ছাঁই কারখানার প্রভাবে জনজীবন বিপন্ন

প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০১৯, ১৮:৩৫ | আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০১৯, ১৮:৫২

জুয়ের রানা লিটন
ama ami
ছাঁই কারখানার কাঁচামাল

নোয়াখালী সদর উপজেলার ধর্মপুরের চরদরবেশের জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ্যাডভান্স রিনিউবাল এনার্জি ইন্ডাস্ট্রিজ নামের একটি ছাঁই উৎপাদন কারখানার দূষিত পরিবেশ ও বিষাক্ত গন্ধে এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। কারখানার আশপাশের বাড়ির গাছপালা বিবর্ণ আকার ধারণ ও বসবাসরত পরিবারগুলো নানা রোগ ব্যাধির শিকার হচ্ছেন।

সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, কারখানার দক্ষিণ পাশের ফুলকপি ক্ষেতের সবজি মরে বিবর্ণ আকার ধারণ করেছে। ক্ষেতের মালিক কৃষক শফিক মিয়া জানান, তিনি প্রায় দু’একর জমিতে এ বছর ফুলকপির চাষ করেছেন। প্রথমে ফলন ভালো দেখালেও দিনের পর দিন এ কারখানার পরিত্যক্ত ছাঁইয়ে খেতের মাটি বিবর্ণ হয়ে ফুলকপি মরতে শুরু করেছে। এতে তিনি বিপুল অংকের দায় দেনার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন।

শফিক মিয়ার প্রতিবেশি আবদুর রহমান (৩২) নামে এক তরুণ এ কারখানার বিষাক্ত ছাঁইয়ের প্রভাবে চর্ম রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। রহিমা খাতুন জানান, তার ছেলে-মেয়েরা প্রায় সময়ই সর্দি কাঁশিসহ নানা রোগে ভুগছে।

স্থানীয় বেলাল মিয়া অভিযোগ করেন, খোলা পরিবেশ ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্থাপিত এ কারখানা স্থাপনের প্রতিবাদ জানালে মালিক মোশারফ হোসেন জনৈক আওয়ামী লীগ নেতার নাম বিক্রি করে প্রতিবাদীদের কণ্ঠ স্তব্ধ করতে ভয়ভীতি দেখান। 

এ বিষয়ে ধর্মপুর ইউনিয়নের কৃষি মাঠ কর্মকর্তা সাহাব উদ্দিন বলেন, আমি খবর পেয়ে এলাকায় গিয়েছি। কারখানার ব্যবস্থাপককে এ বিষয়ে জানানোর পর তারা এর উৎপাদন বন্ধ করে দেবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। 

তিনি আরও বলেন, ছাঁইয়ের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এসব সবজি মানুষের পেটে গেলে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এলাকাবাসী আরো জানান, কারখানার বিকট শব্দের কারণে রাতের বেলায় ঘুমাতে পারেননা তারা।

ছাঁই কারখানার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ফুলকপি ক্ষেত

এদিকে কারখানার ভেতরে ঢুকে দেখা গেছে, এখানকার পরিবেশ বলতে কিছুই নেই। যেকোনো সুস্থ্য মানুষের জন্য যেনো এটি মৃত্যুকূপ। চারদিকে শুধু ছাঁই আর ছাঁই। মাটি থেকে শুরু করে সবই এক বর্ণের। এ সময় দেখা গেছে, যে পানিতে শ্রমিকরা গোসল করছেন সে পানির রঙও অত্যন্ত বিবর্ণ ও ভয়ঙ্কর।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শ্রমিক জানান, সবই দেখে শুনে পেটের দায়ে করছি। 

জানা যায়, এখানে রাতের বেলায় বিভিন্ন জায়গা থেকে পরিত্যক্ত ও সংগৃহিত টায়ার এনে  পোড়ানো হয়। এসব পোড়া টায়ার আর গাছের পোড়া ছাঁই একত্রিত করে বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহ করা হয়। 

তারা বলেন, ইটভাটায় কয়লা পোড়ানোর নামে যা ব্যবহার করা হচ্ছে তা হচ্ছে এই ছাঁইগুলো। দেখতে কয়লার মতো রঙ হওয়ায় কেউ এর সঠিক নজরদারি করেননা। এতে ভাটার মালিকেরা রাষ্ট্র ও জনগণকে প্রতারিত করলেও কয়লার মোটা অংকের খরচ থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে পারছেন। 

জানা যায়, এ কারখানাটির যাত্রা শুরু হয়েছিল বছর তিনেক আগে। সে সময়ে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে শতভাগ পরিবেশবান্ধব ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে পাইরোলিসিস প্রক্রিয়ায় সাশ্রয়ী মূল্যের নবায়নযোগ্য জ্বালানী তথা গ্রিণ ওয়েল উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠান নামীয় সাইনবোর্ড লাগালেও আদৌ এর পরিবেশসম্মত অস্তিত্ব চোখে পড়েনি। এছাড়া কারখানার নামের সাইনবোর্ডের শুরুতে লেখা রয়েছে এটি ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নিবন্ধিত শিল্প প্রতিষ্ঠান।’

ছাঁই কারখানার কাঁচামাল নামছে ট্রাক থেকে

কারখানার মালিক মোশারফ হোসেন মুঠোফোনে বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় আছি। আমার দ্বারা কারা কোনো ক্ষতি হোক, তা চাইনা। এ ব্যাপারে সহসায় উদ্যোগ কিভাবে পরিবেশ সম্মতভাবে এটি চালানো যায়।’ 

পরিবেশ অধিদপ্তর নোয়াখালীর সহকারী পরিচালক মো. আবদুল মালেক মিয়া বলেন, ২০১৬ সালে এ কারখানার নামে পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র দিয়েছিল। ইতোমধ্যে স্থানীয় গণ স্বাক্ষরীত একটি অভিযোগ পত্র আমরা পেয়েছি। শীঘ্রই আমরা কারখানাটি পরিদর্শনে গিয়ে অবস্থার আলোকে আইনগত ব্যবস্থা নেবো।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম সর্দার বলেন, এলাকাবাসী এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেবো।

পিডিএসও/অপূর্ব