দুর্নীতিবাজদের বাজেয়াপ্ত সম্পদ ব্যবহারের চিন্তা

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:০৭ | আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০:১৫

জুবায়ের চৌধুরী

দুর্নীতিলব্ধ অর্থ-সম্পদ আদালত কর্তৃক রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হয়। মামলা বিচারাধীন অবস্থায়ও দুর্নীতিলব্ধ অর্থ-সম্পদ জব্দ হয়। কিন্তু বাজেয়াপ্ত সম্পদ ভোগ-দখল করতে পারে না রাষ্ট্র। স্থাবর সম্পদগুলোর নিয়ন্ত্রণ কাগুজে পন্থায় চলে যায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসকের জিম্মায়। আর নগদ অর্থ ব্যাংকেই পড়ে থাকে ‘জব্দ’ অবস্থায়। জব্দ হওয়া এই সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে হলেও রাষ্ট্র তা ব্যবহার বা কাজে লাগাতে পারে না। এর ফলে বিনষ্ট হয় কিংবা অব্যবহৃত থেকে যায় হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেয়াপ্ত সম্পদ।

অন্যদিকে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় দুর্র্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে বটে, কিন্তু সংস্থাটি রায়ের একটি কাগজ ছাড়া কিছুই পায় না। রায়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের কার্যকর মালিকানা প্রতিষ্ঠা, ভোগ-দখল, সসম্পদের যথাযথ ব্যবহার ও ভোগ-দখল নিশ্চিত হলো কি না, তা দেখারও কেউ নেই। অনেক সময় জব্দ করা সম্পদ বেহাতও হয়ে যায়। ফলে রাষ্ট্রের সম্পদ রাষ্ট্র যাতে ব্যবহার কিংবা খরচ করতে পারে, এমনই একটি উদ্যোগ নিচ্ছে দেশের দুর্নীতি নজরদারির একমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্র্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুর্নীতিবাজদের বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে ভোগ-দখলের লক্ষ্যে গঠন করা হচ্ছে ‘অ্যাসেট রিকভারি ও ম্যানেজমেন্ট ইউনিট।

দণ্ডিত মামলায় বাজেয়াপ্ত সসম্পদ এবং বিচারাধীন মামলায় জব্দ থাকা সম্পত্তির ভোগ-দখল ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রসঙ্গে দুদকের মহাপরিচালক (লিগ্যাল ও প্রসিকিউশন) মঈদুল ইসলাম জানান, বিধান অনুযায়ী দুর্নীতি মামলায় রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হওয়া অর্থ-সম্পদের বৈধ মালিক রাষ্ট্র। এ অর্থ-সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের একচ্ছত্র মালিকানা। রাষ্ট্র তার প্রয়োজনে সম্পদ নিজে ভোগ-দখল, বিক্রি কিংবা ইজারা দিতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দুর্নীতি মামলায় বিচারে দণ্ডিত দুর্নীতিবাজের অর্থ-সম্পদের ওপর রাষ্ট্র পায় কাগুজে মালিকানা। প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্র এ অর্থ-সম্পদ ভোগ-দখল করতে পারছে না। প্রয়োজনে কাজেও লাগাতে পারছে না। এমনকি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হওয়া অর্থ-সম্পদ দৃশ্যত দণ্ডিত ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণেই থাকছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা পড়ছে না। ফলে দুর্নীতি মামলায় দোষী ব্যক্তির দণ্ডের কার্যকারিতা থাকছে না। এতে দুদকের কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে। এ বাস্তবতা থেকেই কমিশন ‘অ্যাসেট রিকভারি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ইউনিট’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। দুদক মহাপরিচালক বলেন, এ ইউনিট চালুর জন্য দুদক আইনের সংশোধনীরও প্রয়োজন নেই। প্রচলিত দুদক আইনেই তা গঠনের চিন্তা করছে সংস্থাটি।

দুদক সূত্র জানায়, গত তিন বছরে ১ হাজার ১৫৭টি দুর্নীতি মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে শাস্তি হয়েছে ১৮৯টি মামলার। দুর্র্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে সাজা পেয়েছে ১ হাজার ৪৭ জন আসামি। তাদের জেল-জরিমানা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে দুর্র্নীতিলব্ধ ৭৮৩ কোটি টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর বিরুদ্ধে জরিমানালব্ধ ২১ কোটি টাকাও রয়েছে। আরও আছে বিএনপি নেতা ও ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ১০ কোটি ৫ লাখ ২১ হাজার টাকার সম্পত্তি। একই ব্যক্তির রাজধানীর গুলশান-২ নম্বরে ৫ কাঠা প্লটের ওপর ছয়তলা ভবন, রূপগঞ্জে ১০০ একরের বেশি কৃষি জমিও রয়েছে। দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত বিএনপি নেতা ও কৃষিবিদ জাভেদ ইকবালের রয়েছে নগদ ২৫ কোটি টাকা।

