পুলিশে অপরাধ কমাতে কঠোর পদক্ষেপ

প্রকাশ | ১২ জুলাই ২০১৯, ০৯:১০ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০১৯, ০৯:১৯

জুবায়ের চৌধুরী

অপরাধ দমনের দায়িত্ব যাদের ঘাড়ে, সেই পুলিশই জড়িয়ে পড়ছে নানবিধ অপরাধ ও অনিয়মে। শুধু ঘুষ আর চাঁদাবাজিতেই থেমে নেই পুলিশ। মাদক কেনাবেচা, জমি দখল, ধর্ষণ ও খুনের মতো ফৌজদারি অপরাধেও জড়াচ্ছেন তারা। পুলিশের এমন অপরাধ প্রবণতায় জনমনে মূর্তিমান আতঙ্কে রূপ নিচ্ছে সুশৃঙ্খল এ বাহিনী। কিছু অসাধু সদস্যের কারণে গোটা পুলিশ বাহিনীতে কলঙ্কের তিলক পড়ছে। প্রতিদিনই পুলিশ সদর দফতরে সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমছে। তবে পুলিশের অপরাধ কমাতে কঠোর অবস্থানে সরকার। আর তাই এ বিষয়ে আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীও শুদ্ধি অভিযান চালাচ্ছেন।

সম্প্রতি সারা দেশে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগে ঘুষ লেনদেন ঠেকাতে ‘নজিরবিহীন’ সতর্কতা জারি করে পুলিশ সদর দফতর। এই সতর্কতার ফলও পায় বাহিনীটি। দেশের বিভিন্ন জেলায় মাত্র ১০০ টাকা খরচে চাকরি পান অসংখ্য বেকার যুবক, যা তাদের পরিবারের বক্তব্যে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় প্রশংসায় ভাসছে পুলিশ বাহিনী। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, বিভাগীয় তদন্তের আড়ালে অনেক সময়ই অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। আর প্রত্যাহার বা সাময়িক বরখাস্তের নামে যে শাস্তি দেওয়া হয়, তা মূলত কোনো শাস্তির পর্যায়েই পড়ে না। কোনো বড় ঘটনা ঘটলে এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই বদলি, প্রত্যাহার, ক্লোজ এবং সাময়িক বরখাস্তের শাস্তি দেওয়া হয়। এসব শাস্তিতে সাময়িকভাবে কাজের ‘বিঘ্ন ঘটা’ ছাড়া কোনো প্রভাবই পড়ে না পুলিশ সদস্যদের মধ্যে। ফলে প্রচলিত এই শাস্তি পুলিশের অপরাধ কমাতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি মিজানুর রহমান ও অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মোজ্জাম্মেল হকের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার ঘটনা সামনে আসে। অনেক নাটকীয়তার পর নারী কেলেঙ্কারি, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও দুদক কর্মকর্তাকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন ডিআইজি মিজান। কিন্তু এক বৃদ্ধের কাছ থেকে জোর করে তার বাড়ি-গাড়ি লিখে নেওয়ার অভিযোগ উঠা অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মোজ্জাম্মেল হক এখনো বহাল

তবিয়তে। এ ঘটনায় এখনো তার বিরুদ্ধে দৃশ্যত কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না পুলিশ সদর দফতর। তবে গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, এডিআইজি গাজী মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকেও ডিআইজি মিজানের পরিণতি বরণ করতে হবে। অপরাধ করে কেউ পার পাবেন না।

এদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুলিশ সদস্যদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা যে হারে বেড়েছে, সে হারে সাজা শাস্তির পরিমাণও বেড়েছে। আবার ‘ব্যক্তির অপরাধের দায় বাহিনী নেবে না’-পুলিশ সদর দফতরের এমন নীতিতে অপরাধী সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজিরও রয়েছে অনেক। তবে অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, পুলিশে বড় ধরনের অপরাধ করে সাজা মিলছে কম। পুলিশের বিরুদ্ধে সাজা অনেকটা ‘লোক দেখানো’ গোছের। অনেক বড় অপরাধকেও ছোট করে দেখা হচ্ছে। এতে অপরাধে আরো ‘উৎসাহী’ করে তুলছে সাজাপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যকে। সেই হিসেবে অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছে নিমিষেই। আবার পুলিশের বিরুদ্ধে যত লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে, তার বেশির ভাগই প্রমাণ দেখাতে পারেন না অভিযোগকারীরা। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ঘটনা সত্য হলেও পার পেয়ে যান অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য।

