মাজার জিয়ারত করে ছিনতাই করেন তারা!

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০১৮, ০০:২৮ | আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০১৮, ১০:১৫

শরীফুল রুকন, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামের দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারীদের অন্যতম নিয়ন্ত্রক নুরুল আলম ওরফে হামকা নুর আলম। তার নিজ নামে বাহিনীও আছে। তার গ্রুপের সদস্যরা সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলে করে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন সড়কে যাত্রীবেশে ঘুরে বেড়ায়। সুযোগ পেলেই ছুরিসহ বিভিন্ন অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে পথচারী ও যাত্রীদের সর্বস্ব কেড়ে নেয়। এদের সঙ্গে কয়েকজন অটোরিকশার চালকও জড়িত। তবে অবাক করা বিষয়, ছিনতাইকারী চক্রটির সদস্যরা অপকর্ম যা-ই করুক তার আগে কোনো একটা ‘মাজারকে’ সালাম কিংবা জিয়ারত করে নেয়।

মাজার বলতে সাধারণত আউলিয়া-দরবেশগণের সমাধিস্থলকে বোঝায়। বারো-আউলিয়ার মাজার থাকার কারণে চট্টগ্রাম মাজারের শহর হিসেবে খ্যাত। অনেকেই মাজারে এসে সরল বিশ্বাসে আল্লাহর কাছে সাহায্য, আশ্রয় ও পাপমুক্তি প্রার্থনা করেন।

পুলিশ সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে অন্তত আটটি পেশাদার ছিনতাই চক্র সক্রিয়। এর মধ্যে শুধু হামকা নুর আলমের গ্রুপের সদস্যরা সবসময় ছিনতাই করার আগে মাজারকে সালাম অথবা জিয়ারত করতে যায়। তাদের পছন্দের একমাত্র কোনো মাজার নেই। ছিনতাইয়ের স্পটের আশপাশে যে মাজারটির অবস্থান, সেখানেই তারা যায়। তবে তারা নগরের শাহ আমানত (রহ.) মাজারে বেশি যেতে চেষ্টা করে।

ছিনতাইয়ের আগে মাজারে যাওয়ার তথ্য গত ৩১ জুলাই চট্টগ্রাম আদালতে ১৬৪ ধারায় দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও দিয়েছেন হামকা নুর আলমের সেকেন্ড ইন কমান্ড নিজাম উদ্দিন। গত ১৪ জুন সকালে পাঁচলাইশ এন মোহাম্মদ কনভেনশন সেন্টারের সামনে এক ব্যক্তির কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় নিজামকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ।

পাঁচলাইশ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ওয়ালী উদ্দিন আকবর বলেন, ছিনতাই করার আগে সবসময় মাজারে যান চট্টগ্রামের বেশকিছু ছিনতাইকারী। তাদের দলনেতা হামকা নুর আলম। মাজারকে সালাম কিংবা জিয়ারত করে তারপর ছিনতাইয়ে নামার প্রবণতা হামকা নুর আলমের গ্রুপ ছাড়া অন্য কোনো গ্রুপে দেখা যায়নি। ছিনতাই করার আগে এক ধরনের প্রশান্তি পেতে তারা এই কাজটি করে। এদিকে দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারীদের নেতা হামকা নুর আলম বর্তমানে চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দি। তার বিরুদ্ধে রয়েছে অন্তত ৩৫টি মামলা। পাঁচলাইশ থানা পুলিশের হাতে গ্রেফতারের পর গত এক বছর ধরে তিনি কারাবন্দি আছেন। তবে কারাগারে থাকলেও শিষ্যরা তাকে নিয়মিত টাকা পাঠান। গত ১৪ জুন পাঁচলাইশে পাঁচ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের পর ৫০ হাজার টাকা কারাগারে হামকা নুর আলম ও জাহাঙ্গীরের কাছে পাঠিয়েছে তার অনুগতরা। আদালতে হাজিরা দিতে এসে নুর আলম ও জাহাঙ্গীর ছিনতাইকারীদের নানা দিকনির্দেশনা দেয়। কথা অমান্য করলে অনুগতদের বিপদেও ফেলে তারা। জবানবন্দিতে এসব তথ্য দিয়েছেন সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া নিজাম উদ্দিন।

আদালতে নিজাম জানায়, গত ১৪ জুন সকালে ইব্রাহিমের সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে সে, মনির ও মিঠু বিবিরহাট মাজারের সামনে যায়। সেখানে আমির হোসেন ও শহীদ আগে থেকে একটি সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে তাদের অপেক্ষায় ছিল। এরপর তারা সবাই মাজারকে সালাম করে দুটি সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে বহদ্দারহাট কাশবন হোটেলের সামনে যান। এরপর তারা ছিনতাইয়ের জন্য যাত্রী খোঁজা শুরু করেন। সে সময় ইব্রাহিম ও আমির তাদের সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে ওই এলাকায় দু-তিনটি চক্কর দেয়।

সে সময় কাশবন হোটেলের সামনে এক লোক আমিরের অটোরিকশাকে থামার সংকেত দেয়। দরদাম করে লোকটি আমিরের গাড়িতে উঠে মুরাদপুরের দিকে যাওয়া শুরু করে। তখন পেছনে আরেকটি অটোরিকশায় ছিল চার ছিনতাইকারী। এন মোহাম্মদ কনভেনশনের সামনে এসে আমিরের গাড়ি থেমে যায়। তখন গুলি করার ভয় দেখিয়ে ওই লোকের কাছে থাকা টাকার ব্যাগটি কেড়ে নেয় তারা। এরপর ফ্লাইওভারে উঠে লালখানবাজার নেমে রেডিসন হোটেলের সামনে লোকটিকে নামিয়ে দিয়ে ছিনতাইকারীরা চলে যায়।

পুলিশ সূত্র জানায়, কয়েক মাস আগে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় পুলিশি অভিযানে পেশাদার অনেক ছিনতাইকারী গ্রেফতার হয়েছেন। যে কারণে এখন ছিনতাইয়ের ঘটনা একেবারে কমে এসেছে। বর্তমানে দুর্ধর্ষ ২৯ ছিনতাইকারী চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দি আছে। হামকা নুর আলম, জাহাঙ্গীর ও হাশেম- এই তিনজন বর্তমানে কারাগারে। তারা মুক্তি পেলে ছিনতাই বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান বলেন, পেশাদার ছিনতাইকারীদের অনেকেই গ্রেফতার হয়েছে। অন্যদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা হচ্ছে। পুলিশি টহলও জোরদার রয়েছে। এবার কোরবানির পশুর বাজারে ছিনতাইয়ের খবর পাওয়া যায়নি।

পিডিএসও/রিহাব