আদালতের রায়ের পর এসব অর্থের আইনগত বৈধ মালিক রাষ্ট্র। অথচ এসব অর্থ কখনো সরকারের ট্রেজারিতে জমা হয় না। দণ্ডিত আসামিদের অ্যাকাউন্টেই এখন পর্যন্ত ‘জব্দ’ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এভাবেই অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে শত শত কোটি টাকা। এর বাইরে বিচারাধীন দুর্নীতির মামলার কারণে আর আইনি জটিলতায়ও বিনষ্ট হচ্ছে শত কোটি টাকার জব্দ করা সম্পদ। ইতোমধ্যে অনেক সম্পদ হয়ে গেছে হাতছাড়া। দুদকের মতে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার অভাবেই কোটি কোটি নগদ টাকা ও শত শত কোটি টাকার সম্পদগুলো বিনষ্ট হচ্ছে।

বিনষ্ট হচ্ছে শত শত কোটি টাকার সম্পদ : বিচারাধীন মামলায় জব্দ থাকা শত শত কোটি টাকার সম্পদও বিনষ্ট হচ্ছে। এসব সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে প্রশাসক নিয়োগ করা হলেও সেগুলো পরিচালনার মধ্যেও দুর্র্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সম্পদের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না। ফলে তা অকেজো হয়ে পড়েছে। আবার কিছু সম্পদ বেহাতও হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়াও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে বহু সম্পদ।

দুদক সূত্রমতে, বহুল আলোচিত এমএলএম কোম্পানি ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের রয়েছে কয়েকশত কোটি টাকার সম্পদ। রাজধানীর ফার্মগেটে ‘আনন্দ’ ও ‘ছন্দ’ নামে দুটি সিনেমা হল, একই প্রতিষ্ঠানের বেস্টএয়ারের একটি উড়োজাহাজ কক্সবাজার বিমানবন্দরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। রাজবাড়ীতে রয়েছে নিহার জুট মিল। কুমিল্লার বুড়িচং দয়ারামপুর এলাকায় সিলগালা অবস্থায় ‘বন্দীশাহী কোল্ড স্টোরেজ’ এবং একটি পুকুর। রাজধানীর কাকরাইলে ১৭ বিঘার একটি প্লট। শত কোটি টাকা মূল্যের এ প্লটে ‘রোজা প্রপার্টিজ’র সাইনবোর্ড ঝুলছে। দৈনিক বাংলা মোড়ে রয়েছে এক বিঘার একটি প্লট। এতে বিএনএস গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএনএইচ বুলু মালিকানা দাবি করে সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছে।

এদিকে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ডেসটিনির কেনা ১৩০০ বিঘা জমি দেখভাল করার মতো আইনানুগ কেউ না থাকায় স্থানীয়রা মাটি কেটে নিয়ে গেছে। এ ছাড়া বরিশাল ও খুলনায় রয়েছে দুটি ভবন। রাজশাহীর বর্ণালী সিনেমা হল, বান্দরবনে সুয়ালক, রাজবিলা, লামার ফাঁসিয়াখালী, ইয়াংছা, আজিজনগর, ফাইতং এলাকায় রয়েছে ৮৩৫ একর জমির ওপর ৩৪টি বাগান। ডেসটিনির ৫৩৩টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জব্দ অবস্থায় রয়েছে নগদ ১৫০ কোটি টাকা। ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে এ অর্থও নানাভাবে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া বিচারাধীন মামলায় ‘হলমার্ক গ্রুপে’র শত শত কোটি টাকার সম্পদও বিনষ্ট হচ্ছে অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে থেকে। ঢাকার অদূরে সাভারসহ বিভিন্ন জায়গায় ২২৭ বিঘা জমি রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। তাদের নির্মাণাধীন কিছু ভবনও রয়েছে। যার মূল্য প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। আর রাষ্ট্রায়ত্ব সোনালী ব্যাংকে হলমার্ক গ্রুপের বন্ধকি সম্পদ রয়েছে ২ হাজার কোটি টাকার। বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের মালিকানা দাবি করলেও দুদকের ১৬টি মামলার আলামত হিসেবে সম্পদগুলো জব্দ অবস্থায় রয়েছে। সাভারের হেমায়েতপুর, হেমায়েতপুর-সিঙ্গাইর রোডের তেঁতুলঝোড়া ব্রিজের দুই পাশে অবস্থিত হলমার্কের এসব সম্পদ দেখভালের অভাবে বিনষ্ট প্রায়। নির্মাণাধীন ভবনগুলো এখন মাদকসেবীদের নিরাপদ আখড়ায় পরিণত হয়েছে। দুদক দুর্নীতি মামলায় বাজেয়াপ্ত হওয়া এসব সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে ভোগ-দখলের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যেই দুদকের উদ্যোগে গঠিত হচ্ছে ‘অ্যাসেট রিকভারি ও ম্যানেজমেন্ট ইউনিট’। এটি কার্যকর হলে দুর্নীতিবাজদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত হওয়া নগদ অর্থ কিংবা সম্পদ ব্যবহার করতে পারবে সরকার।

পিডিএসও/হেলাল