অভিযানে চার মাসে নিহত ২৪৪

ধরা পড়ে না শীর্ষ মাদক চোরাকারবারিরা

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:৩২ | আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:৫৪

জুবায়ের চৌধুরী

মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযানের চার মাস পূর্ণ হলো। এই সময়ে দেশজুড়ে ৫০ হাজারেরও বেশি মাদকসেবী ও কারবারি গ্রেফতার হয়েছে। এসব অভিযানে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন ২৪৪ জন ‘মাদক কারবারি’। তবু থামেনি মাদকের চোরাচালান। এখনো মাদক আসছে বিভিন্ন পথে। মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে ধরা পড়া বেশিরভাগই মাদকসেবী ও খুচরা বিক্রেতা। অথচ দেশে মাদকের ভয়াবহতা ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে দায়ী মাদক চোরাকারবারের হোতারা থাকছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাদক সরবরাহ সাময়িকভাবে কমলেও এটি নির্মূলে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই। তাছাড়া খুচরা কারবারিদের পাশাপাশি মূল হোতাদের ধরতে না পারলে অভিযানের মূল লক্ষ্য ব্যাহত হবে বলেও মনে করেন তারা। তাই মাদকের হোতাদের ধরতে অভিযান চালানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন বিশেষজ্ঞরা। জানা যায়, প্রতিটি জেলা ও মাদক স্পটের শীর্ষস্থানীয় কারবারিরা এখনো গ্রেফতার হয়নি। এ কারণে বন্ধ হয়নি মাদক কারবারও।

এদিকে, মাদকবিরোধী অভিযানে যাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে তাদের বেশিরভাগই মাদকসেবী ও খুচরা বিক্রেতা। এদের মধ্যে খুচরা বিক্রেতারাও মাদকসেবী। এমন দুই ধরনের অপরাধীর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। অথচ দেশের কোনো কারাগারে নেই মাদকাসক্ত রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা। নেই মাদকাসক্ত লোকজনের পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগও।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৯, ১০, ১১ ও ১৯ ধারায় লাইসেন্স ছাড়া মাদকদ্রব্য বহন ও ব্যবহার করলে বিভিন্ন ধরনের শাস্তির বিধান আছে। তবে শুধু সেবনের কারণে গ্রেফতারের বিধান নেই। যদিও গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মাদক বহনের অভিযোগ আছে। একই আইনের ১৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, মাদকাসক্ত লোকজনকে চিকিৎসার আওতায় নেওয়া যাবে। একই ধারায় বলা আছে, সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কারাগার ও অন্যান্য হাসপাতালকে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকাসক্তি মস্তিষ্কের একটি রোগ। এর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন। তাই মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন তারা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল অবশ্য বলেছেন, আমরা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছি। শুধু অভিযান চালিয়ে পুরোপুরি সফলতা সম্ভব নয়। মাদকের বিরুদ্ধে সবখানে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। অভিযানের পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসাও দিতে হবে।’ সমাজের সবার মধ্যে সচেতনতা জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্যমতে, গত ১৮ মে থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মাদকবিরোধী অভিযানে ৫১ হাজার ২২৫ মাদকসেবী ও ‘মাদক ব্যবসায়ীকে’ গ্রেফতার করা হয়েছে। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার তথ্য অনুযায়ী, ৪ মে থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত র‌্যাব দুই হাজার ৭৫৬টি অভিযানে তিন হাজার ৭৩৮ জনকে গ্রেফতার করেছে। ওই সময়ে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ৯০৪টি অভিযানে আট হাজার ১৯৫ জনকে দন্ড দিয়েছেন। এদের মধ্যে ছয় হাজার ১৩২ জন মাদকসেবী, আর কারবারি মাত্র এক হাজার ৬৩ জন। এই হিসাবে র‌্যাবের গ্রেফতার করা মোট ১১ হাজার ২৩৩ জনের মধ্যে প্রায় ৫৬ শতাংশই মাদকসেবী। আর ভ্রাম্যমাণ আদালতে দন্ডিতদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই মাদকসেবী। গড় হিসাবে, গ্রেফতার করা আসামিদের প্রায় ৭০ শতাংশই মাদকাসক্ত। একইভাবে পুলিশের গ্রেফতার করা ৩৭ হাজার ২২৫ জনের মধ্যে ২৬ হাজারেরও বেশিই মাদকাসক্ত।

