আরেক ভয়ংকর মাদক ‘আইস’

প্রকাশ : ২৪ মার্চ ২০১৯, ১০:১৮

জুবায়ের চৌধুরী

সর্বনাশা মাদকের ভয়াবহতা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে মাদকের নিত্যনতুন ধরন ও কারবারের নতুন কৌশল। এরই ধারাবাহিকতায় ইয়াবা কিংবা ‘খাট’ নিয়ে চিন্তার মধ্যেই নতুন আরেক মাদক নিয়ে দুশ্চিন্তা বেড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। ‘এমডিএমএ’ বা ‘আইস’ নামের এই মাদক ইয়াবার চেয়েও ভয়ংকর। ক্ষতির বিবেচনায়ও এটি ইয়াবা ও খাটের চেয়েও ভয়াবহ।

খোদ রাজধানীতেই খোঁজ মেলে ‘আইস’ কারখানা। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুরে ‘আইস’ পিল তৈরি ল্যাবের সন্ধান পায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)। তবে এই মাদক তৈরির উপাদান ও কারখানার সন্ধান পাওয়া গেলেও হোতা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় বেড়েছে উদ্বেগের মাত্রা।

ভয়ংকর মাদক ‘আইস’ : চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুর থেকে আইস পিলসহ রাকিব উদ্দিন নামে এক মাদক কারবারিকে আটক করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)। পরে তার দেওয়া তথ্যে, জিগাতলার ৭/এ নম্বর সড়কের ৬২ নম্ব^র বাসার বেজমেন্টে ‘আইস’ পিল তৈরির একটি ল্যাবের সন্ধান মেলে। সেখানে আইস ও এমডিএমএসহ (এক্সটাসি) সিউডোফিড্রিন এক্সট্রাকশন সুবিধাসংবলিত অত্যাধুনিক ডিস্টিলেশন চেম্বার সজ্জিত ছিল। ওই ল্যাবে ‘আইস’ মাদক তৈরি হতো। তবে ল্যাবের মালিক ও তৈরির হোতা হাসিব মোহাম্মদ রশিদকে (৩২) গ্রেফতার করা যায়নি।

জানা গেছে, ইয়াবার চেয়ে ১০০ গুণ মারাত্মক মাদক ‘আইস’। এটি সেবনে মস্তিষ্ক বিকৃতিসহ মৃত্যুও ঘটতে পারে। এই মাদকের মূল উপাদান মেথা ফেটামিন বিষণ্নতা থেকে মুক্তি ও প্রাণসঞ্চারে উজ্জীবিত হতে ১৯৫০ সালে ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও পরে তা বিবর্তিত হয়ে ভয়ংকর মাদকে রূপ নেয়। ইন্দ্রিয় অনুভূতি, সাহস ও শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি যৌন উত্তেজনা বাড়াতে এই মাদক পরিচিতি পেলেও এর ক্ষতিকর দিকই বেশি বলে জানা গেছে। এই মাদক সেবনে অনিদ্রা, অতিরিক্ত উত্তেজনা, স্মৃতিভ্রম, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, শরীরে চুলকানিসহ নানা রোগ দেখা দেয়।

ধোঁয়ার মাধ্যমের চেয়ে ইনজেকশনের মাধ্যমে এ মাদক নিলে মাত্র ১৫-৩০ সেকেন্ডের মধ্যে এর কার্যক্রম শুরু হয়। আর এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো কর্মকা- ঘটাতে দ্বিধা করে না এই মাদক গ্রহণকারীরা।

উৎপত্তির ক্রমবিকাশ :  ১৮৮৭ সালে জার্মানিতে মেথা ফেটামিনের উৎপত্তি ঘটে। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এর বিবর্তনের মাধ্যমে জাপানি সৈন্যদের বিশেষ করে যুদ্ধবিমানের চালকদের অনিদ্রা, উত্তেজিত ও নির্ভয় রাখার জন্য ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৬০ সালে এর অপব্যবহার বেড়ে যায়। ১৯৭০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরকার মেথা ফেটামিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। পরে ১৯৯০ সালে মেক্সিকোর মাদক ব্যবসায়ীরা বিবর্তনের মাধ্যমে মাদক হিসেবে এটি ছড়িয়ে দেয় আমেরিকা, ইউরোপ, চেক রিপাবলিক ও এশিয়াসহ দুনিয়ায়।

