হোতারা থাকেন দেশের বাইরে

স্বর্ণ চোরাচালানে ৭০ সিন্ডিকেট

প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:২৪

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে স্বর্ণ চোরাচালানে যুুক্ত রয়েছে ৭০ সিন্ডিকেট। এর মধ্যে ১০টি সিন্ডিকেট পরিচালিত হয় বিভিন্ন দেশ থেকে। তবে স্বর্ণ চোরাচালানের হোতারা দেশের বাইরেই থাকেন। তাদের সঙ্গে বিদেশিরাও এ ব্যবসায় জড়িত আছেন। আকাশ, স্থল ও সমুদ্র—তিন পথেই হয় স্বর্ণ চোরাচালান। চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ২৯ বিদেশিকে শনাক্ত করা হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ড সূত্রে জানা গেছে, দেশীয় ৬০টি সিন্ডিকেটের মধ্যে ৪০টি সরাসরি এবং ১২টি মানি এক্সচেঞ্জ কোম্পানি ও ৮টি ট্র্যাভেল এজেন্সি স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িত আছে। দেশ-বিদেশ মিলিয়ে পুরো স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের সঙ্গে জড়িত আছে অন্তত ৫৫৫ জন। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, ওমান, কুয়েতকেন্দ্রিক সিন্ডিকেটগুলো মধ্যপ্রাচ্য বা দুবাই সিন্ডিকেট নামে পরিচিত। আর পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, হংকং ও মিয়ানমার থেকেও সিন্ডিকেট পরিচালিত হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, স্বর্ণের চোরা কারবারিরা সংঘবদ্ধ এবং তাদের কর্মকাণ্ড বিস্তৃত। বেশ কয়েকজন রাঘববোয়াল গ্রেফতার আছে, পলাতকদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, স্বর্ণ চোরাচালানের বিষয়টি বহুপক্ষীয়। বিভিন্ন দেশের নাগরিকও এর সঙ্গে জড়িত। আর দেশীয় হোতারা মূলত দেশের বাইরে থাকেন। দেশে আসামাত্র তাদের গ্রেফতারের উদ্যোগ আছে আমাদের। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) মতে, চোরাচালান হয়ে আসা স্বর্ণের বড় অংশের গন্তব্যই ভারত। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ ঢালাওভাবে স্বর্ণ আমদানি নিষিদ্ধ করে ভারত সরকার। এ ছাড়া স্বর্ণ আমদানির ওপর ৬ শতাংশ শুল্ক তিন দফায় বাড়িয়ে তা ১০ শতাংশ ধার্য করে ভারত। ফলে আমদানির চেয়ে চোরাচালানের মাধ্যমে স্বর্ণের ব্যবসা করাই লাভজনক সেখানে।

বাজুস বলছে, দেশে প্রতিদিন কম করে হলেও ২৫ কোটি টাকার স্বর্ণ কেনাবেচা হয়। আর পুরনো গহনা, প্রবাসীদের নিয়ে আসা স্বর্ণ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক নিলাম করলে যে স্বর্ণ পাওয়া যায়, তা দিয়ে বাংলাদেশের ১০ হাজার জুয়েলার্সের চাহিদা পূরণ হয়। তবে এর সঙ্গে একমত নয় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। তাদের মতে, নিলাম, পুরনো গহনা ও প্রবাসীদের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আনা স্বর্ণ দিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। স্বর্ণ চোরাচালানের উল্লেখযোগ্য অংশ না হলেও একটা অংশ অবশ্যই দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবহার হয়।

স্বর্ণ চোরাচালানের হোতারা দেশের বাইরেই থাকেন। তাদের সঙ্গে বিদেশিরাও এ ব্যবসায় জড়িত আছেন। গোয়েন্দাদের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের পাঁচ, ভারতের ১৩, সিঙ্গাপুরের দুই, নেপালের এক ও পাকিস্তানের আট স্বর্ণ চোরাচালানির তথ্য আছে গোয়েন্দাদের কাছে। এ ছাড়া বিদেশে অবস্থান করে স্বর্ণ চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করা ১৪ বাংলাদেশির তথ্যও আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে।

আকাশপথে চোরাচালান হয়ে আসা স্বর্ণের বাহক, বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, মাঝারি ও মধ্যম সারির চোরা কারবারি গ্রেফতার হওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে তারা সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের নাগরিকের নাম বলেছে। এরা হলো—হাম্মাম আল হাবিব, রসুল আমিন জুব্বা, পিয়াস আল মারহাবি, রামাতুল ফারাজি, আনসার উল্লাহ জসিম।

ভারতের সিন্ডিকেট : গোয়েন্দা প্রতিবেদনে স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে যাদের নাম আছে তারা হলো—সুরেশ, আসিফ আহমেদ, অজিত, গোবিন্দ, বিজন হালদার, লক্ষ্মণ, গোপাল, কৃষ্ণ কুমার দাস, জুলহাস, রাতুল বাবু, কুমারজি, শ্যামল সাহা ও রামপাল।

