হজ ফ্লাইটে অনিয়ম : ৮৫ কোটি টাকা লোকসান!

*এখনো বিক্রি হয়নি ৫৭০০ টিকিট *বাতিল নিয়ে হাব-বিমান কাদা ছোড়াছুড়ি

প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০১৮, ১২:৪৪

জুবায়ের চৌধুরী

চলমান হজ ফ্লাইটে নানা অনিয়ম আর সংকটের কারণে ৮৫ কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বিমানের হজ ফ্লাইটের এখনো ৫ হাজার ৭০০ টিকিট অবিক্রিত রয়েছে। ফলে যাত্রী সংকটে বিমানের হজ ফ্লাইট বাতিল হয়েছে ১১টি। এতে বিমানের ৮৫ কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে বাতিল হওয়া ফ্লাইটের যাত্রীদের অন্য ফ্লাইটে সমন্বয় করে পাঠানো হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, হজ এজেন্সিগুলোর টিকিট সংগ্রহে অনীহার কারণে এই পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে।

বিমান বলছে, হজ এজেন্সিগুলোর সক্ষমতা থাকার পরও প্রায় ৭ হাজার যাত্রী কম পাঠানো হয়েছে। এ কারণে প্রায় ৮৪ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার টাকার রাজস্ব হারিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফ্লাইট পরিচালনায় অন্যান্য ব্যয় যুক্ত করলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে আরো বেশি। চারটি বোয়িং-৭৭৭ উড়োজাহাজে এ বছর হজযাত্রী পরিবহন করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। প্রত্যেকটিতে আসন সংখ্যা ৪১৯। কিন্তু যাত্রী সংকটে এরই মধ্যে বাতিল হয়েছে ১১টি ফ্লাইট। বাতিলের ঝুঁকিতে রয়েছে আরো ৬টি।

বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) শাকিল মেরাজ বলেন, এ বছর হজ ফ্লাইটগুলো সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য আগে থেকেই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এজন্য নিয়মিত অনেক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এসব করা হয়েছে হজ ফ্লাইট নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে পরিচালনার জন্যই। এতে আর্থিক ক্ষতিও হয়েছে। কিন্তু হজযাত্রীদের টিকিট না কাটার কারণে ক্ষতির অংক বেড়ে গেছে। হজ পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলছেন, হজ এজেন্সিগুলো মক্কা ও মদিনায় সময়মতো বাড়িভাড়া না করায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। এ বছর হজ পালনের জন্য এরই মধ্যে সৌদি আরব পৌঁছেছেন ৭৯ হাজার ৭৯৭ জন হজযাত্রী। এর মধ্যে বার্ধক্যজনিত কারণে এবং অসুখে মারা গেছেন ১৬ জন। এর মধ্যে দুইজন নারীও রয়েছেন। হজ ব্যবস্থাপনা সুন্দর এবং সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে নিরলসভাবে কাজ করছে সৌদি আরবের বাংলাদেশ হজ অফিস। এ বছর সাপোর্টিং টিমের সদস্যসহ ১ লাখ ২৮ হাজার বাংলাদেশির পবিত্র হজ পালনের সম্ভাবনা রয়েছে। এখন পর্যন্ত ১ লাখ ১৪ হাজার হজযাত্রীর ভিসা হয়েছে। বাকি ১৪ হাজার হজযাত্রীর ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আজ রোববারের মধ্যে জমা দিতে বলেছে।

সূত্র জানায়, গত ১৪ জুলাই থেকে শুরু হয়ে ২ আগস্ট মধ্যরাত পর্যন্ত ২২৯টি ফ্লাইটের মাধ্যমে সৌদি আরবে পৌঁছেছেন ৭৯ হাজার ৭৯৭ জন হজযাত্রী। হজযাত্রীদের যেকোনো সমস্যা তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্য এ বছর থেকে বাংলাদেশি হজযাত্রী উঠেছেন, এমন প্রত্যেক বাড়ি বা হোটেলে সার্বক্ষণিক হজ অফিসের প্রতিনিধিদের অবস্থানের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মক্কায় বাংলাদেশ হজ অফিসের প্রশাসনিক টিমের সদস্য মো. মনিরুজ্জামান জানান, এ বছর বাংলাদেশের ৫২৮টি এজেন্সি হজ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। অতীতের বছরগুলোর চেয়ে এ বছর সুষ্ঠু এবং সুন্দরভাবে হজ সম্পন্ন করতে বদ্ধপরিকর বাংলাদেশ এবং সৌদি হজ ও ওমরা মন্ত্রণালয়। এজেন্সিগুলো কোনো শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ করলে ব্যবস্থা নিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। চলতি বছর এ পর্যন্ত আটটি এজেন্সিকে বিভিন্ন অনিয়মের জন্য কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে হজ মন্ত্রণালয়।

