গোয়েন্দাদের আশঙ্কা

ভোটের আগে জঙ্গি তৎপরতা বাড়তে পারে

ইন্টারনেট ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বন্ধ রাখা ও ফোরজির গতি রাখতে হবে নিম্নগতির

প্রকাশ | ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ১১:১৭

গাজী শাহনেওয়াজ

‘একটি রাজনৈতিক দল ও জোট পুলিশকে ব্যস্ত রেখে ভোটের মাঠে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চায়। তারা পুলিশকে ফোনে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে ধোঁকার মাধ্যমে অসৎ উদ্দেশ্যকে কাজে লাগাতে চাচ্ছে। ওই গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র ও কৌশলের পরিকল্পনা পুলিশ জেনে গেছে। এ ব্যাপারে এর মধ্যেই নড়েচড়ে বসেছেন পুলিশের গোয়েন্দারা।

এদিকে, ক্ষমতাসীন দলের বড় ও শীর্ষ নেতাদের একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে টার্গেট করে হত্যা করা হতে পারে। নির্বাচনের আগে গুপ্ত হত্যা ও গুম-খুন বেড়ে যেতে পারে। বাড়তে পারে জঙ্গি তৎপরতা। মাথাচাড়া দিতে পারে অশুভ শক্তি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানা ধরনের সুযোগ গ্রহণ করে নির্বাচনের স্বাভাবিক পরিবেশকে অস্বাভাবিক করে তুলে বিশৃঙ্খল করতে পারে। এসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’ এসব তথ্য জানা গেছে ইসি সূত্রে।

এছাড়া নির্বিঘ্নে নির্বাচনের কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য ভোটের ৩ দিন আগে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নেটওর্য়াক বন্ধ রাখা, এর লেনদেন তদারকি করা, মোবাইল নেটওর্য়াক বন্ধ রাখা, ফোরজি থেকে নেটওর্য়াক টুজিতে নামিয়ে আনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে রাখা, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কাছে কেবল বৈধ অস্ত্র রাখা; তবে তা প্রদর্শন না করা, প্রার্থীর বাইরে যাদের কাছে বৈধ অস্ত্র রয়েছে তা নির্বাচনের ৭ দিন আগে জমা দেওয়া, সাংবাদিকদের ভোটের পরিচয়পত্র দেওয়ার আগে তাদের সঠিকতা যাচাই করা, যেন তেনভাবে কাউকে কার্ড না দেওয়া, পর্যবেক্ষক এবং পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর ওপর সর্তক নজর রাখা এবং ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কারো মোবাইল নিয়ে প্রবেশ করতে না দেওয়া এবং কেন্দ্রের মধ্যে ছবি ও ভিডিও তোলা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ রাখার দাবি জানিয়েছে বৈঠকে উপস্থিত গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি রিটার্নিং কর্মকর্তারা।

আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট। এ ভোট কার্যক্রমকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে গতকাল বৃহস্পতিবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সভা নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সভায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেয়। এখানে আগামী নির্বাচনের শঙ্কা, ভোটের পরিবেশ ও সুষ্ঠু ভোটগ্রহণের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। সেখানে বিভিন্ন নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ওই শঙ্কা ও সংশয় বক্তব্যে উঠে আসে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সর্বোচ্চ সমন্বয় আছে জানিয়ে পুলিশের আইজি বলেন, এটা আমার জীবনে দেখা সর্বশ্রেষ্ঠ সমন্বয়। এ রকম সমন্বয় কখনো দেখিনি। নির্বাচনে টাকার লেনদেন ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে প্রচুর টাকা তোলা হচ্ছে। এগুলো কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিভিন্ন পরিবহনের মাধ্যমে টাকা লেনদেন হচ্ছে কী না তা দেখতে হবে। পরিকল্পিতভাবে গার্মেন্ট সেক্টরে উত্তপ্ত করে দেয়া হচ্ছে। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনে কিছু জঙ্গি সংগঠন রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করতে পারে। ভোটের মাঠেও রোহিঙ্গাদের ব্যবহার হতে পারে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের এসপিকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। আইজি বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা নির্বাচন বানচাল করার জন্য কয়েক হাজার ক্যাডার ঢাকায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব সংগঠন যেন কোনো ধরনের অপতৎরতা চালাতে না পারে সেজন্য সতর্ক থাকতে হবে। তিনি প্রস্তাব করে বলেন, নির্বাচনের মোবাইল নেটওয়ার্ক ফোরজি থেকে নামিয়ে টুজি করা এবং টেলিভিশনগুলো যেন সরাসরি (লাইভ) সম্প্রচার না করে সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

