বন্ধ হয়নি ভিওআইপির অবৈধ বাণিজ্য

প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০১৮, ০৯:২৩

গাজী শাহনেওয়াজ

অবৈধ ভিওআইপি (ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল) ব্যবসা বন্ধে ব্যর্থ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। দেশজুড়ে চলছে এর রমরমা বাণিজ্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কৌশলে চলছে বিধিবহির্ভূত এ কার্যক্রম। হোতা চক্রকে কে থামাবে! শুরুর এক যুগ পরে এসে এই প্রশ্নই ঘুরেফিরে আলোচনায় ওঠে আসছে। কারণ, শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্রের কৌশলের কাছে সরকারের নেওয়া সব উদ্যোগ ব্যর্থ। তবে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেছেন, এটা সাময়িক ব্যবসা। একটা সময় আসবে তখন আর এটা চলবে না।

নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বিটিআরসির (বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ) তথ্য মতে, চলতি বছরের ২১ মার্চ পর্যন্ত অবৈধ ভিওআইপির বিরুদ্ধে ১২টি অভিযান পরিচালনা করে ৫ হাজার ৩১৪টি সিম জব্দ হয়েছে। গত ২০০৭ থেকে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত এই অভিযানের সংখ্যা ৩৮৩টি; জব্দ সিমের সংখ্যা ২ লাখ ৬৮ হাজার ২১৫টি। মন্ত্রণালয় থেকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো নথিতে এসব তথ্য রয়েছে।

জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘আমার সময়ে নতুন নয়, অনেক আগে থেকেই অবৈধ ভিওআইপির ব্যবসা চলে আসছে। দায়িত্বে এসে এসব অবাঞ্ছিত কল আদান-প্রদান বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছি। তবে এটা নির্মূল করার জন্য যে ধরনের পদক্ষেপ দরকার, সেটা এখনো নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তুলনামূলক কমে এসেছে। তিনি বলেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে সাময়িক এই ব্যবসা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ দেশব্যাপী ডাটার বিস্তৃতি ঘটলে এবং দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে পৌঁছে দেওয়া হলে সাময়িক ওই ব্যবসার মৃত ঘটবে, যোগ করেন তথ্যপ্রযুক্তির রূপকার এ মন্ত্রী।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, রাজধানীর ভিআইপি এলাকা, বিভাগীয় ও বড় জেলা শহর ছাড়াও রেডিও লিংকের মাধ্যমে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা দেশের সীমান্ত এলাকায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। আর রাজধানীতে হাই ফ্রিকোয়েন্সি রেডিও লিংক ব্যবহার করে ভিওআইপির অবৈধ ব্যবসা করছেন অনেকে।

জানা যায়, রাজধানীর নিকেতন, গুলশান, বারিধারা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, নিউ ডিওএইচএস, মিরপুর ডিওএইচএস, ধানমন্ডি ও উত্তরায় এ ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে অবাধে। বিটিআরসি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ সম্পর্কে অবহিত থাকলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযান পরিচালনার সাহসও দেখাতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। যদিও বিটিআরসির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করায় তাদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না।

এদিকে গত কয়েক মাসে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায় ব্যবহৃত সন্দেহে প্রায় ৫ হাজার ৩১৪ সিম ও বেশ কিছু আইপি অ্যাড্রেস বন্ধ করে দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ফলে অবৈধ ব্যবসায়ীরা যুক্ত হচ্ছেন আরো উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে। এ ব্যবসা এখন আর মুঠোফোন সংযোগ বা ল্যান্ডলাইনে সীমাবদ্ধ নেই। যুক্ত হয়েছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি রেডিও লিংক। পাশাপাশি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ফ্রিকোয়েন্সি দিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমেও এ ব্যবসা চলছে।

একদিকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, অন্যদিকে ভিআইপিদের সংশ্লিষ্টতায় অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায়ীদের সামনে অসহায় হয়ে পড়েছে বিটিআরসি। জানুয়ারি থেকে মার্চ তিন মাসেই সরকার রাজস্ব হারিয়েছে একশ কোটির বেশি টাকা।

বিটিআরসির এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৭-১৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ১২ বছরে অবৈধ ভিওআইপির বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। এর মধ্যে যথাক্রমে ২৫টি, ৩০টি, ৪৬টি, ২১টি, ২১টি, ৪০, ১৯, ৯৫, ৪০, ১৮, ১৬ ও ১২টি। একইভাবে ২০১৩-১৮ পর্যন্ত সময়ে সিম জব্দ হয়েছে ২ লাখ ৬৮ হাজার ২১৫টি; যথাক্রমে ৮৭ হাজার ৯৩৪টি, ১ লাখ ৩ হাজার ৯৩২, ২২ হাজার ৯২০, ২৫ হাজার ১৬৮, ২২ হাজার ৯৪৭ ও চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ৫ হাজার ৩১৪টি।

বিটিআরসির কর্মকর্তাদের তথ্য মতে, রাষ্ট্রমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বিটিসিএল ও মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানি টেলিটকের মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে সিংহভাগ অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা। গত কয়েক বছর (২০০৮-২০১৪) পর্যন্ত বিটিআরসির মনিটরিং বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবৈধ ভিওআইপির শীর্ষে ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দুই টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান বিটিসিএল ও টেলিটক। প্রতিষ্ঠান দুটিকে বারবার সতর্ক করা হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এ নিয়ে বিটিআরসি, টেলিযোগাযোগ সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একসঙ্গে অনুসন্ধান শুরু করে। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে বিটিসিএল ২৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলাও করে দুদক। কিন্তু রাঘববোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে যায়। আগের মতো এখনো কৌশলে চলছে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা।

সংসদীয় কমিটিতে দেওয়া প্রতিবেদনে নিজেদের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে নিয়েছে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। তারা বলেছে, বিটিআরসির তৈরি করা কমিটি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা প্রতিনিয়ত ভিওআইপির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে। নিত্যনতুন কৌশল ব্যবহার করে সিমবক্স ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করার লক্ষ্যে সর্বদা তৎপর বিটিআরসি। এ কারণে বিপুল পরিমাণ ভিওআইপি যন্ত্রপাতি জব্দ করা হচ্ছে।

ভিওআইপি লাইসেন্স নিয়ে অবৈধভাবে প্রতিদিন ১৩ কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। এর পরিমাণ মাসে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা এবং বছরে ৫ হাজার কোটি টাকা।

পিডিএসও/হেলাল