শীর্ষ কারবারিরা অধরা : গোয়েন্দা তালিকা সূত্রে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে, ঢাকাসহ সারা দেশের বড় মাদক কারবারিদের এখনো গ্রেফতার করা যায়নি। প্রতিটি অঞ্চলের শীর্ষ ১০ কারবারির বেশির ভাগই অধরা। তবে ঢাকায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে রূপনগরের শীর্ষস্থানীয় মাদক কারবারি নজরুল ইসলাম সর্দার ওরফে নজু, জেনেভা ক্যাম্পের শীর্ষস্থানীয় কারবারি নাদিম ওরফে পচিশ, তেজগাঁও সাততলা বস্তির সন্ত্রাসী কামরুল, দক্ষিণখানের খুচরা মাদকবিক্রেতা খুকু সুমন। এ ছাড়া ভাসানটেকে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় আতাউর রহমান ওরফে আতাবর ওরফে আতা, ভাসানটেকের ফারুক ইসলাম ওরফে বাপ্পি ও মোস্তফা হাওলাদার ওরফে মোস্তফা কসাই। এদের মধ্যে আতা বড় কারবারি। গত ৭ জুন মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের শীর্ষ কারবারি ফারজানা আক্তার পাপিয়া ও তার স্বামী পাচুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তবে এই ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক কারবারি ইশতিয়াক ও নাদিম ওরফে পচিশকে গ্রেফতার করা যায়নি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুই দফার অভিযানে যারা ধরা পড়েছে তাদের মধ্যে তালিকাভুক্ত কারবারি নেই। অথচ রাতে ক্যাম্পের পাশে চুয়া সেলিম, ওসমান, আমিন, সুলতান, মনসুরের গলির জুম্মন, জামিলসহ কয়েকজন ইয়াবা বিক্রি করছে। ঢাকায় পৃষ্ঠপোষক ও নিয়ন্ত্রক হিসেবে শতাধিক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে গোয়েন্দা তালিকায়। উত্তরার ফজলুল করিম, মহসিন, বনানীর বড় বাজার কড়াইল বস্তির নিয়ন্ত্রক বাবা কাশেম, কাওলার টিটু, বাড্ডার রিয়াদ উল্লাহ, মোশাররফ হোসেন ওরফে পিচ্চি মোশাররফ, সাব্বির হোসেন, খিলক্ষেতের ব্যাপারীপাড়ার নাজমা ইসলাম, ক্যান্টনমেন্টের মাটিকাটার জামাল সরদার, তুরাগের রেজাউল, বাসাবোর সাফিয়া আক্তার শোভাসহ শীর্ষ কারবারিরা এখনো অধরাই আছে। তারা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ইয়াবার কারবার চালাচ্ছে বলে গোয়েন্দা সূত্র জানায়।

জানা গেছে, ১৮টি স্পটের চিহ্নিত মাদক কারবারিরা গা ঢাকা দিয়েছে। এখন তারা মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন বিক্রি করছে। জেনেভা ক্যাম্পের চুয়া সেলিম, ওসমান, আমিন, সুলতান, মনসুরের গলির জুম্মন, জামিলসহ কয়েকজন ইয়াবা বিক্রি করছে। কেরানীগঞ্জের পশ্চিম আগানগরের শীর্ষ ইয়াবা কারবারি মামুন এবং ধামরাই বাউখন্ডের আবুল হোসেন ওরফে আজিজ মিয়াও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

