প্রতিদিনই জব্দ তবু বন্ধ হচ্ছে না ইয়াবা পাচার

প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০১৯, ০৯:৫১ | আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০১৯, ১০:৫০

চট্টগ্রাম ব্যুরো

একসময় ইয়াবা চালান আটক এবং ইয়াবা কারবারির গ্রেফতারের খবর গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হতো। এখন এমন ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ধরা পড়ছে ইয়াবার চালান। সীমান্তবর্তী মিয়ানমার থেকে মূলত ইয়াবা আসছে, এটাই ইয়াবা চোরাচালানের প্রধান রুট। সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা অসাধু নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে আঁতাতের মাধ্যমে দেশে ঢুকছে ইয়াবা। প্রশাসনের সাঁড়াশি অভিযানেও দমন করা যাচ্ছে না। পাল্টে গেছে ইয়াবা পাচারের কৌশল। চট্টগ্রামে শুধু চলতি আগস্ট মাসে বেশ কয়টি ইয়াবার চালান জব্দ হয়। গ্রেফতারও হয়েছে বেশ কয়েকজন। এরপরও যেন বন্ধ নেই ইয়াবা পাচার।

গত মঙ্গলবার হালিশহরে জেলা পুলিশ লাইনসে এক সভায় চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) খন্দকার গোলাম ফারুক বলেছিলেন, ইয়াবা একটি সর্বানাশা মাদক। পুলিশের বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে কক্সবাজারের মাধ্যমে ইয়াবা এখন তেমন একটা আসছে না। এ জন্য সীমান্তবর্তী জেলার পুলিশ সুপারদের (এসপি) সতর্ক থাকার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলার ১১ এসপি। ওই সভায় তিনি আরো বলেন, এখন আমাদের কাছে তথ্য আছে—ইয়াবা এখন কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন বর্ডার এলাকা দিয়ে ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমরা যেভাবে জয়লাভ করেছি, মাদকের বিরুদ্ধেও আমরা জয়লাভ করতে পারব। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, বর্ডার বন্ধ না হলে ইয়াবা পাচার কখনো বন্ধ হবে না। এই পাচারের সঙ্গে কিছু পুলিশ কর্মকর্তার ইন্ধনের অভিযোগ নাকচ করে দেন তিনি। পুলিশে সাঁড়াশি অভিযান চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।

র‌্যাব ৭-এর সহকারী পুলিশ সুপার মো. মাশকুর রহমান বলেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে আমাদের বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট রয়েছে। আমাদের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা এ ব্যাপারে সজাগ রয়েছি। আমাদের টিমের সদস্যরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। এদিকে গত বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) ফটিকছড়ির নাজিরহাট, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কে ও মাইজভান্ডার এলাকায় পৃথক অভিযানে ১৪৭ পিস ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এর আগে বুধবার (২১ আগস্ট) নগরীর কোতোয়ালি থানাধীন মেরিনার্স রোডের ব্রিজঘাট এলাকায় ৫০ হাজার ইয়াবাসহ তিনজনকে আটক করে র‌্যাব। এর আগে ১৮ আগস্ট রোববার নগরীর বিআরটিসি মোড়ে কদমতলী ফ্লাইওভারের ওপর একটি সিএনজি অটোরিকশায় তল্লাশি চালিয়ে ৯৮৪ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে শনিবার (১৭ আগস্ট) বাকলিয়া থানার রাজবাড়ি কনভেনশন সেন্টারের সামনে থেকে ২৬ হাজার ২০০ পিস ইয়াবাসহ এক মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে র‌্যাব। এক দিনের ব্যবধানে গত শুক্রবার (১৬ আগস্ট) বিকেলে আনোয়ারা উপজেলার চাতুরী চৌমুহনী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৯ হাজার ৪০০ পিস ইয়াবাসহ দুজনকে আটক করে র‌্যাব। এর আগে শুক্রবার (৯ আগস্ট) ভোরে নগরীর কোতোয়ালি থানার মেরিনার্স রোডের ফিশারি ঘাট এলাকায় ৩১ হাজার ৫০০ পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে র‌্যাব। দেখা গেছে, গড়ে প্রতি মাসে পাঁচটি ইয়াবা চালান আটক হচ্ছে।

গত বছরের ৫ অক্টোবর চট্টগ্রামের পতেঙ্গা গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পাঁচ লাখ ইয়াবাসহ সাতজনকে আটক করে র‌্যাব। এর আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ফেনীর লালপুর এলাকায় একটি প্রাইভেট কারে বিশেষ কায়দায় লুকানো সাত লাখ ইয়াবাসহ দুজনকে আটক করা হয়। গত বছরের (১৬ নভেম্বর) কর্ণফুলী এলাকার মইজ্যারটেক থেকে দেশ ট্রাভেল’স পরিবহনে তল্লাশি করে ২৫ হাজার ইয়াবাসহ দুজনকে আটক করা হয়। এর মধ্য একজন মহিলাও রয়েছে। গত বছরের ১৯ নভেম্বর নগরীর বাকলিয়া থানার শাহ আমানত সেতুসংলগ্ন চাক্তাই মেরিনার্স রোডের মুখে মাছবোঝাই একটি কাভার্ডভ্যানে ১ লাখ ২০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ।

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র বলছে, অভিযানে এসব ইয়াবার চালান ধরা পড়লেও এর চেয়ে বড় চালান চলে যাচ্ছে ঢাকা হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এর সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তার। অপরাধীদের আগে থেকেই সতর্ক করে তারা।

সূত্রটি আরো জানায়, যারা ধরা পড়ে, কয়েক মাসের মধ্য তারা বেরিয়ে আবার একই কারবারে জড়িয়ে পড়ে। অনুসন্ধান বলছে, প্রভাবশালী লোক ও প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তিরও হাত থাকায় আসল অপরাধীরা থাকছে অধরা।

অনুসন্ধান আরো বলছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের তিনটি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। এর মধ্যে মইজ্যারটেক ও এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন সেতু এলাকায় আরো দুটি চেকপোস্ট রয়েছে। প্রতিদিন ওই মহাসড়ক দিয়ে হাজার হাজার গাড়ি চলাচল করে। দেশের নামকরা মার্সিডিস গাড়ি গ্রিস লাইন, সোহাগ পরিবহন, বাগদাদ এক্সপ্রেস, দেশ ট্রাভেল, এস আলম সৌদিয়া (যৌথভাবে) হানিফ, তুবা এক্সপ্রেসসহ গাড়িগুলো তেমন চেক করা হয় না। সচরাচর চট্টগ্রাম কিংবা কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা লোকাল বাস ও নন-এসি গাড়িগুলো তল্লাশি করা হয়। কিন্তু ইয়াবা পাচারকারীরাও আগের চেয়ে অনেক সতর্ক হয়েছে। তারা সরাসরি গন্তব্যে না গিয়ে কয়েকবার গাড়ি পরিবর্তন করে। ফলে প্রশাসনের এ তল্লাশিকে ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিএমপির সিনিয়র পর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, ইয়াবা বহনকারীদের দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই। শরীরে তল্লাশি করেও খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তাদের অভিনব কৌশল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর কল্পনাকেও হার মানায়। আবার সন্দেহ এড়াতে সাংবাদিক অথবা পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ইয়াবা পাচারে আনছে নতুন কৌশল। বেছে নিচ্ছে নতুন নতুন রুট। পুলিশেরও ধারণা, অনেক ইয়াবা পাচারের চালান পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে, যা রীতিমতো পুলিশকে ভাবিয়ে তুলেছে।

পিডিএসও/হেলাল