সিঙ্গাপুরের সিন্ডিকেট : বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার চোরা কারবারিরা জিজ্ঞাসাবাদে সিঙ্গাপুরের দুই নাগরিকের বিষয়ে তথ্য দিয়েছে। তারা হলো সিন্ডিকেট এনডি ও স্টিফেন।

পাকিস্তানি সিন্ডিকেট : গোয়েন্দা প্রতিবেদনে পাকিস্তানের নাগরিকদেরও নাম আছে। তারা হলো আজমল হেলাল, মোহাম্মদ আলী, গিয়াস হাজারী, সোলায়মান, আবদুর রহিম জিন্নাহ, আসিফ মোর্শেদী, রাজ্জাক ও হামজা। মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে স্বর্ণের চোরাচালান পরিচালনা করে পাকিস্তানি সিন্ডিকেট।

নেপালি সিন্ডিকেট : বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জিজ্ঞাসাবাদে স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত নেপালের এক নাগরিকের সম্পর্কে তথ্য দেয়। তার নাম গৌরাঙ্গ রোসান।

বিদেশে বাংলাদেশি সিন্ডিকেট : মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে যেসব বাংলাদেশি স্বর্ণ চোরাচালান পরিচালনা করে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তাদের নাম উল্লেখ আছে। তারা হলোÑ মতিয়ার রহমান খলিল, রেজাউল করিম, মোহাম্মদ আলী, মাসুদ করিম, মিন্টু, হামীম, সোনা রফিক, নাছির, গোল্ডেন মনির, নিজাম, রেজাউল, রবিউল, দেলোয়ার ও এমরান হোসেন।

আকাশপথে চোরাচালানে হোতার সহযোগী হিসেবে সিভিল এভিয়েশন ও শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মী, পুলিশ, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার মাঠ কর্মকর্তা ও আনসার সদস্যদের নাম এসেছে একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। সবচেয়ে বেশি আছে বাংলাদেশ বিমানের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীদের নাম। পাইলট, কো-পাইলট, ফ্লাইট স্টুয়ার্ট, ফ্লাইট পার্সার, চিফ পার্সার, কেবিন ক্রু, এয়ারক্রাফট মেকানিক, সহকারী এয়ারক্রাফট মেকানিক, জুনিয়র টেকনিশিয়ান, শিডিউল বিভাগ, ক্লিনিং বিভাগ, ক্যাটারিং বিভাগ, অপারেশন ও ট্রেনিং বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম আছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্যানুযায়ী, বিমানের কর্মীরা প্রতি ১০ তোলার জন্য দেড় হাজার টাকা ঘুষ পায়।

স্থলপথের চোরাচালানের তিন ধাপ : বাংলাদেশ থেকে ভারতে স্বর্ণ চোরাচালানের পথ হিসেবে মূলত স্থল সীমান্তই ব্যবহার হয়। দুই দেশের সীমান্তে তাই সিন্ডিকেটের বিচরণ দেখা যায়। প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস এমনকি বাসও স্বর্ণ পাচারে ব্যবহার হয়।

যায় স্বর্ণ, আসে গরু, মাদক ও অস্ত্র : কুষ্টিয়া, যশোর, সাতক্ষীরা, আখাউড়া, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে চোরাচালানের অর্থ পরিশোধ হয় স্বর্ণের বার দিয়ে। বাংলাদেশ থেকে যায় স্বর্ণ। আর ভারত থেকে আসে গরু, মাদক আর অস্ত্রের চালান।

মিয়ানমার থেকেও আসে স্বর্ণ : মিয়ানমার থেকে আসা স্বর্ণ মূলত মোটা স্বর্ণ নামে পরিচিত। টেকনাফের একাধিক পয়েন্ট দিয়ে এই স্বর্ণ বাংলাদেশে আসে। আর চোরাচালান হয়ে আসা এই স্বর্ণের গন্তব্যও ভারত। বিজিবি ও কোস্টগার্ডের সূত্রগুলো জানায়, মিয়ানমার-সংলগ্ন টেকনাফের সীমান্ত পয়েন্টগুলো দিয়ে শুধু ইয়াবাই আসে না, স্বর্ণের চালানও আসে। সীমান্তের এপার-ওপার পয়েন্টগুলো হলো—জাদীমোড়া-ফেরাংপুর ঘাট, জাদীমোড়া-মাঙ্গালা ঘাট, জাদীমোড়া-রইংগ্যা ঘাট, জাদীমোড়া-গওজিবিল ঘাট। মিয়ানমার-টেকনাফ, চট্টগ্রাম ও ভারতভিত্তিক অন্তত ৫টি সিন্ডিকেট স্বর্ণ চোরাচালানে যুক্ত।

পিডিএসও/হেলাল