সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ-ক্ষোভ

অপারেটরদের হাতে ‘জিম্মি’ মোবাইল ব্যবহারকারীরা

কলড্রপের বিড়ম্বনা কমছে না

প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৯, ০৯:০৭

জুবায়ের চৌধুরী

মোবাইল ফোনের কলড্রপ ও ইন্টারনেট ডেটা ব্যবহারে গ্রাহকদের মাঝে দিন দিন অসন্তোষ বাড়ছেই। ক্রয় করা ডেটা কী পরিমাণ ব্যবহার হলো তা যাচাইয়ের কোনো উপায় নেই গ্রাহকদের কাছে। আবার গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা কেটে নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও আছে মোবাইল অপারেটরদের বিরুদ্ধে। সঙ্গে আছে যখন তখন কলড্রপের বিড়ম্বনা। থ্রিজি থেকে ফোরজি নেটওয়ার্ক চালু হলেও কলড্রপ কমছে না। আর ইন্টারনেট ডেটা ব্যবহারে গ্রাহকদের সঙ্গে রীতিমতো প্রতারণা চলছে। ইন্টারনেট ডেটা প্যাকেজ ও তার মেয়াদ নিয়ে গ্রাহকের আছে নানা প্রশ্ন। ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস (ভ্যাস) এবং গ্রাহক সেবার মান নিয়েও আছে বিস্তর অভিযোগ। দিন যত যাচ্ছে অপারেটরদের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের অভিযোগের স্তূপ বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে অসন্তোষ-ক্ষোভ। কিন্তু অভিযোগ বাড়লেও সমাধানের কোনো পথ মিলছে না। নিজেদের মতো সাফাই গাইলেও অপারেটরগুলোর কাছে নিজেদের এক ধরনের জিম্মি মনে করছেন মুঠোফোন গ্রাহকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮ সালে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের অভিযোগ কেন্দ্রে মোবাইল অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে ২ হাজারের বেশি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এসব অভিযোগের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়নি একটিরও। মোবাইল অপারেটরগুলোর কোনো সেবা নিয়ে অসন্তোষ থাকলে গ্রাহকরা প্রথমে ছুটে যান অপারেটরগুলোর গ্রাহক সেবা কেন্দ্রে। সেখানে সেবাপ্রাপ্তি নিয়েও আছে গ্রাহকদের বিস্তর অভিযোগ। মোবাইল অপারেটরগুলোর কাছ থেকে গ্রাহকরা সরাসরি, কল সেন্টার এবং অনলাইনে লাইভ চ্যাট; এই তিনভাবে সেবা নিতে পারেন। লাইভ চ্যাটে সেবা একেবারেই সীমিত। তাই কল সেন্টার কিংবা সরাসরি সেবা কেন্দ্রে যান গ্রাহকরা। কল সেন্টারে ফোন দিলেই গ্রাহকদের ‘অঙ্কের ক্লাসে’ বসিয়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন সেবার নামে ১ থেকে ৯ পর্যন্ত চাপতে বলা হয়। এভাবে কয়েক দফা নম্বর চেপে কাঙিক্ষত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা যায়। এর মধ্যে কেটে যায় দেড় থেকে ২ মিনিট।

একই অবস্থা গ্রাহক সেবা কেন্দ্রগুলোতেও। গ্রাহক অনুপাতে কম সংখ্যক কর্মী থাকায় অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘক্ষণ। এসব কারণে গ্রাহক সেবা কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগেও অনুৎসাহিত হয়ে পড়েন তারা। মোবাইল অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের বিষয়ে সমাধান পেতে বেশ নাজেহালই হতে হয় গ্রাহকদের। ভোক্তা হিসেবে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার বিষয়ে অভিযোগ জানানোর জন্য গ্রাহকদের অনেকেই যান জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কেন্দ্রে। কিন্তু সেই সংস্থাটি মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপই নিতে পারে না। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (তদন্ত) মাসুম আরেফিন বলেন, মোবাইল অপারেটরগুলোর পক্ষে করা এক রিটের কারণে উচ্চ আদালত এক আদেশ জারি করে। ২০১৭ সালের ২৮ মে জারি করা ওই আদেশের কারণে মোবাইল অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। যেসব অভিযোগ আসে আমরা শুধু সেগুলো সংরক্ষণ করে রাখি। কোনো ব্যবস্থা নিতে পারি না।

তবে মোবাইল অপারেটরগুলো গ্রাহকদের এসব অভিযোগ মানতে নারাজ। গ্রাহকদের অভিযোগ এবং অসন্তোষের জবাবে প্রতিটি মোবাইল ফোন অপারেটর বক্তব্য কমবেশি একই রকম। ব্যবহৃত ইন্টারনেট যাচাইয়ের জন্য নিজেদের পাঠানো এসএমএস এবং মোবাইলভিত্তিক অ্যাপসেই ভরসা রাখতে হবে বলে জানায় গ্রামীণ ফোন এবং বাংলালিংক। আর কলড্রপ হলে গ্রাহকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ‘মিনিট’ দেওয়া হয় বলে জানায় অপারেটরগুলো। এসব মিনিটের মেয়াদ একদিন হয় বলে জানানো হয়।

