আড়ালে চলে মাদক ব্যবসা

প্রকাশ : ১৬ জুন ২০১৯, ২০:৪৯

চট্টগ্রাম ব্যুরো

ইয়াবাসহ নিষিদ্ধ মাদক ব্যবসা কতোটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তা অনুমান করা যায় কারারক্ষী ও পুলিশের পাহারায় কারাগারে বসে খোদ হাজতির মাদক ব্যবসার খবর থেকে। শনিবার সন্ধ্যায় নগরীর কদমতলী ফ্লাইওভারের উপরে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তল্লাশি চালিয়ে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের কারারক্ষী সাইফুল ইসলামকে আটক করেছে পুলিশ। তার কাছ থেকে ৫০ পিচ ইয়াবা জব্দ করা হয়। পরে ওই দিন রাতে অভিযানে আরও তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের দেওয়া স্বীকারোক্তিতে বেরিয়ে আসে চাঞ্জল্যকর তথ্য। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বসে মাদক কেনাবেচা করতেন নগর পুলিশের তালিকাভুক্ত দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী নূর আলম ওরফে হামকা নুরুল আলম। তার বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন থানায় প্রায় দুই ডজন মামলা রয়েছে। এসব মামলায় গ্রেফতার হয়ে কয়েক বছর ধরে কারাগারে আছেন তিনি।

হামকা নুরুল আলম দুধর্ষ সন্ত্রাসী ও ছিনতাকারী। ‘হামকা গ্রুপ’ নামে একটি সন্ত্রাসী দলের নেতা তিনি। হামকা গ্রুপ ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রবাজি চালিয়ে চট্টগ্রাম নগরে ত্রাস সৃষ্টি করে। পরে পুলিশের তৎপরতায় নিয়ন্ত্রণে আসে তাদের অপরাধ। কয়েক বছর আগে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যান নুরুল আলম। সেখানে বসেই মোবাইল ফোনে সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং মাদকের কারবার চালিয়ে আসছিলেন বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

নগর পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ৩২ নম্বর সেলের ৩ নম্বর কক্ষে আছেন হামকা নুরুল আলম। সেখানে থেকে তিনি কারাগারের ভেতর এবং বাইরে ইয়াবা কেনাবেচা করে আসছিলেন। এমনকি তার সহযোগীদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে তার। গত বছর নিজাম উদ্দিন নামে এক ছিনতাইকারীর আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে এসব তথ্য উঠে আসে। আর তাকে এ ব্যবসায় সহায়তা করতেন গ্রেফতার কারারক্ষী সাইফুল। সে কারাগারের বাইরে থেকে মাদক সংগ্রহ করে কারাগারে নিয়ে যেতেন।

গ্রেফতার তিনজন হলেন- কোতোয়ালী থানার ৩৫ নম্বর বাটালী রোডের আব্দুস সোবহানের বাড়ির আবুল বাশরের ছেলে দিদারুল আলম মাসুম ওরফে আবু তাহের মাসুম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার সিদ্দিক আলীর ছেলে আজিজুল ইসলাম জালাল ও কোতোয়ালী থানার বিআরটিসি ব্রয়লার এভিনিউ আবদুল জলিলের মেয়ে আলো আক্তার।

কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহসীন জানান, সাইফুলকে জিঙ্গাসাবাদ করা হয়েছে। সে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। তিনি ইয়াবা সংগ্রহ করেছেন মাসুমের কাছ থেকে। এরপর হালিশহর কাঁচাবাজার এলাকায় একজনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন তিনি। মাসুম আগেও গ্রেফতার হয়ে কারাগারে ছিলেন। তখনই নুরুল আলমের সঙ্গে তার পরিচয়। সেই সূত্রে মাসুম জেলে থাকা নুরুল আলমকে নিয়মিত ইয়াবা সরবরাহ করতেন। ঘটনার দিন ৫০টি ইয়াবার মধ্যে ওই লোকের হাতে ১০টি দেওয়ার কথা ছিল তার। বাকি ৪০টি ইয়াবা কারাগারে নুরুল আলমকেই বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। আর তাদের এই লেনদেন হতো কারারক্ষী সাইফুলের মাধ্যমে।

জিজ্ঞাসাবাদে মাছুম জানিয়েছে, কারাগার থেকে নুরুল আলম তাকে ফোন করে কারারক্ষী সাইফুলের মাধ্যমে ইয়াবা পাঠানোর কথা বলে। সকালে আলো আক্তারের কাছ থেকে মাসুম ৫০টি ইয়াবা সংগ্রহ করে। দুপুরে সাইফুল ইয়াবাগুলো মাসুমের কাছ থেকে বুঝে নেন। তিন দিন আগেও একবার সাইফুলকে ৫০টি ইয়াবা দেওয়ার কথা তিনি জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন।

এদিকে গ্রেফতার জালালও দিয়েছে বেশ কিছু তথ্য। জিজ্ঞাসাবাদে জালাল পুলিশকে জানিয়েছে, এক বন্ধুর মাধ্যমে হামকা নুরুল আলমের সঙ্গে তার পরিচয়। নুরুল আলম তাকে ফোন করে গাঁজা পাঠানোর কথা বলেছিলেন। সাইফুল তার কাছ থেকে সেই গাঁজা সংগ্রহ করে পৌঁছে দিতেন।

বিভিন্ন সময় কারা প্রশাসন, পুলিশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থরের দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় সহায়তার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ পুরনো হলেও ইয়াবাসহ আটক কারারক্ষীর ঘটনা চট্টগ্রামে এই প্রথম। এ নিয়ে চট্টগ্রামে বিভিন্ন দপ্তরে চলছে নানা সমালোচনা। সচেতন মহল বলছেন, যেখানে রক্ষকরা ভক্ষক হয়ে যায়, সেখানে আস্থা রাখবে কার ওপর ! ইয়াবা-মাদকের ভয়াবহ থাবা থেকে তরুণ সমাজকে বাঁচাতে এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া উচিত। কারণ এটি কেবল অবৈধ ইয়াবা ব্যবসার প্রশ্নই নয়, এর সঙ্গে কারা প্রশাসন ও পুলিশ সদস্যদের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ও জড়িত। এর পেছনে ওপরের কারো হাত রয়েছে বলে মনে করছেন।

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, সাইফুলকে ভালোভাবে জিঙ্গাসাবাদ করলে বেরিয়ে আসবে থলের বিড়াল। যেখানে উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নামও চলে আসতে পারে। এর চেয়ে আরো জঘন্যতম ঘটনা ঘটলেও সাক্ষী প্রমাণের অভাবে যেগুলো নিভৃতে চলে যাচ্ছে।

পিডিএসও/রি.মা