যেভাবে ইয়াবা গডফাদার হয়ে উঠেন সাইফুল

প্রকাশ : ০১ জুন ২০১৯, ১৫:৫৭

অনলাইন ডেস্ক

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শীলবুনিয়া পাড়ার ডা. মো. হানিফের ছেলে সাইফুল করিম। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে এই ইয়াবা গডফাদারের নাম। ইয়াবা সাম্রাজ্যের কথিত এই 'ডন' শুক্রবার ভোরে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। ইয়াবা জগতের মাফিয়া হিসেবে খ্যাত সাইফুল করিমের মৃত্যুতে কক্সবাজারে চলছে ব্যাপক আলোচনা।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, মরণনেশা ইয়াবার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হওয়ার পর বিদেশে পালিয়ে ছিলেন সাইফুল করিম। আত্মসমর্পণের ইচ্ছা প্রকাশ করে গত রোববার মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুন থেকে দেশে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু তার শেষ রক্ষা আর হলো না। মৃত্যুর পর বেরিয়ে আসছে তার উত্থানের অজানা অনেক কাহিনী।

সূত্র জানায়, সাইফুল করিম চট্টগ্রামে বেড়ে উঠেছেন। পরিবার নিয়ে থাকতেন কোরবানিগঞ্জ এলাকায়। ইয়াবা জগতে প্রবেশের আগে ১৯৯৭-৯৮ সালের দিকে তিনি চট্টগ্রাম এমইএস কলেজে পড়াশোনা করতেন। এই সময়েই ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন সাইফুল। চট্টগ্রামের নামিদামি পরিবারের সন্তানদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। বন্ধু এবং পরিচিতদের 'অফার' দিতে শুরু করেন। অনেকে তার প্রলোভনে সাড়া দিয়ে ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। এভাবেই ইয়াবা ব্যবসায় বিশাল এক সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন সাইফুল করিম। স্বল্প সময়ের মধ্যে শতকোটি টাকার মালিক বনে যান।

ঘনিষ্ঠ মহলের মতে, সাইফুল করিমের ইয়াবা সিন্ডিকেট মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুন থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিস্তৃত। কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি এই সিন্ডিকেটের সদস্য। তাদের সবাই এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। সাইফুল প্রায় সময় দুবাই, ইয়াঙ্গুনে থাকলেও তার ইয়াবা কারবার চলছিল অপ্রতিরোধ্য গতিতে। সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির সঙ্গে ছিল সাইফুলের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। সেই সুবাদে সীমান্ত এলাকা টেকনাফে ছিল তার প্রভাব প্রতিপত্তি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, টেকনাফ স্থলবন্দরে সীমান্ত বাণিজ্যের আড়ালেও ইয়াবা ব্যবসা করতেন সাইফুল। বন্দরে আমদানি-রফতানি ব্যবসার নামে সেরা করদাতার তালিকাতেও থাকত তার নাম। এভাবে সিআইপি-ভিআইপি মর্যাদার আড়ালেও চলত তার ইয়াবা কারবার। সাইফুল নিজেকে আমদানি-রফতানিকারক বলে পরিচয় দিতেন। তার বৈধ ব্যবসার সাইনবোর্ডের নাম এসকে ইন্টারন্যাশনাল। মিয়ানমারের মংডু থেকে আমদানি পণ্যের সঙ্গে দেশে ইয়াবার চালান নিয়ে আসতেন তিনি। এই চালান সারাদেশে পাচার করার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে তার। এক সময়ে সাইফুল করিম বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বিয়ে করেছেন টেকনাফ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহর বোনকে। পুলিশ প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে রয়েছে তার সখ্য। সাইফুল টাকা দিয়ে সবকিছু ম্যানেজ করতেন।

চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ি ভিআইপি টাওয়ারসহ একাধিক স্থানে রয়েছে সাইফুল করিমের বেশ কয়েকটি অভিজাত অ্যাপার্টমেন্ট। রাজধানীতেও তার একাধিক ফ্ল্যাট আছে। ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মিয়ানমারের মংডুতে রয়েছে সাইফুল করিমের আলাদা কদর। সেখানে ইয়াবা ব্যবসার নিয়ন্ত্রক এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনও তাকে রাজার হালে অতিথি করে রাখতেন। কারণ, তারা প্রতি মাসে ইয়াবা বিক্রির কোটি কোটি টাকা বখরা পেতেন সাইফুলের কাছ থেকে।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাবে স্বজন ও তার প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের নামে শতকোটি টাকা রয়েছে। শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী সাইফুলের বিদেশে বিপুল অর্থ পাচার করার তথ্য পেয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তদন্ত দল।

এতদিন দাপটের সঙ্গে চললেও গত আগস্টের পর থেকে সাইফুলের সাম্রাজ্যে মেঘ জমতে শুরু করে। এই সময়ে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হলে তিনি গা ঢাকা দেন। প্রায় ১০ মাস সাইফুল দুবাই ও ইয়াঙ্গুনে আত্মগোপনে ছিলেন। তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, গত রোববার রাতে কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে ইয়াঙ্গুন থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান সাইফুল। এরপর রাতেই সড়কপথে কক্সবাজার রওনা হন।

ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করার ইচ্ছায় তিনি দেশে ফিরে এসেছেন। এ ব্যাপারে মধ্যস্থতা করেছেন একটি বেসরকারি টেলিভিশনের এক সাংবাদিক। ওই সাংবাদিকের মধ্যস্থতায় এর আগে তার দুই ভাই রাশেদুল করিম ও মাহাবুবুল করিম পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তারা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এ ঘটনার পর সাইফুলও দেশে ফেরার বিষয়ে আগ্রহী হন। মধ্যস্থতাকারী সাইফুলকে আশ্বাস দিয়েছিলেন– আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাকে 'পুলিশের সেফহোমে' রাখা হবে। কিন্তু সব পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে গেল সাইফুলের। ধরা দিলেও পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ হারালেন।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ জানান, কয়েক দিন আগে সাইফুল করিম বিদেশ থেকে টেকনাফ আসেন। তাকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে সাইফুল জানান, কয়েক দিন আগে মিয়ানমার থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ইয়াবার বড় একটি চালান নিয়ে এসেছে। সেই ইয়াবা উদ্ধারে গেলে ইয়াবা কারবারির সহযোীগরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। উভয়পক্ষের গোলাগুলিতে সাইফুল করিম গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।

পিডিএসও/রি.মা