কলড্রপ ও ডেটা ব্যবহারে অসন্তোষ বাড়ছে : গ্রাহকদের মধ্যে অনেক দিন থেকেই কলড্রপ ইস্যুতে অসন্তোষ বিরাজ করছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশের চতুর্থ প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক ফোরজি চালু হওয়ার পর থেকে এই সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু থ্রিজি এবং ফোরজি সংযোগে এখনো রয়ে গেছে সমস্যা। তাই কলড্রপ বিড়ম্বনা থেকেও মুক্তি মেলেনি গ্রাহকদের। এছাড়া ডেটা প্যাকেজ ও তার মেয়াদ বিষয়ে গ্রাহকদের অন্ধকারে রাখা হয়েছে।

কলড্রপ বিড়ম্বনার শিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জারিফ রহমান চৌধুরী তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, মাঝে মাঝেই কথা বলার মাঝখানে হঠাৎ করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেক সময় আবার সংযোগ থাকলেও অন্যপাশ থেকে কোনো শব্দ পাই না। আমার কথাও অন্যজন শুনতে পায় না। তখন বাধ্য হয়ে আমাকেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হয়। আবার অনেক সময় নিজ থেকেই কেটে যায়। এতে অল্প সময়ের কথা অনেক সময় নিয়ে বলতে হয়। তাই মোবাইল ফোন ব্যবহারে খরচ বাড়ছে। অনেকবার গ্রাহক সেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করেছি। তারা শুধু ‘দুঃখিত’ আর ‘দেখছি’ বলেই দায় সারেন। আজ পর্যন্ত কোনো প্রতিকার পেলাম না। থ্রিজি ছেড়ে এখন ফোরজিতে আছি। কিন্তু নেটওয়ার্কের সমস্যা যেন বাড়ছেই। এসব দেখার কি কেউ নেই?

আরেক শিক্ষার্থী বায়জিদ হাওলাদার জানান, মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করে পড়াশোনার অনেক কাজ করেন তিনি। তাই বিভিন্ন মেয়াদ ও পরিমাণের ডেটা প্যাকেজ কেনেন। কিন্তু প্রায়ই তার কেনা ডেটার হিসাব-নিকাষ মেলাতে পারেন না। তিনি জানালেন, কিছুদিন আগে এক জিবির ইন্টারনেট প্যাক কিনি। কিছু সময় নেট ব্যবহারের পর মেসেজ এলো আমার আর ৪০০ এমবি বাকি আছে। এর মানে হচ্ছে, আমি প্রায় ৬০০ এমবি খরচ করে ফেলেছি। কিন্তু শুধু ফেসবুক ইউজ করে এত এমবি খরচ হওয়ার কথা নয়। আমি কিভাবে ৬০০ এমবি খরচ করলাম তা জানারও উপায় নেই। এভাবেই গ্রাহকের গলা কাটছে অপারেটররা।

আবার অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, তাদের মোবাইল নম্বরে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চালু হয়ে যায় বিভিন্ন ধরনের ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস। এর জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবেই গ্রাহকদের মোবাইল থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয়। এসব বিষয়ে টেলিকম প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং পোলারিস ফরেনসিক লিটিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানভীর হাসান জোহা বলেন, গ্রাহকদের স্বার্থরক্ষায় একটি অডিট ব্যবস্থা বিটিআরসির কাছে থাকা উচিত। বিটিআরসির বিলিং সার্ভারের অডিট করার ক্ষমতাও আছে। তবে নিয়ম করে সেই সার্ভার অডিট করা হয় কি না সেটিই হচ্ছে দেখার বিষয়। কারণ কেউ যদি কোনো কারচুপির চেষ্টাও করে সেটা ধরা পড়বেই। কারণ সবকিছুই বিটিআরসির সার্ভারে থেকে যায়। সেখান থেকে লগ মুছে ফেলা যায় না।

সেবার মান নিশ্চিতকরণে নীতিমালা : বিটিআরসি সূত্রে জানা যায়, অপারেটরগুলোর সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য এরই মধ্যে একটি নীতিমালা তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কোয়ালিটি অব সার্ভিস গাইডলাইন নামের ওই নীতিমালা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে। নীতিমালা পাস হলে গ্রাহকদের প্রতি অপারেটরগুলোর সেবার মান বাড়বে বলে ধারণা সংস্থাটির। এছাড়া নীতিমালার ফলে অপারেটরগুলোর জবাবদিহিও বাড়বে বলে মনে করছে টেলিকম বিশেষজ্ঞরা। গ্রাহকদের প্রতি সেবার মান বজায় রাখতে না পারলে অপারেটরগুলো ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা জরিমানার সুপারিশ করা হয়েছে নতুন নীতিমালায়।

পিডিএসও/হেলাল