এ বছর পুলিশ কনস্টেবল পদে নিয়োগ বাণিজ্য বন্ধে কঠোর অবস্থানে থাকার ঘোষণা দিয়েছিল পুলিশ সদর দফতর। সে অনুযায়ী ঘুষ লেনদেন বন্ধে ৬৪ জেলায় পাঁচ স্তরের নজরদারি হয়। এত কিছুর পরও পুলিশের কিছু অসাধু সদস্য আর্থিক লেনদেনের চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের শেষ রক্ষা হয়নি। পুলিশ সদর দফতর ও জেলা পুলিশের জালে ধরা পড়ে শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছে শতাধিক পুলিশ সদস্য ও সিভিল স্টাফ। তাদের বিরুদ্ধে স্ট্যান্ডরিলিজ, সাময়িক বরখাস্ত ও গ্রেফতারের মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া ঘুষ লেনদেনের চেষ্টাসহ নানা অভিযোগে সারা দেশে ১৮টি মামলায় ৪০ প্রতারককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পুলিশ সদর দফতর সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে। কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে এবারই প্রথমবারের মতো এত সংখ্যক পুলিশ সদস্য ও পুলিশের বিভিন্ন কার্যালয়ে কর্মরত সিভিল স্টাফদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো। এর আগে কখনো এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি।

ঘুষ বন্ধের এ প্রক্রিয়াকে ‘নজিরবিহীন’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন অনেকে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী কঠোর হুশিয়ারি দেন। নিয়োগ শুরুর আগে থেকেই আইজিপির নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিট পিআইও (পুলিশ ইন্টারনাল ওভারসাইট), রেঞ্জ ডিআইজির নজরদারি কমিটি, পুলিশ সদর দফতরের একজন পুলিশ সুপার ও একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সমন্বয়ে গঠিত ৬৪টি বিশেষ টিম, মিডিয়া শাখার মনিটরিং এবং সংশ্লিষ্ট জেলায় গঠন করা কমিটি নিয়োগ বাণিজ্য রোধে তৎপর ছিল। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে সক্ষম হয় পুলিশ সদর দফতর, যা শেষ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

পুলিশ সদর দফতর জানিয়েছে, এবারই প্রথম কোনো ধরনের তদবির ছাড়াই শুধু মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বেশির ভাগ জেলায় নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। ঘুষ ছাড়া চাকরি পাওয়ায় অনেক জেলার প্রার্থীদের চোখে আনন্দের অশ্রু দেখা গেছে। গত ২১ জুন টাঙ্গাইলে কনস্টেবল পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগে পুলিশের এসআই মোহাম্মদ আলী এবং কথিত সাংবাদিকের স্ত্রী শাহানাতুল আরেফিন সুমিকে গ্রেফতার করে জেলা পুলিশ। তাদের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে কনস্টেবল নিয়োগে অনিয়মবিরোধী কঠোর বার্তা প্রথম দৃশ্যমান হয়। এর পর নিয়োগে তদবির করতে গিয়ে ঝিনাইদহ পুলিশের কনস্টেবল আবদুল হাকিম সাময়িক বরখাস্ত হন।

গত ২৪ জুন মাদারীপুরের এসপি সুব্রত কুমার হালদারের দেহরক্ষী কনস্টেবল নুরুজ্জামান সুমনকে ঘুষ গ্রহণের নগদ টাকাসহ আটক করা হয়। এছাড়া পুলিশ লাইনের মেস ম্যানেজার জাহিদ হোসেন, টিএসআই গোলাম রহমান ও পুলিশ হাসপাতালের স্বাস্থ্য সহকারী পিয়াস বালার কাছ থেকেও ঘুষের ৭২ লাখ টাকা জব্দ করা হয়। এসব ঘটনায় মাদারীপুরের এসপির সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ সদর দফতর। তাই এসপির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, গত ২২ জুন থেকে শুরু হওয়া ৯ হাজার ৬৮০ জন ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) নিয়োগ শেষ হয় ৯ জুলাই। এর মধ্যে ৬ হাজার ৮০০ জন পুরুষ ও ২ হাজার ৮৮০ জন নারী পিআরসি নিয়োগের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।

পিডিএসও/হেলাল