গত ২০১০ সালের একটি রিপোর্টে দেখা গেছে, ওই বছর অস্ট্রেলিয়ায় মাদক হিসেবে এর ব্যবহার অনেক বেড়ে যায়। এশিয়ার দেশের মধ্যে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও চায়নায় এর ব্যবহার রয়েছে ব্যাপক। ইয়াবা নিয়ে অভিযান ও তৎপরতা বাড়ায় মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এই নতুন মাদকের উদ্ভব হয়েছে এমনটাই ধারণা করছেন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। তবে ঢাকার অভিজাত এলাকায় ধনীর দুলালরা ‘আইস’ মাদকের স্পর্শ পেলেও দাম বেশি হওয়ায় এর ব্যাপ্তি বাড়েনি।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) সহকারী পরিচালক খুরশিদ আলম জানান, হাসিব নামে এক যুবক দেশে প্রথম ‘আইস’ তৈরি ও কারবার শুরু করে। তার কারখানা থেকে রাসায়নিকসহ বিভিন্ন কাঁচামাল জব্দ করা হয়েছে। খুব ব্যয়বহুল হওয়ায় উচ্চবিত্ত শ্রেণির লোকজনই তা গ্রহণ করে থাকে। বিভিন্ন ওষুধ থেকে এর কাঁচামাল সংগ্রহ করা হয়। তিনি বলেন, এই মাদক পাউডার জাতীয়। একবার সেবন করতে ৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। যা হেরোইনের চেয়েও অনেক বেশি ব্যয়বহুল। আইস বা এমডিএম সেবনের ফলে কারো দেহ যদি তা সহ্য করতে না পারে তবে হৃদরোগে আক্রান্ত বা মৃত্যুও হতে পারে।

খুরশিদ আলম আরো জানান, নতুন ধরনের এই মাদকের হোতা হাসিব মালয়েশিয়ায় পড়ালেখা করতেন। তিনি ভয়াবহ মাদকাসক্ত ছিলেন। দেশে ফেরার পর তাকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রেও নেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি সংশোধন হননি। উল্টো নিজের বাড়িতেই গড়ে তোলেন মাদকের কারখানা। সেখানে নিয়মিত তরুণ-তরুণীদের আড্ডাও হতো।

গ্রিন টির আড়ালে আসছে ‘খাট’ : গ্রিন টির (সবুজ চা) আড়ালে দেশেই বিক্রি হচ্ছে নিউ সাইকোট্রফিক সাবসটেনসেস (এনপিএস) জাতীয় মাদকদ্রব্য ‘খাট’। সম্প্রতি ‘এনপিএস’ মাদকের একটি চালান জব্দের পর এমন তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। যদিও আফ্রিকার দেশ ইথিওপীয় গাঁজা হিসেবে পরিচিত নতুন এই মাদকটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিদেশে পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশ শুধু রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।

কিন্তু গত ৩১ আগস্ট ৮৫০ কেজির একটি চালানের ঘটনায় একজন আন্তর্জাতিক মাদক চোরাকারবারিকে গ্রেফতারের পর চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উঠে এসেছে। দেশের মাদকের তালিকায় নেই নতুন এই মাদকটি। তাই এই মাদকটি নিয়ে দুশ্চিন্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে দেশেও এই মাদক বিক্রি হওয়ার তথ্য পেয়েছেন তারা। বাংলাদেশে নতুন হলেও এই মাদকটি এখন বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ‘এনপিএস’ বা ‘খাট’ দেশে ব্যাপকহারে ব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। এরই মধ্যে ইয়াবার বিকল্প হিসেবে অল্প পরিসরে ব্যবহার শুরু হয়েছে বলেও গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন। সম্প্রতি ইয়াবাসহ প্রচলিত মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরুর কারণে ‘খাট’ কারবার বেড়েছে বলেও ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তিন কোটি ইয়াবা জব্দ, সোয়া লাখ কারবারি গ্রেফতার : গেল বছর সোয়া লাখ মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করেছে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে প্রায় ৯১ হাজার। এ সময়ে তিন কোটির বেশি ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হলেও অন্যান্য মাদকও ছিল উল্লেখযোগ্য পরিমাণের। মাদকের ভয়াবহতা বেড়ে যাওয়ায় জনমনে যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে তা নির্মূল করতেই মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পিডিএসও/তাজ