ডিসি-এসপিদের প্রতি চাঁদাবাজি রুখতে কঠোর নির্দেশ

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০১৯, ১০:২৯

জুবায়ের চৌধুরী

জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই চলছে চাঁদাবাজির ধকল। মানুষের জীবনযাত্রা বাধা পড়েছে চাঁদাবাজির কাছে। নির্বিঘ্নে ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে যেমন চাঁদা লাগে; তেমনই জীবন বাঁচিয়ে রাখতেও লাগে চাঁদা। সন্ত্রাসীদের কবল থেকে রক্ষা পেতে চাঁদা, আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা পেতেও গুনতে হচ্ছে আরেক ধরনের চাঁদা। মৃত্যুর পরও রেহাই মেলে না চাঁদার হাত থেকে। জানাজা থেকে কবরস্থানে দাফনের আগপর্যন্ত গুণতে হয় চাঁদা। এমনকি কবরস্থান থেকে লাশ চুরি ঠেকাতেও দিতে হচ্ছে মাসোয়ারা।

দেশে একজন নাগরিককে প্রতিটি স্তরে স্তরে চাঁদা গুনতে হচ্ছে। সমাজের জন্য অভিশপ্ত এ চাঁদাবাজি এখন ‘নিয়ম’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাঁদাবাজি থামছে না কিছুতেই। ফুটপাত থেকে শুরু করে নির্মাণাধীন বহুতল ভবন, তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায়েও প্রভাব বিস্তার করে চলছে চাঁদাবাজি। ভুক্তভোগীদের মতে, চাঁদাবাজির ধরনেও নানা আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। পাল্টে গেছে চাঁদার পরিমাণ ও স্টাইল। আগে যেখানে শুধু শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে চাঁদাবাজি চলত, এখন সেসব জায়গা দখল করে নিয়েছে এলাকার ছিঁচকে মাস্তান আর স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী চক্র।

জীবন চক্রে মিশে যাওয়া এ চাঁদাবাজি থেকে মানুষকে মুক্ত করতে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে দেশের প্রত্যেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) চিঠি দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। আপাতত সড়কের চাঁদাবাজি বন্ধে সংশ্লিষ্টদের কঠোর হতে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। কারণ সড়কের চাঁদাবাজি বন্ধ করা গেলে নিত্যপণ্যের দাম হাতের নাগালেই থাকবে। আসন্ন রমজানে পণ্যসামগ্রীর দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর বাজার মনিটরিং ছাড়াও সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) চিঠি দেওয়া হচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ের নিজ দফতরে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্শী। রমজানে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে সড়কে পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজিকে দায়ী করা হয়। এ বিষয়ে সাংবাদিকরা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা জানতে চাইলে টিপু মুন্শী বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা এ বিষয়ে আগেই অভিযোগ দিয়েছেন। পণ্য পরিবহনে তাদের পথে পথে চাঁদা দিতে হয়। আমরা এবার বিষয়টি কঠোর হাতে দমন করব।’ মন্ত্রী বলেন, ‘পণ্য পরিবহনে সড়কের চাঁদাবাজি বন্ধে দ্রুত জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের পদক্ষেপ নিতে সরকারের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হবে।’ এ সময় বাজার নিয়ন্ত্রণে মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘রমজানে চাল, মসুর ডাল, তেল, চিনি ও ছোলা বেশি প্রয়োজন হয়। এবার এসব পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। কোথাও কোনো সংকট হওয়ার কথা নয়। এর পরও কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সুতরাং এবার দাম বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।’

পরিবহন সেক্টরে বিস্তৃত চাঁদাবাজি : পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য থামানোর সাধ্য যেন কারো নেই। ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা পরিবহন চাঁদাবাজদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব উদ্যোগ ইতোমধ্যে ভেস্তে গেছে। আর চাঁদাবাজি এখন অপ্রতিরোধ্য রূপ নিয়েছে। একশ্রেণির পরিবহন শ্রমিক, চিহ্নিত সন্ত্রাসী, পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন মহলের আশীর্বাদপুষ্টদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে সম্মিলিত চাঁদাবাজ চক্র। তাদের কাছেই জিম্মি হয়ে পড়েছে যানবাহন চালক, মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই। চাঁদাবাজির অত্যাচার নিয়ে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যেও দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে। এসব নিয়ে বিভিন্ন রুটে পরিবহন ধর্মঘট পর্যন্ত হচ্ছে।

সড়ক পরিবহন সেক্টরে সন্ত্রাসীরা সরাসরি ‘চাঁদা’ তুললেও পরিবহন শ্রমিকরা চাঁদা নেন শ্রমিক কল্যাণের নামে। ট্রাফিক সার্জেন্টরা টাকা তোলেন মাসোয়ারা হিসেবে। এ ছাড়াও আছে বেকার ভাতা, রাস্তা ক্লিয়ার ফি, ঘাট ও টার্মিনাল সিরিয়াল, পার্কিং ফি নামের অবৈধ চার্জ। এমন নানা নামে, নানা কায়দায় চলছে এ চাঁদাবাজির ধকল। নানামুখী চাঁদার কবলে গাড়ির চালক, মালিক, শ্রমিক সবার জীবনই অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেছে। মহাখালী, গাবতলী, সায়েদাবাদসহ অন্যান্য বাস ও ট্রাক টার্মিনালের অবস্থা আরো দুর্বিষহ। এসব স্থানে গাড়ি ঢুকতেও টাকা লাগে, বেরোতেও টাকা লাগে। নিজেদের বেকার পরিবহন শ্রমিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে একটি চক্র গাড়িপ্রতি ৩০ টাকা পর্যন্ত আদায় করে থাকে। বিভিন্ন টার্মিনালমুখে অবস্থান নিয়ে তারা রীতিমতো রং-বেরঙের সিøপের মাধ্যমে চাঁদা তুললেও বাধা দিচ্ছে না কেউ।

