তবুও থামছে না ইয়াবা কারবার

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০১৮, ০০:১৮

জুবায়ের চৌধুরী

দেশব্যাপী চলমান মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের মধ্যেই মাদকের চোরাচালান পৌঁছে যাচ্ছে দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, ব্যারিকেড, চেকপোস্ট আর নিরাপত্তার ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে মাদকের একের পর এক চালান। কিছুতেই থামছেন না সর্বনাশা মাদক ইয়াবার কারবারিরা! মাদক যেন নির্মূল হওয়ার নয়। চিহ্নিত মাদকের রুটগুলো ছেড়ে ভিন্ন পথ খুঁজে বের করছে মাদক চোরাচালানচক্র, তাদের কৌশলও বদলেছে। নিত্য-নতুন কৌশলে শহর পেরিয়ে গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পরছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মরণনেশা।

গত তিন মাসে দেশব্যাপী র‌্যাব ও পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মাদকবিরোধী কঠোর অভিযানে বিপুলসংখ্যক গ্রেফতার ও প্রায় দুই শতাধিক চিহ্নিত মাদক কারবারি নিহত হওয়ার পরও থেমে নেই মাদক চক্রের অপতৎপরতা। একদিকে চলছে কঠোর অভিযান, অন্যদিকে চলছে মাদকদ্রব্যের চোরাকারবার। তবে অভিযানের কারণে মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসী অবস্থা থেকে কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, বৃহস্পতিবার র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ জানিয়েছেন, ওষুধের দোকানের আড়ালে ইয়াবা কারবারিতে জড়িত মৌলভি জহিরের গোটা পরিবার। সম্প্রতি ইয়াবা কারবারির সঙ্গে জড়িত মৌলভি জহির ও তার স্ত্রী, মেয়ে, বড় জামাতা, জামাতার ভাইসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে দুই লাখেরও বেশি ইয়াবা বড়ি জব্দ করা হয়েছে। এর আগে গত ২৫ এপ্রিল জহিরের বড় ছেলে বাবু গ্রেফতার হয়ে এখন কারাগারে। বাবুর স্ত্রী সাদিয়া আক্তার টেকনাফের ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি একরামুল হকের ছোট বোন। একরাম গত ২৭ মে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। জানা গেছে, জহিরের সিন্ডিকেটে টেকনাফের বেশ কয়েকজন, পরিবহন খাতে কর্মরত কয়েকজন চালক ও সহকারী, দুটি কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মচারী, ঢাকার কয়েকজন খুচরা বিক্রেতাও রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের সদস্য সংখ্যা ২৫-৩০। সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

গোয়েন্দা তথ্যমতে, চলমান মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের কারণে মাদক ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতা কিছুটা হলেও কমেছে। আগের যে ভয়াবহ চিত্র ছিল এখন তা আর নেই। প্রতিনিয়তই মাদক নিয়ন্ত্রণের অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অভিযানের আতঙ্ক ছড়িয়ে গেছে। এদিকে, মাদকবিরোধী অভিযানে শুধু র‌্যাবের অভিযানেই এ পর্যন্ত মাদক-সংক্রান্ত গ্রেফতারের সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। কেবল র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তিন মাসে অন্তত ৬২ মাদক কারবারি নিহত হয়েছেন।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, মাদকের কারবার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি; এটা সম্ভবও নয়। মাদক নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়। র‌্যাব প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। তবে এটুকু বলাই যায়, চলমান অভিযান শুরুর পর কিছুটা হলেও মাদক কারবারিদের তৎপরতা কমেছে। মাদকের চিহ্নিত যে রুটগুলো ছিল সেগুলো মোটামুটি র‌্যাবের নিয়ন্ত্রণে। তবে মাঝে মধ্যেই মাদকচক্র নতুন রুট সৃষ্টি করে অপতৎপরতা চালাচ্ছে। সেগুলোও বন্ধ করতে সার্বক্ষণিক কাজ করছে র‌্যাব। ধারাবাহিক অভিযানে অবশ্যই একটা ভালো ফল আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার উপপরিচালক মেজর হুসাইন রইসুল আজম মনি জানান, ৪ মে থেকে র‌্যাব নতুন উদ্যমে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। ১০ আগস্ট পর্যন্ত র‌্যাবের বিশেষ অভিযানে মাদক-সংক্রান্ত গ্রেফতারের সংখ্যা সর্বমোট ১২ হাজার ২৪৬। এর মধ্যে র‌্যাবের মাদকবিরোধী ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে পরিচালিত ১ হাজার ৩টি অভিযানে মোট গ্রেফতার ৭ হাজার ৮১০ জন। যাদের মধ্যে ৬ হাজার ৬৮২ জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। মেজর রইসুল আরো বলেন, ২০০৪ সালে র‌্যাবের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে গত ১০ আগস্ট পর্যন্ত মাদক-সংক্রান্ত সর্বমোট গ্রেফতারের সংখ্যা ৭৯ হাজার ৬ জন। এ সময়ে ২ হাজার ২৮৫ কোটি ৩১ লাখ টাকার মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) গোয়েন্দা ও অপারেশনস বিভাগের পরিচালক ডিআইজি সৈয়দ তৌফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে অভিযান চলছে। মাদক সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত এ অভিযান চলবে। চলমান অভিযানের কারণে মাদক ভয়াবহতার মাত্রা কমে এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এদিকে, পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, সারা দেশে তালিকা ধরে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। প্রতিদিনই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাদক কারবারি গ্রেফতার ও মাদকদ্রব্য জব্দ হচ্ছে। নিয়মিত অভিযানের ফলে এরই মধ্যে মাদক চোরাকারবারের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে।

