজ পান। একপর্যায়ে তিনি সায়েদাবাদ টার্মিনালে চাঁদাবাজি শুরু করেন। এ সময় স্থানীয় বিএনপি দলীয় এক এমপির সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে উঠে। কিন্তু রাজনীতির হাওয়া বদল হলে ভোল পাল্টিয়ে তিনি ওয়ার্ড কাউন্সিলরের পদ বাগিয়ে নেন। সম্পর্ক গড়েন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে।

ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। কাউন্সিলর ও সরকারদলীয় নেতা পরিচয়ে প্রভাব খাটিয়ে শুরু করেন দখলদারি ও চাঁদাবাজি। গড়ে তোলেন নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। রাজধানীর টিকাটুলি এলাকার রাজধানী সুপারমার্কেট ও নিউ রাজধানী সুপারমার্কেটের ‘স্বঘোষিত’ সভাপতি ছিলেন কাউন্সিলর মনজু।

মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের আওতাধীন এই দুই মার্কেটের ১ হাজার ৭৮৮টি দোকান থেকে প্রতি মাসে চাঁদা আদায় করতেন দোকানপ্রতি ৯৫০ টাকা। এর বাইরে ঈদে বা পূজায় দিতে হতো বাড়তি চাঁদা। জেনারেটর, বেয়ারসহ অন্যান্য খরচের নামেও দিতে হতো চাঁদা।

তার বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ ও র‌্যাব সদর দফতরসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ, এমনকি মামলা করলেও পাননি প্রতিকার। টানা আট বছর মনজু আর তার ক্যাডার বাহিনীর কাছে জিম্মি ছিলেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। অবৈধ টাকায় আঙুল ফুলে হয়েছেন বটগাছ। দুই মার্কেট থেকে প্রতি মাসে প্রায় কোটি টাকার চাঁদা তুলে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠাতেন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা পরিবারের কাছে। মাদক সেবন ও কারবারে জড়িত মনজু মাতাল অবস্থায় ব্যবসায়ীদের হুমকি দিতেন। তার কথার অবাধ্য হলে ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ধরে এনে টর্চার সেলে চালাতেন নির্যাতন।

চলমান ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর র‌্যাব-৩ এবং র‌্যাবের সদর দফতরে ওই এলাকার একাধিক ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ করেন। অভিযান শুরু হওয়ার পর তিনি কিছুদিন আত্মগোপনে যান। র‌্যাবের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা তার বিরুদ্ধে তদন্ত অব্যাহত রাখেন। গত ৩০ অক্টোবর রাজধানী সুপার মার্কেটের এক ব্যবসায়ী মঞ্জুর বিরুদ্ধে ওয়ারী থানায় একটি মামলা করেন।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার সকালে র‌্যাবের একটি দল টিকাটুলি এলাকা থেকে মঞ্জুর অফিসে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে যে ২১ জন ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে শোকজ নোটিস দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে মঞ্জুও ছিলেন। ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মঞ্জু ওয়ারি থানা আওয়ামী লীগের সদস্য। এছাড়াও তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের কমিটিতেও সদস্য ছিলেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে তাকে আওয়ামী লীগের ওই কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়।

জানা গেছে, টিকাটুলী এলাকায় অবৈধ দখলদারি, ফুটপাত থেকে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসায় ইন্ধন, মতিঝিলের ক্যাসিনো কিংদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী লালন করাসহ তার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা তার পকেটে থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তিনি দিন দিন বেপরোয়া হয়েছেন। শুদ্ধি অভিযান শুরু হলে তার নাম আবারও ওই এলাকার লোকজনের মুখে মুখে আসে। একাধিক ব্যক্তি তার নামে র‌্যাবের সদর দফতরে অভিযোগনামা নিয়ে হাজির হন।

সূত্র জানায়, টিকাটুলীতে ২০১৮ সালের এপ্রিলে আশরাফুল নামে এক ব্যক্তি একটি পেট্রল পাম্প স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। ওই সময় মঞ্জু তার কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা না দেওয়ার কারণে পেট্রল পাম্প স্থাপন করতে পারেননি ওই ব্যবসায়ী। ওই ঘটনায় আশরাফুল ওয়ারি থানায় একটি জিডি করেন।

এছাড়া ওয়ারির টিকাটুলি এলাকায় মঞ্জুর নামে অন্তত তিনটি ফ্ল্যাট দখলের অভিযোগ রয়েছে। ডেমরার ও কদমতলীল দনিয়া এলাকায় চারটি প্লট দখলের অভিযোগ আছে। ওই প্লটে বালু ফেলে তার নামে সাইনবোর্ড টাঙ্গানোর অভিযোগ আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে।

পিডিএসও/তাজ