ধরাছোঁয়ার বাইরে জিয়াসহ পুরস্কার ঘোষিত ৫ জঙ্গি

প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০১৮, ১১:০৬ | আপডেট : ৩০ জুলাই ২০১৮, ১১:১৮

জুবায়ের চৌধুরী

ব্লগার, প্রগতিশীল লেখক ও প্রকাশক হত্যায় জড়িত ছয়জনকে চিহ্নিত করে তাদের ধরিয়ে দিতে লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এ ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেছে। এদের মধ্যে এক জঙ্গি গ্রেফতার এবং অন্যজন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। বাকি চারজন এখনো অধরা। সবচেয়ে আলোচিত জঙ্গি নেতা সামরিক বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর জিয়া। তাকে ধরিয়ে দিতে ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গি জুবায়েরের জবানবন্দিতে এ মেজর জিয়ার অবস্থান সম্পর্কে বলেছেন মেজর জিয়া চট্টগ্রামেই আছেন! অথচ গোয়েন্দাদের ধারণা ছিল জিয়া ভারতে পালিয়ে সে দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের সঙ্গে মিলে সক্রিয় রয়েছেন।

দুই বছর আগে ছয় জঙ্গিকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে ডিএমপি। যারা ব্লগার, লেখক, প্রকাশক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। এদের মধ্যে দুইজন বাদে বাকি চারজন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এরা কে কোথায় আছে, বর্তমানে কী ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত সেই তথ্যও নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, পুরস্কার ঘোষিত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে পুলিশ কাজ করছে। খুব শিগগির তাদের ধরা সম্ভব হবে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের সন্ত্রাসীরা যতক্ষণ পর্যন্ত গ্রেফতার না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত ঝুঁকি থেকে যায়। ২০১৬ সালের ১৯ মে শীর্ষ ছয় জঙ্গিকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) শীর্ষ ছয় সদস্য হলো শরিফুল ওরফে সাকিব ওরফে শরিফ ওরফে সালেহ ওরফে আরিফ ওরফে হাদী-১, সেলিম ওরফে ইকবাল ওরফে মামুন ওরফে হাদী-২, সিফাত ওরফে সামির ওরফে ইমরান, আবদুস সামাদ ওরফে সুজন ওরফে রাজু ওরফে সালমান ওরফে সাদ, শিহাব ওরফে সুমন ওরফে সাইফুল এবং সাজ্জাদ ওরফে সজিব ওরফে সিয়াম ওরফে শামস। এদের মধ্যে শরিফুল ওরফে সাকিব ওরফে শরিফ ডিবি পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। তার আগে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে শিহাব ওরফে সুমনকে গ্রেফতার করা হয়। আর বাকি চারজনের খোঁজ এখনো মেলেনি। পুলিশ জানায়, এই ছয় সদস্যকে ধরিয়ে দিতে ১৮ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। ছয়জনের মধ্যে শরিফুল ওরফে সাকিব ওরফে শরিফ ওরফে সালেহ ওরফে আরিফ ওরফে হাদী-১ এবং সেলিম ওরফে ইকবাল ওরফে মামুন ওরফে হাদী-২ এর জন্য ৫ লাখ টাকা করে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। বাকি চারজনের প্রত্যেকের জন্য ২ লাখ টাকা করে পুরস্কার ঘোষিত হয়।

ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা চার জঙ্গির একজন হলেন সেলিম ওরফে ইকবাল। তার বাড়ি উত্তরবঙ্গে। ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যা, ওয়াশিকুর বাবু হত্যা, নিলাদ্রী নীলয় হত্যা, মিরপুরের স্কুলশিক্ষক হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্তে তার নাম পাওয়া যায়। এছাড়াও ব্লগার নাজিমউদ্দিন সামাদ, জুলহাজ মান্নান ও তনয় হত্যাকাণ্ডেও তার সরাসরি উপস্থিতি তদন্তে জানা যায়। তিনি এবিটি সদস্যদের সামরিক, আইটি ও কথিত জিহাদ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।

আবদুস সামাদ ওরফে সাদের বাড়ি কুমিল্লা অঞ্চলে। তিনি এবিটির সামরিক শাখার অন্যতম সদস্য। প্রকাশক আহম্মেদ রশীদ টুটুল হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্তে পাওয়া যায়, ওই হত্যাচেষ্টায় তিনি সার্বিক সমন্বয়কারী ও হত্যাচেষ্টায় অংশগ্রহণকারীদের প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালনসহ সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।

জঙ্গি সিফাত ওরফে ইমরানের বাড়ি সিলেট অঞ্চলে। সে এবিটির সামরিক শাখার অন্যতম সদস্য। আজিজ সুপার মার্কেটে দীপন হত্যাকাণ্ডের মামলার তদন্তে পাওয়া যায়, ওই হত্যাকাণ্ডে সে সমন্বয়কারী ও অংশগ্রহণকারীদের প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রিয়াদ মোর্শেদ বাবু হত্যাকাণ্ডে তার সরাসরি অংশগ্রহণের বিষয়টি উঠে আসে। অন্যদিকে সাজ্জাদ ওরফে শামসের বাড়ি ঢাকার পাশের কোনো জেলায়। সেও সংগঠনের সামরিক শাখার নেতা। ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, পুরস্কার ঘোষিত জঙ্গিদের ধরতে র‌্যাবের গোয়েন্দারাও কাজ করছে।

এখনো রহস্যেঘেরা মেজর জিয়া : শীর্ষ জঙ্গি নেতা সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত মেজর জিয়াকে ধরিয়ে দিতে ২০ লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ সদর দফতর। হলি আর্টিজানের জঙ্গি হামলার পর সিটিটিসি গুলশান নিকেতন আবাসিক এলাকায় অভিযান চালালে জিয়া অল্পের জন্য গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হন। এই জঙ্গি নেতাকে ধরতে সারা দেশে অভিযান চালালেও বার বার ব্যর্থ হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সে আজও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, চাকরিচ্যুত মেজর জিয়ার আসল নাম সৈয়দ জিয়াউল হক। বাড়ি মৌলভীবাজারের মস্তফাপুরে।

গত ১৭ জুলাই চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ থেকে জঙ্গিদের গোয়েন্দা শাখার প্রধান জুবায়েরকে গ্রেফতারের পর চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। জুবায়ের বলেছেন, আনসার আল ইসলামের ‘মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক’ চট্টগ্রাম অঞ্চলে আছেন। সেখান থেকে তিনি আনসার আল ইসলামের পলাতক নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সংগঠনটির পলাতক নেতাকর্মীরা ভারতের নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মনিপুরের বিচ্ছিন্নতাবাদী কুকি বিদ্রোহীদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। সবকিছুর সমন্বয় করছেন জিয়া।

পিডিএসও/হেলাল