৩ মে র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে র‌্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। এর পরদিন থেকেই বিশেষ অভিযানে নামে র‌্যাব। কয়েক দিন পর আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযানে নামে ঢাকা মহানগর পুলিশ। একইভাবে দেশব্যাপী মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে অভিযান শুরু করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)। এর মাঝেই র‌্যাব, পুলিশ ও ডিএনসিসহ একাধিক সংস্থার তৈরিকৃত চিহ্নিত মাদক কারবারিদের তালিকা সমন্বয় করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সমন্বিত তালিকা ধরে চলছে এখনো অভিযান।

নজরদারি বাড়লেও সীমান্ত পথেই আসছে ইয়াবা : কক্সবাজারের টেকনাফে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বেড়েছে। একইসঙ্গে বেড়েছে ইয়াবার পাচারও। প্রায় প্রতিদিনই ধরা পড়ছে ইয়াবার চালান। তবে মাদক পাচার রোধে গত ২৫ জুলাই থেকে টেকনাফে র‌্যাবের অতিরিক্ত ৫টি ক্যাম্প স্থাপনসহ ডগ স্কোয়াড মোতায়েন করা হয়েছে। তবু ইয়াবা কারবারিরা কৌশলে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা চালান নাফ নদী ও সমুদ্র পথে বাংলাদেশে নিয়ে আসছে। আবার প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ইয়াবাসহ নানা মাদকদ্রব্য উদ্ধারের খবরও মিলছে। চলমান অভিযানেও থেমে নেই মাদক চোরাচালান। মিয়ানমার হতে নৌপথে আসা ইয়াবার চালান সড়ক, রেল ও বিমানপথে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

এদিকে, মাদকবিরোধী অভিযানের কারণে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর ফের ‘রাজপ্রাসাদে’ ফিরতে শুরু করেছে টেকনাফের ইয়াবা ‘রাজা’রা। একইসঙ্গে বাড়তে শুরু করেছে ইয়াবার চোরাচালানও। স্থানীয়রা জানান, ইয়াবা বিক্রি করে রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি বানিয়েছে মাদক বিক্রেতারা। এসব বাড়িতে নিরাপত্তার জন্য বসানো হয়েছে সিসি টিভি ক্যামেরাও। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের তৎপরতা দেখলে পালিয়ে যান সহজেই। গত ১৪ আগস্ট কক্সবাজারের রামুতে র‌্যাবের সঙ্গে গোলাগুলিতে দুই ইয়াবা কারবারি নিহত হন। তাদের কাছ থেকে সাড়ে ৪ লাখ ইয়াবা বড়ি জব্দ করা হয়। গত ১২ আগস্ট টেকনাফ সীমান্তে ৩ লাখ ৪০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করেন বিজিবি সদস্যরা। তবে এ সময় কাউকে আটক করা যায়নি। এর আগে গত ৫ আগস্ট টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে সুপারি বাগানের মাটির ভেতর থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার ইয়াবাসহ আরমান (৩২) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যানুযায়ী, কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা প্রতিদিন মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এসব অভিযানে ধরা পড়ছে ইয়াবা চালান। ধরা পড়ছে পাচারকারী ও কারবারিরা। তবে শীর্ষ ইয়াবা কারবারিরা অধরাই থেকে যাচ্ছে। চলমান অভিযানের পর দেশে ইয়াবার চাহিদা আরো বেড়েছে। চাহিদা মেটাতে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় আছে ৩৭টি ইয়াবা কারখানা। মিয়ানমারের আট সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে এগুলো পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৩০ লাখের বেশি ইয়াবা পৌঁছে যাচ্ছে টেকনাফের ডিলারদের কাছে। আর ইয়াবা চোরাচালানের বিপরীতে সীমান্তের ওপারে যাচ্ছে ১০০ কোটি টাকার ওপরে।

পিডিএসও/রিহাব