অভিনব প্রতারণা : বিয়ে করে টাকা হাতানোই তার কাজ

প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:৪১

শরীফুল রুকন, চট্টগ্রাম

প্রতারণা করে একের পর এক বিয়ে করে আসছেন এক সুন্দরী তরুণী। এরইমধ্যে তার তিনটি বিয়ের খোঁজ মিলেছে। কিন্তু কারো সঙ্গেই ঘরসংসার করেননি। করতেও চাননি। কেননা, তিনি বিয়ে করেন বিশেষ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। সে উদ্দেশ্যটা হলো, স্বামীর টাকা হাতিয়ে নেওয়া। আর সেটি পূরণ হলে বা পূরণ করার জন্য তিনি স্বামীকে তালাক দেন, ছেড়ে চলে যান। ইসলাম ধর্মের রীতি অনুযায়ী, বিয়ের আগে ও পরে প্রত্যেক পুরুষের কাছ থেকে দেনমোহর বাবদ ওই তরুণী নির্দিষ্ট অর্থ আদায় করেন। এরপর যৌতুক ও নারী নির্যাতন আইনের মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে তিনি মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযুক্ত জয়তুন আকতার (২৫) চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন কুলগাঁও টেনারী বটতল এলাকার মো. সেলিমের মেয়ে। স্কুলের গণ্ডি শেষ না করা জয়তুন সর্বশেষ গত ১০ মে বিয়ে করেন রাঙামাটির লংগদু থানাধীন মাইনিমুখ

বড় কলোনি এলাকার মিরাজ আলীর ছেলে খলিলুর রহমানকে (৩২)। বিয়ের পর তারা নগরের কুলগাঁও স্কুলের পাশের একটি ভবনে ভাড়ায় বসবাস শুরু করেন। তবে খলিলের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করতে নারাজ জয়তুন। এরইমধ্যে বিয়ের ১৫ দিন পর গত ২৫ মে জয়তুনকে নিয়ে যান তার মা জোহরা খাতুন।

এরপর তাকে ফিরিয়ে আনতে গেলে খলিলকে শর্ত দেওয়া হয়, জয়তুনদের নির্মাণাধীন ভবনের তৃতীয়তলার পুরো কাজ করে দিতে হবে। নয়তো তালাক দেওয়ার পাশাপাশি মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হবে। পাঁচ লাখ টাকার দেনমোহর দিয়ে বিয়ে করেছিলেন পেশায় কাঠমিস্ত্রি খলিলুর রহমান। এরমধ্যে ৫০ হাজার টাকার স্বর্ণসহ আড়াই লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন তিনি। এখন প্রতারণার এই ফাঁদে পড়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত খলিলুর রহমান।

এদিকে খলিলকে বিয়ে করার সময় নিকাহনামায় জয়তুনকে ‘কুমারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, এর আগে ২০১২ সালের ২৭ মে কুলগাঁও এলাকার শাহাবউদ্দিন নামের এক তরুণের সঙ্গে জয়তুনের বিয়ে হয়। শাহাবউদ্দিনের সঙ্গে বিয়ের সময় নিকাহনামায় উল্লেখ করা ছিল জয়তুন আকতার ‘তালাকপ্রাপ্ত নারী’। অর্থাৎ এর আগেও জয়তুনের একবার বিয়ে হয়েছিল। কমপক্ষে তিনবার জয়তুনের বিয়ে হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন নগরের জালালাবাদ ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার ও কাজী মাওলানা ওসমান গনি।

দণ্ডবিধির ৪৯৫ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয় বা পরবর্তী বিয়ে করার সময় প্রথম বা আগের বিয়ের তথ্য গোপন রাখেন, তা যদি দ্বিতীয় বিবাহিত ব্যক্তি জানতে পারেন, তাহলে অপরাধী ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।

এদিকে জয়তুনের টাকা হাতানোর পদ্ধতি সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ২৭ আগস্ট সাবেক স্বামী শাহাবউদ্দিনের বিরুদ্ধে দুই লাখ টাকা যৌতুক দাবিতে মারধরের অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন জয়তুন। কথিত মারধরের ঘটনাটি ঘটেছে মামলা দায়েরের প্রায় এক বছর আগে ২০১৪ সালের ৪ আগস্ট রাত ১টায়। আর ওই মামলায় জয়তুনের পাশাপাশি সাক্ষ্য দিয়েছেন শুধুই তার বাবা ও মা। মামলার পর বিদেশে পালিয়ে যান শাহাবউদ্দিন, যার কারণে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে ২০১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর শাহাবউদ্দিনের বিরুদ্ধে মোহরানা ও খোরপোশ আদায়ের আরো একটি মামলা করেন জয়তুন। ওই মামলায় তিন লাখ টাকা মোহরানাসহ ৯ লাখ ৭৮ হাজার টাকা দাবি করা হয়। গত ৮ মার্চ একতরফা রায়ে শাহাবউদ্দিনকে ৫ লাখ ১৫ হাজার টাকা দিতে নির্দেশ দেন চট্টগ্রামের পারিবারিক জজ আদালতের বিচারক ফাতেমা বেগম মুক্তা।

ভুক্তভোগী খলিলুর রহমান বলেন, মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার আগ্রহের কথা আমার এক আত্মীয়কে জানিয়েছিলেন জয়তুনের মা। এরপর জয়তুনকে দেখে আমার পছন্দ হয়। তারাও আপত্তি না করায় বিয়ে হয়। এখন দেখছি আমি ফেঁসে গেছি। জয়তুনের বাবা সেলিম একসময় ফার্নিচার দোকানে কাজ করলেও এখন কিছু করেন না। তার ছোট এক ভাই ও এক বোন আছে। তারাও আয় করে না, পড়াশোনা করে।

তিনি বলেন, আমি নিশ্চিত জয়তুন তিনটির বেশি বিয়ে করেছে। বিয়ের নামে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নিয়ে আট কক্ষের দোতলা বাড়ি করেছে তারা। গত শনিবার এসব তথ্য তুলে ধরে আমি বায়েজিদ বোস্তামী থানায় অভিযোগ করেছি।

অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য গতকাল সোমবার বিকেলে জয়তুন আকতার ও তার মা জোহরা খাতুনের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরে জয়তুনের বাবা মো. সেলিমকে ফোন করা হলে তিনি অভিযোগের বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি, পরে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

জানতে চাইলে বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি আতাউর রহমান বলেন, প্রতারণার ফাঁদ পেতে ছেলেদের বিয়ে করে জয়তুন মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে একটি অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

পিডিএসও/হেলাল