র‌্যাব ডিজি বলেন, নির্বাচনী সহিংসতায় দুজনের মৃত্যু বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এটা যাচাই করা হবে। ২০১৪ সালের মতো কোনো ঘটনা যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, সাইবার ওয়ার্ল্ড উত্তপ্ত করে গুজব ছড়িয়ে যাতে নির্বাচনী পরিবেশ বানচাল করতে না পারে সেদিকে সতর্ক অবস্থায় আছি। বিটিআরসির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছি। সভায় র‌্যাবের মহাপরিচালক আরো বলেন, মোবাইল নিয়ে কেন্দ্রে যাওয়া যাবে না। কেন্দ্রের অভ্যন্তরে ভোটকক্ষে কোনো ধরনের ছবি ও ভিডিও ধারণ করা যাবে না; এ বিধি-নিষেধ আরোপ করতে হবে। সাংবাদিকদের নির্বাচনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে যেন তেনভাবে কাউকে কার্ড না দিতে ইসির প্রতি অনুরোধ জানান র‌্যাব ডিজি। তিনি আরো বলেন, নির্বাচনে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের কার্যক্রম সর্তকতার সঙ্গে অবলম্বন করার জন্য বিশেষভাবে তাগিদ দেন। বৈঠকে তিনি ভোটের সময়ে তিন দিনের জন্য মোবাইল নেটওয়ার্ক ফোরজি থেকে নামিয়ে টুজিতে আনার প্রস্তাব করেন।

নির্বাচনে মোবাইল নেটওয়ার্ক ফোরজি থেকে টুজিতে নামিয়ে আনার একই প্রস্তাব করেন আনসারের মহাপরিচালক। তিনি বলেন, ভোটের সময়ে মিডিয়া কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করার নীতিমালা গ্রহণ করা যায় তা ভেবে দেখা দরকার।

সশস্ত্র বাহিনীর বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার বলেন, নির্বাচন কমিশন যে নিদের্শনা দেবে সেই অনুযায়ী আমরা কাজ করব। পাবর্ত্য এলাকায় ঝামেলা বিদ্যমান; সেখানের রিটার্নিং কর্মকর্তাকে সর্তক থাকতে হবে। নির্বাচনের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে ওই এলাকার জন্য হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখতে হবে।

ডিএমপি কমিশনার বলেন, গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নাম উল্লেখ না করে তারা বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানা সুযোগ নিয়ে নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। এ সুযোগে জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। ওই গোষ্ঠীটি নির্বাচনের প্রচারণা শুরুর পর তৎপর হয়ে উঠেছে। পুলিশকে ব্যস্ত রাখার কৌশলে নেমেছে। এমনকি দফায় দফায় ফোন দিয়ে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়িয়ে কাজে বিঘœ তৈরির চক্রান্তে নেমেছে। এরই মধ্যে তাদের ওই পরিকল্পনা ফাঁস হয়েছে; তাদের নথি আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে। মোবাইল ব্যাংকিং নির্বাচনের ৩ দিন আগে বন্ধ রাখতে হবে। মনিটরিং ও ট্রাকিং বন্ধ রাখতে হবে। নির্বাচনে সেনাবাহিনী আগামী ২৪ থেকে ১ জানুয়ারি পর্যন্ত মাঠে রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

একজন পুলিশ সুপার বলেন, ক্ষমতাসীন দলের বড় নেতাদের নির্বাচন করে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে মিশনে নেমেছে। দেশে গুপ্ত হত্যা ও খুন বেড়ে যেতে পারে। উত্থান ঘটতে পারে জঙ্গি চক্রের। ওই কর্মকর্তা কেন্ত্রে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ছাড়া কাউকে মোবাইল নিয়ে প্রবেশ না করতে ব্যবস্থা নিতে কমিশনকে অনুরোধ জানিয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, সাংবিধানিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সবাইকে বিবেকের কাছে জবাবদিহিতা করতে হবে।

নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনে সব দল ও প্রার্থীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়ম না মানলে সে যে দলেরই হোক তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। নির্বাচনে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের ব্যর্থতার কথা আমরা শুনতে চাই না।

নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বলেন, ঢাকা-১ আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থীকে আটক করা হলো। আমি কমিশনার হিসেবে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে ফোন করলাম, তিনি আমাকে জানালেন এ বিষয়ে অবগত নন। অথচ সভায় আপনার বলছেন, আগের চেয়ে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী। এ ধরনের কাজে সমন্বয়হীনতা কোনোভাবেই বরদাশত করতে পারি না।

নির্বাচন কমিশনান শাহাদাত হোসেন চৌধুরী বলেন, ভোটারদের ভোটদান ও প্রার্থীদের প্রচারণা নিশ্চিত করতে হবে।

পিডিএসও/হেলাল