তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন

রাইফার মৃত্যুর কারণ চিকিৎসায় অবহেলা

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০১৮, ০৯:৩৫

চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রামে সাংবাদিক রুবেল খানের মেয়ে রাইফা খানের মৃত্যুর জন্য ম্যাক্স হাসপাতালের তিন চিকিৎসকের অবহেলা দায়ী। এ ছাড়া হাসপাতালটিতে সেবা প্রদানে চিকিৎসক এবং নার্সের সমন্বয়হীনতা ও চিকিৎসাকালীন মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে। অদক্ষ নার্স ও অনভিজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগের ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা অনেক দুর্বল। রাইফার মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে গঠিত সিভিল সার্জনের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

এ প্রতিবেদনে অভিযুক্ত চিকিৎসকরা হলেন- শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. বিধান রায় চৌধুরী এবং ম্যাক্স হাসপাতালের দুই চিকিৎসক ডা. দেবাশীষ সেনগুপ্ত ও ডা. শুভ্র দেব। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও এসেছে এই প্রতিবেদনে। রাইফার বাবা-মা, ম্যাক্স হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্স, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের লিখিত ও মৌখিক জবাবসহ মোট ১২ জনের বক্তব্য নিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে তদন্ত প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিতে ছিলেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক সবুর শুভ।

তদন্ত প্রতিবেদনটি গত বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের (সিইউজে) সভাপতি নাজিমুদ্দীন শ্যামলের কাছে হস্তান্তর করেন সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে সিইউজে। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন সিইউজে সাধারণ সম্পাদক হাসান ফেরদৌস।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুকন্যা রাফিদা খান রাইফা যখন তীব্র খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয়, তখন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের অনভিজ্ঞতা ও আন্তরিকতার অভাব পরিলক্ষিত হয় এবং ওই সময় থাকা সংশ্লিষ্ট নার্সদের আন্তরিকতার অভাব না থাকলেও এ রকম জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মতো দক্ষতা বা জ্ঞান কোনোটাই ছিল না। শিশুকন্যা রাইফাকে অসুস্থতার জন্য ম্যাক্স হাসপাতালে জরুরি বিভাগে ভর্তি হওয়া থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা পাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে তার অভিভাবকের ভোগান্তি চরমে ছিল।

এতে বলা হয়, শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. বিধান রায় চৌধুরী শিশুটিকে যথেষ্ট সময় ও মনোযোগ সহকারে পরীক্ষা করে দেখেননি। ডা. দেবাশীষ সেনগুপ্ত ও ডা. শুভ্র দেব শিশুটির রোগ জটিলতার বিপৎকালীন আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা প্রদান করেননি বলে শিশুর পিতা-মাতা অভিযোগ উত্থাপন করেছেন, যা এই তিন চিকিৎসকের বেলায় সত্য বলে প্রতীয়মান হয়। তবে তদন্তে ভুল চিকিৎসার প্রমাণ মেলেনি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তে স্পষ্ট হয় যে, হাসপাতালে রোগী ভর্তি প্রক্রিয়ায় ভোগান্তি প্রকট। চিকিৎসক নার্সদের সেবা প্রদানের সমন্বয়হীনতা ও চিকিৎসাকালীন মনিটরিংয়ের অভাব দেখা যায়। অদক্ষ নার্স ও অনভিজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগের ফলে কাক্সিক্ষত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা অনেক দুর্বল রয়েছে, বিশেষত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবায় বিশেষজ্ঞের সার্বক্ষণিক উপস্থিতির সংকটটি প্রবল।

তদন্ত কমিটি চারটি সুপারিশ করে। এতে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে অভিযুক্ত তিনজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে জানায় কমিটি। এ ছাড়া ম্যাক্স হাসপাতালের সার্বিক ত্রুটিপূর্ণ চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা অতিদ্রুত সংশোধন করতেও বলা হয়। কর্তব্যরত নার্সরা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ডিপ্লোমাধারী থাকার নিয়ম থাকলেও উক্ত হাসপাতালে তা নেই জানিয়ে তদন্ত কমিটি ডিপ্লোমা নার্স দ্বারা চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার সুপারিশ করে। শেষ সুপারিশটি হচ্ছে— হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সার্বক্ষণিক দ্রুত ও আন্তরিক সেবা সুনিশ্চিত করতে হবে এবং রোগীর অভিভাবককে যথাসময়ে রোগীর অবস্থা ও চিকিৎসর ব্যাপারে সর্বশেষ পরিস্থিতি অবগত করতে হবে।

প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর হাসান ফেরদৌস বলেন, ‘তদন্তে অবহেলার বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়েছে। আমরা আশা করছি, দ্রুত দায়ী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ম্যাক্স হাসপাতাল বন্ধ করা হবে। আমাদের আন্দোলন শুধু দায়ী চিকিৎসক ও ম্যাক্স হাসপাতালের বিরুদ্ধে। আমাদের আন্দোলন সাংবাদিকদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণকারী বি এম এ নেতা ফয়সল ইকবাল চৌধুরী এবং উসকানিদাতা ডা. খুরশীদ জামিলদের বিরুদ্ধে। সমগ্র বিএমএর বিরুদ্ধে আমাদের কোনো আন্দোলন নয়।’

সংবাদ সম্মেলনে সিইউজে সভাপতি নাজিমউদ্দিন শ্যামল বলেন, ‘এই তদন্তে আমাদের সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিএমএ এত দিন বলে এসেছিল, তদন্ত প্রতিবেদন আসুক, এরপর ব্যবস্থা হবে। এখন প্রতিবেদন এসেছে। দোষীদের শাস্তি দিন। ম্যাক্স হাসপাতাল বন্ধ করুন। চিকিৎসাসেবা বন্ধের হুমকি দিয়ে ফয়সাল ইকবাল তার পেশার শপথ ভঙ্গ করেছেন। আমরা তার সনদ বাতিলের দাবি জানাই।’

এ সময় তদন্ত কমিটির সদস্য ও সিইউজের যুগ্ম সম্পাদক সবুর শুভ তদন্তের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহসভাপতি শহীদ উল আলম ও যুগ্ম মহাসচিব তপন চক্রবর্তী, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শুকলাল দাশ এবং চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মোস্তাক আহমেদ, এজাজ ইউসুফী ও রিয়াজ হায়দার চৌধুরী বক্তব্য দেন।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ জুন দৈনিক সমকালের স্টাফ রিপোর্টার রুবেল খানের আড়াই বছরের শিশু রাইফা খান গলাব্যথায় আক্রান্ত হলে নগরীর মেহেদিবাগের ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৯ জুন রাতে শিশুটি মারা যায়। রাইফার মৃত্যুর জন্য ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসকদের অবহেলাকে দায়ী করে জড়িতদের বিচার দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ।

পিডিএসও/তাজ