জড়িতদের খোঁজে দুদক

ভুয়া নাম ঠিকানা, ঘুষ দিয়ে যাচাই-বাছাই, তিন বছরে শতাধিক রোহিঙ্গা আটক

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:২২

তাজুল ইসলাম পলাশ, চট্টগ্রাম ব্যুরো
পাসপোর্টের আবেদনে রোহিঙ্গারা ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে

গড়ে কেবল এক লাখ টাকা খরচ করলেই বাংলাদেশি পাসপোর্ট মিলছে রোহিঙ্গাদের। পাসপোর্ট তৈরিতে সহায়তা করছে স্থানীয় কিছু মানুষ এবং রোহিঙ্গা দালালদের সিন্ডিকেট। সফটওয়্যারের সঙ্গে ইন্টারভিউ মিলিয়ে রোহিঙ্গাদের সনাক্ত করার কাজ করছে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর। এই সিন্ডিকেটটি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), নাগরিকত্ব সনদ, জন্মসনদ এবং পরিচিত মাধ্যম ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে ঘুষ দিয়ে পুলিশি যাচাই-বাছাইকরণের কাজও সম্পন্ন করিয়ে নেয়।

পুলিশ ও পাসপোর্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এরা অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ করে। পাসপোর্টের জন্য করা আবেদনে রোহিঙ্গারা ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে। সর্বশেষ ৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে নগরীর আকবর শাহ থানা এলাকা থেকে ভুয়া পাসপোর্টসহ তিন রোহিঙ্গা যুবককে আটক করেছে পুলিশ। 

এদিকে জালিয়াতির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্ট পাওয়ার বিষয় নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চট্টগ্রামে আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয় এবং পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসে গিয়ে এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে দুদকের টিম। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট করে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত জালিয়াত চক্রের বিষয়ে শিগগিরই বিস্তারিত অনুসন্ধান শুরু হবে বলে জানিয়েছেন দুদক কর্মকর্তারা।

রোববার দুপুরে দুদকের চট্টগ্রাম জেলা সমন্বিত কার্যালয় ১-এর একটি এনফোর্সমেন্ট টিম নগরীর লাভ লেইনে আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ে যায়। টিমের সদস্যরা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মুনীর হোসাইন খানের সঙ্গে কথা বলে রোহিঙ্গা জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া সংক্রান্ত বেশকিছু তথ্য সংগ্রহ করেন। এসব তথ্যের মধ্যে আছে—জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য জন্ম নিবন্ধন সনদসহ আরও কি কি দলিল জমা দিতে হয়, সার্ভারে জাতীয় পরিচয়পত্র আপলোড দেওয়ার পদ্ধতি, এ পর্যন্ত কতজন জাতীয় পরিচয়পত্রপ্রাপ্ত রোহিঙ্গা শনাক্ত হয়েছে ইত্যাদি।

দুদক এনফোর্সমেন্ট টিমের সদস্য সহকারী পরিচালক রতন কুমার দাশ জানান, নির্বাচন কর্মকর্তারা তথ্য দিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ৪৬ জন রোহিঙ্গাকে শনাক্ত করেছেন যারা তথ্য গোপন করে জালিয়াতির মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়েছেন এবং কেন্দ্রীয় সার্ভারে তাদের তথ্য সংরক্ষিত আছে। এই ৪৬ জনের মধ্যে একজন রোহিঙ্গা ডাকাতও আছে, যে কয়েকদিন আগে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। ওনারা বলছেন, এসব রোহিঙ্গাদের তথ্য ঢাকা থেকে সার্ভারে সংযুক্ত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে কিছুই আপলোড হয়নি।

দুদকের চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপসহকারী পরিচালক শরিফ উদ্দিন জানান, জেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে ভোটার তালিকার কাজে ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি ল্যাপটপের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না ২০১৫ সালের পর থেকে। এ বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। এসব ল্যাপটপের তথ্য নির্বাচন অফিস কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানেন না। রোহিঙ্গারা ভোটার হয়ে ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে পাসপোর্ট করতে যাচ্ছে। এমন ৫৪ জনের তথ্য চট্টগ্রামের মনসুরাবাদ পাসপোর্ট অফিস থেকে দুদককে দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্টের এক কর্মকর্তা নাম না জানার শর্তে বলেন, রোহিঙ্গাদের এনআইডি কার্ড, জন্মসনদ ও নাগরিকত্ব সনদ দেওয়ার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাই দায়ী। তারা টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের জাতীয় সনদ দিচ্ছে।

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মুনীর হোসাইন খান জানান, রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার বিষয়ে দুদক অনুসন্ধান করছে। সেজন্য তারা তথ্য নিতে এসেছিলেন। আমরা সব তথ্য দিয়েছি। আমাদের তদন্ত কমিটিও যে কাজ করছে, সেটা উনারা জেনেছেন। তবে কোনো নথিপত্র উনারা নিয়ে যাননি। এটা নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান করা হবে বলে ওনারা জানিয়েছেন।

পিডিএসও/হেলাল