জানা গেছে, ইয়াবার সবচেয়ে বড় ‘ডিলার’ টেকনাফের হাজি সাইফুল করিম, এমপি আবদুর রহমান বদির খালাতো ভাই মংমং সেন, বদির ভাই মৌলভী মুজিবুর রহমান, আবদুস শুক্কুর, ফয়সাল, সফিক ওরফে শফি, ভাগ্নে সাহেদুর রহমান নিপু এবং মৌলভীপাড়ার একরাম, শাহজাহান চেয়ারম্যান, নাজিরপাড়ার এনাম মেম্বর ও মৌলভী ভুট্টোও গা ঢাকা দিয়েছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরবাগডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান ও মাদকের ‘গডফাদার’ শাহিদ রানা টিপু ওরফে টিপু সুলতান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক নম্বর মাদক কারবারি রতন মিয়া, চট্টগ্রামের হালি শহরের রেজাউল করিম, ফরিদপুরের ফাইসুর ওরফে পাভেল, সামর্থ্য বেগম; গাজীপুরের টঙ্গীর শীর্ষ দুই মাদক কারবারি বাচ্চু ও স্বপন; কিশোরগঞ্জের খায়রুন্নেসা ওরফে খায়রুনী; নারায়ণগঞ্জের শীর্ষস্থানীয় ইয়াবা কারবারি বজলুর রহমান ওরফে বজলু মেম্বর; নরসিংদীর ইলিয়াস মিয়া ওরফে ডাকু ইলিয়াস, নাসির; রাজবাড়ীর আনিচুর রহমান সেলিম ওরফে চাচা সেলিম এবং টাঙ্গাইলের মোস্তফা কামাল প্রশাসনের নজর এড়িয়ে আছে।

এদিকে, প্যাথেড্রিন, ফেনসিডিল, ইয়াবা প্রাণঘাতী এসব মাদকদ্রব্য কয়েক দশক ধরেই ঢুকছে দেশের সীমানায়। মাদকসেবীর সংখ্যাও বাড়ছে দিনকে দিন। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্য বলছে, ২০০৫ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে ২৩৯ ইয়াবা। এক যুগের ব্যবধানে তা বেড়ে কোটির অঙ্ক ছাড়ায়। ২০১৮ সালের প্রথম ছয় মাসেই এই সংখ্যা ৪ কোটি ৭৩ লাখের বেশি। এ বছরের ৪ মে মাদক নিয়ন্ত্রণে অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার মাসে এসব অভিযানে নিহত হয়েছে ২৪৪ জন। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর বলছে, দেশের সীমান্ত এলাকা এখনো পুরোপুরি নজরদারিতে আনা সম্ভব হয়নি। যে কারণে মাদকদ্রব্যের চোরাচালানও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

এতদিন প্রতিবেশী দেশের মধ্য দিয়েই বেশিরভাগ মাদকদ্রব্য এলেও, সম্প্রতি বিমানবন্দরে ধরা পড়েছে পূর্ব আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ার মাদক ‘খাথ’। যার আরেক নাম নিউ সাইকোট্রপিক সাবসটেন্সেস (এনপিএস)। এটি ইয়াবার চেয়েও ভয়ংকর। গত ৩১ আগস্ট দেশে এই মাদকের প্রথম অস্তিত্ব মেলে। ওইদিন শাহজালাল বিমানবন্দর ও শান্তিনগর থেকে ৮৬১ কেজি ওজনের মাদকের একটি বড় চালান জব্দ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)। ওই চালনটিও ইথিওপিয়া থেকে জিয়াদ মোহাম্মাদ ইউসুফ ঢাকায় পাঠান। এ দেশে নওয়াহিন এন্টারপ্রাইজ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের নামে চালানটি পাঠানো হয়। এ ঘটনায় নাজিম নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর গত ৮ সেপ্টেম্বর ১৬০ কেজি এনপিএস জব্দ করে ডিএনসি। নতুন এই মাদক নিয়ে রীতিমতো আতঙ্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো।

ডিএনসির গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক নজরুল ইসলাম শিকদার বলেন, এনপিএস দেখতে অনেকটা অনেকটা ‘গ্রিন টি’র মতো। এক ধরনের গাছ থেকে তৈরি হয়ে থাকে। এটি ‘খ’ ক্যাটাগরির মাদক। তিনি বলেন, এনপিএস মূলত চিবিয়ে বা পানিতে গুলিয়ে চায়ের মতো খাওয়া হয়। খাওয়ার পর ইয়াবার মতোই ক্লান্তি না আসা, ঘুম না হওয়াসহ শারীরিক বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এনপিএস আসক্ত ব্যক্তি মানসিক বৈকল্যে ভোগেন। বেঁচে থাকা তার কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। একসময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

পিডিএসও/হেলাল