হজযাত্রীদের চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন ডাক্তার, নার্স, ব্রাদার্স, ফার্মাসিস্ট, ওটি অ্যাসিট্যান্ট, সহায়তাকারীসহ প্রায় ৪০০ জনের একটি মেডিকেল টিম। হজ পালনে আগ্রহীদের হজের আগে বাংলাদেশের জেলায় জেলায় সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ায় অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর বাংলাদেশি হজযাত্রীর মৃত্যুর হার অনেক কম বলে জানিয়েছেন মক্কা-বাংলাদেশ হজ মিশনের ক্লিনিকে দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসকরা।

এদিকে সার্বিক প্রস্তুতি সত্ত্বেও গত ২৭ জুলাই থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত সময়ে যাত্রীর অভাবে ১১টি হজ ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। অব্যাহত যাত্রী সংকটে আরো ৬টি ফ্লাইট বাতিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ। বার বার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও হজ এজেন্সিগুলো যথাসময়ে টিকিট ক্রয় না করায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে বিমানের জন্য অতিরিক্ত কোনো স্লট বরাদ্দ দেয়া হবে না বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। ফলে সব হজযাত্রীর সৌদি আরবে পৌঁছানোর বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এবার বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৫২৮টি হজ এজেন্সি হজের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যাত্রীদের বহনের জন্য বিমান বাংলাদেশ ১৮৭টি ফ্লাইটে ৬৪ হাজার ৯৬৭ জন এবং সৌদি এয়ারলাইন্সের ১৮৮টি ফ্লাইটে ৬১ হাজার ৮৩১ জন যাত্রী পরিবহন করবে। হজের শেষ ফ্লাইট ঢাকা থেকে ছেড়ে যাবে ১৫ আগস্ট। আর হজ পালন শেষে ২৭ আগস্ট প্রথম ফিরতি ফ্লাইট জেদ্দা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করবে।

ফ্লাইট বাতিল নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি : যাত্রী স্বল্পতার কারণে একের পর এক বাতিল হচ্ছে ফ্লাইট। এখন পর্যন্ত ১১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। আরো ফ্লাইট বাতিলের আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে নির্দিষ্ট ফ্লাইটের বাইরে সৌদি কর্তৃপক্ষ আর কোনো স্লট দেবে না বাংলাদেশকে। এতে সব হজযাত্রী পরিবহন নিয়ে তৈরি হচ্ছে শঙ্কা। এজন্য বাংলাদেশ বিমানের পক্ষ থেকে টিকিট কিনতে এজেন্সিগুলোকে বারবার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

হজ এজেন্সি অব বাংলাদেশ (হাব) বলছে, ফ্লাইট বাতিল হওয়ার জন্য বিমান দায়ী। আর এর সমাধান বিমানকেই করতে হবে। আর বিমান বলছে, এজেন্সিগুলো বারবার বলার পরও টিকিট কনফার্ম না করায় এ অবস্থা হয়েছে। দায় নিতে হবে তাদেরই।

হজযাত্রী প্রতিস্থাপন প্রথম ধাপে ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৮ শতাংশ করা হয়। পরে আবারও বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। তবু সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না।

এ বিষয়ে হাব মহাসচিব শাহাদাত হোসেন তসলিম বলেন, বিমানকে হজযাত্রার আগেই হজ ওয়াইজ সব তথ্য দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু তারা এজেন্সিকে কোনো তথ্য দেয় না। এখন যাত্রীর অভাবে ফ্লাইট বাতিল করছে। এজন্য তারাই দায়ী। দায়ভার তাদেরই নিতে হবে।

বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) শাকিল মেরাজ বলেন, হাব যেসব অভিযোগ করেছে তা সঠিক নয়। প্রতিদিন ৫২৮টি এজেন্সিকে ই-মেইল করে জানানো হয়েছে। টিকিট নিশ্চিত করতে বারবার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। যদি তারা টিকিট নিশ্চিত করত তবে কোনো ফ্লাইট বাতিল করা লাগত না। ফ্লাইট বাতিলে এজেন্সিগুলোই দায়ী।

পিডিএসও/হেলাল