ট্রাক থেকেই কোটি টাকা : দেশে প্রতিদিন ৯০ হাজার পণ্যবাহী ট্রাক এবং কাভার্ড ভ্যান চলাচল করে থাকে। এর কোনোটিই পুলিশকে চাঁদা না দিয়ে চলতে পারে না বলে অভিযোগ রয়েছে। পণ্যবাহী ট্রাক থেকে প্রতিদিন গড়ে কোটি টাকা চাঁদা আদায় হচ্ছে। সড়ক-মহাসড়কে ট্রাক চলাচল করতে গিয়ে একেকটি স্পটে ৫০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। এ চাঁদা যেমন হাইওয়ে পুলিশ নেয়, তেমনি মালিক ও শ্রমিক সমিতির নামেও আদায় করা হয়। চাঁদাবাজি নিশ্চিত করতে যেসব প্রশাসনিক হয়রানি চালানো হয়, তাতে ট্রাক মালিক-শ্রমিকরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পণ্যবাহী ট্রাক ট্রাফিক জ্যামে পড়লে একটি গ্রুপ আছে যারা ভাঙচুরের হুমকি দিয়েও চাঁদাবাজি করে থাকে। ঈদ বা কোনো উৎসব ঘিরে এ চাঁদা আদায়ে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে পুলিশ। ট্রাকচালকরা জানান, আগে সাধারণত ঢাকার একজন সার্জেন্টকে ১০০ টাকা দিয়ে স্লিপ সংগ্রহ করলে সিটির মধ্যে আর কোথাও পুলিশকে চাঁদা দিতে হতো না। কিন্তু বর্তমানে এক সার্জেন্ট অন্য সার্জেন্টের সিøপকে পাত্তা দেন না, আলাদা আলাদাভাবেই টাকা দিতে হয়।

চাঁদার মহোৎসব চলছেই : থানার চাঁদা, ফাঁড়ির চাঁদা, ঘাট চাঁদা, স্পট চাঁদা; পুলিশ হাতায় মাসোয়ারা, মালিক-শ্রমিকের কল্যাণ ফি; রুট কমিটি-টার্মিনাল কমিটির চাঁদাও চলে বাধাহীনভাবে। সবকিছুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে পুলিশের টোকেন-বাণিজ্য। টার্মিনাল-সংশ্লিষ্টরা জানান, সায়েদাবাদ থেকে দেশের পূর্ব-উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাসমূহের ৪৭টি রুটে চলাচলরত দুই সহস্রাধিক যানবাহন থেকে এভাবেই ফ্রি স্টাইলে চলছে চাঁদাবাজি। বাস-মিনিবাসের চালক ও শ্রমিকরা জানান, চাঁদা না দিয়ে কোনো গাড়ি টার্মিনাল থেকে বাইরে বের হতে পারে না। চাঁদা নিয়ে প্রতিবাদ করলে নির্যাতনসহ টার্মিনাল ছাড়া হতে হয়। রাজধানী থেকে চলাচলকারী দূরপাল্লার কোচ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদাবাজি চলছে। লোকাল সার্ভিসের প্রতিটি গাড়ি থেকে ট্রিপে আদায় করা হচ্ছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। বিভিন্ন রুটে চলাচলরত গাড়ির মালিক-শ্রমিকরা জানান, নানা রকম কমিটির দখলদারিত্ব আর মাত্রাতিরিক্ত চাঁদাবাজির অত্যাচারে মালিকরা পথে বসতে চলেছেন। শ্রমিকদের আয়ও কমে গেছে।

পরিবহন খাতে নানা নৈরাজ্যের মধ্যে অবৈধ চাঁদা আদায় একটি বড় নৈরাজ্য হিসেবে চিহ্নিত। এতে হতাশাগ্রস্ত চালক, শ্রমিক ও মালিকরা। চাঁদার নৈরাজ্যকেও সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়। এক জরিপে দেখা গেছে, একটি বাসে প্রতিদিন প্রয়োজনীয় ব্যয় হয় ১০-১১ হাজার টাকা। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হয় দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মতো। এই দেড় হাজার টাকা অবৈধ চাঁদা হিসেবে দিতে হয়। আর এ চাঁদা পুলিশ ছাড়াও মালিক ও শ্রমিক ইউনিয়নের নামে নেওয়া হয়। অন্যদিকে চালক ট্রিপ হিসেবে প্রতিদিন ১৬-১৮ ঘণ্টা কাজ করে দিনে দেড় হাজার টাকার বেশি পান না। নানা কারণে চাঁদা বেড়ে গেলে তা চালককেই দিতে হয়। ফলে তার ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপ পড়ে। যেহেতু নির্ধারিত বেতন নেই, তাই তিনি আয় বাড়াতে ও চাঁদার দাবি মেটাতে বেশি ট্রিপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে বেপরোয়া হয়ে উঠেন এবং অন্য বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত।

পিডিএসও/হেলাল